অভিযোগ গণহত্যাসহ সাতটি-কামারুজ্জামানের বিচার শুরু

একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা ও নারী ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী সাতটি অপরাধে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে কামারুজ্জামানের বিচার শুরু হলো।


এ নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে আটক আটজনের মধ্যে সাতজনের বিচার শুরু হলো। আগামী ২ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল সোমবার অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৪ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ১ নম্বর ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিলেন চট্টগ্রামের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের ভাতিজা গৌরাঙ্গ সিংহ। তিনি বলেন, 'পাঞ্জাবি সেনারা নূতন চন্দ্র সিংহকে ব্রাশফায়ার করার পরও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গুলি করেন বলে শুনেছি। বজ্রহরি কর্মকারের কাছ থেকে এটা শুনেছি।'
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন : কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের সময় শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে তাঁর পরিকল্পনা ও পরামর্শে ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই ১২০ জন পুরুষকে হত্যা করা হয় এবং ওই গ্রামের প্রায় ১৭০ জন মহিলাকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনার পর থেকে সোহাগপুর গ্রাম বিধবাপল্লী নামে পরিচিত।
গতকাল অভিযোগ গঠনের পর কামারুজ্জামান নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, 'আমার মতো উচ্চ মাধ্যমিক ছাত্রের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হচ্ছে, এটা ইতিহাসে নজিরবিহীন।' তিনি বলেন, 'আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করলে আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হতো না।'
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, দেশত্যাগে বাধ্য করা, নারী ধর্ষণ, রাজনৈতিক কারণে নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে ৯টি অভিযোগ উত্থাপন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। গত ১৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) ৩১ জানুয়ারি আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে গত ১৬ এপ্রিল মামলাটি এক নম্বর ট্রাইব্যুনাল থেকে দুই নম্বর ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর অভিযোগ গঠনের ওপর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে অভিযোগ গঠন করা হলো। আগামী ২ জুলাই কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আসামিপক্ষকে তাদের সমর্থনে যদি কোনো সাক্ষী থাকে তবে তাদের তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
'নূতন চন্দ্রকে গুলি করেন সাকা'
গতকাল সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্য গহিরা গ্রামের কুণ্ডেশ্বরী এলাকার গৌরাঙ্গ সিংহ। তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, '১৯৭১ সালে কাকা নিলম্বর সিংহ ও নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে আমি একান্নবর্তী পরিবারে বসবাস করতাম। সে সময় আমি আমার কাকা নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে থাকতাম।' তিনি বলেন, '১৯৭১ সালের ৩০ চৈত্র আমি, হিমাংশু বৈদ্য, বজ্রহরি কর্মকার, গোপাল দাস ও নূতন চন্দ্র সিংহ একত্রে বাড়িতে ছিলাম। নূতন চন্দ্র সিংহের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাঁকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম আমরা। সেদিন সকাল ৯টায় আমাদের বাড়িতে সেনাবাহিনীর গাড়ি ঢুকতে দেখি। এ গাড়িতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মাবুদসহ আমাদের দেশীয় কয়েকজন লোক ও পাঞ্জাবিদের (পাকিস্তানি সেনাবাহিনী) দেখি। এরপর আমি, হিমাংশু বৈদ্য ও মনোরঞ্জন সিংহ বাড়ির দক্ষিণ পাশের জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যাই। বজ্রহরি কর্মকার ও গোপাল দাস বাড়ির দোতলায় ওঠে যায়। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, দেশীয় লোকজন ও পাঞ্জাবিরা আমার কাকা নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে কথা বলে চলে যায়। জঙ্গলে পালিয়ে থেকে গাড়ির শব্দে বুঝি তারা চলে গেল।'
গৌরাঙ্গ সিংহ আরো বলেন, 'এর ১০-১৫ মিনিট পর গাড়ির শব্দ পাই। এতে বুঝি, আবার তারা ফিরে আসে। এরপর গুলির শব্দ শুনি। মনে হয় স্টেনগানের গুলি হবে। এরও দু-এক মিনিট পর আবার গুলির শব্দ শুনি। তখন বুঝি, ওখানে থাকা নিরাপদ হবে না। আমরা আরো দক্ষিণে একটি মুসলমান বাড়িতে যাই। সেখানে আমাদের বিশ্বস্ত আহম্মদ বশরকে দেখি। তাঁকে কাকা নূতন চন্দ্র সিংহের খবর জানার জন্য পাঠাই। তিনি ফিরে এসে বলেন, মন্দিরের সামনে নূতন চন্দ্র সিংহ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। এ খবর শুনে আমরা মন্দির থেকে একটি ত্রিপল এনে নূতন চন্দ্র সিংহের লাশ ঢেকে দিয়ে সেখান থেকে চলে যাই। এ সময় আমার সঙ্গে হিমাংশু বৈদ্য, মনোরঞ্জন সিংহ, ভাস্কর বড়ুয়া, আহম্মদ বশরও ছিলেন। এরপর আমি আমার শশুরবাড়ি যাই ও পরের দিন ভারতে চলে যাই। দেশ স্বাধীনের ৮-১০ দিন পর ফিরে আসি। আমার সঙ্গে মনোরঞ্জন সিংহ ও প্রফুল্ল সিংহ ফিরে আসেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা ভারতে থেকে যায়।' গৌরাঙ্গ সিংহ বলেন, 'আমরা দেশে ফিরে আসার পরের দিন বজ্রহরি কর্মকার আমাদের কাছে আসে। তার কাছ থেকে শুনি, ঘটনার দিন সে ও গোপাল দাস দোতলায় ছিল। সেখান থেকে তারা দেখেছে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে কিছু বাঙালি এবং পাঞ্জাবি মিলিটারি নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে কথা বলে চলে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসে। তারপর মন্দির থেকে নূতন চন্দ্র সিংহকে টেনে-হিঁচড়ে মন্দিরের সামনে নিয়ে আসে এবং পাঞ্জাবিরা ব্রাশফায়ার করে। এর দুই মিনিটের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গুলি করে চলে যায়। বজ্রহরি কর্মকারের কাছে আরো শুনি, নূতন চন্দ্র সিংহের লাশ দু-তিন দিন সেখানে পড়ে ছিল। এলাকার চেয়ারম্যান আমানত খাঁ আমাদের বাড়িতে এসে কাকার লাশ দেখতে পেয়ে সৎকার করান। দেশ স্বাধীনের পর সত্য রঞ্জন বাবু কাকার হত্যার বিষয়ে রাউজান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার কী হয়েছে, তা জানি না। আমি জবানবন্দিতে যাদের নাম বলেছি তাঁদের মধ্যে প্রফুল্ল সিংহ ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই।' পরে তাঁকে জেরা করেন সাকার আইনজীবীরা।
এ ছাড়া জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় এক নম্বর ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কর্মকর্তা হেলালউদ্দিনকে জেরা করা অব্যাহত রয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.