সব কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব নেওয়া হোক-দুর্নীতির শিকড়

সরকারি চাকরি করে রেলের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুই কর্মকর্তা, সাবেক রেলমন্ত্রীর এপিএস এবং তাঁদের স্ত্রীরা সম্পদের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। এ ঘটনা প্রমাণ করে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে সম্পদের বিবরণী গ্রহণ করার যে সুযোগ রয়েছে, তার যথাযথ প্রয়োগ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধে সুফল মিলত।


দুদক যথেষ্ট সীমিত পর্যায়ে এবং অনেকটা বাছাই-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পদের বিবরণী চাওয়ার ক্ষমতা অনুশীলন করে চলেছে। মধ্যরাতে ধরা পড়া রেলগেট কেলেঙ্কারির ৭০ লাখ টাকার কারণে দুদক উপায়ান্তর না দেখে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সম্পদের হিসাব চেয়েছিল। তাঁরা সম্পদের যে বিবরণ তুলে ধরেছেন, তা যথেষ্ট প্রশ্নসাপেক্ষ। তাঁদের প্রকৃত সম্পদ প্রদত্ত হিসাবের চেয়ে বেশি বলেই ধারণ করি।
সরকারি ও বিরোধী দল মুখে দুর্নীতি প্রতিরোধে তাদের অঙ্গীকারের কথা অহরহ প্রকাশ করলেও এ বিষয়ে তাদের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায় না। সদিচ্ছা থাকলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনেরা মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ নিয়ে এত ধানাই-পানাই করতে পারতেন না।
ফিলিপিনসহ বিশ্বের বহু দেশে পদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করে থাকেন। এটা আইনেই বলা আছে। এর সুবিধা হলো, কোনো ব্যক্তি সম্পদের হিসাব দিতে বিব্রতবোধ করবেন না। প্রত্যেকেই আইনের অনুশাসন মেনে চলার অংশ হিসেবে সম্পদের বিবরণী জমা দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশেও সব সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হোক।
বাংলাদেশের দুদক আইনে বর্তমানে কোনো ব্যক্তিকে সরকারের নোটিশ দেওয়া মানেই একটা বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করা। কারণ, দুদক কেবল সন্দেহজনক ব্যক্তিকেই এ ধরনের নোটিশ দিয়ে থাকে। এতে অনেক সময় ভুল-বোঝাবুঝিরও সৃষ্টি হয় এবং দুদক কিংবা সরকারি কর্মকর্তা—কেউই পারস্পরিক আস্থা স্থাপন করতে পারছেন না। এর অবসান হওয়া উচিত।
রেলের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুই কর্মকর্তা বিচ্ছিন্ন কোনো চরিত্র নয়। এই রেল বিভাগের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে সম্পদের বিবরণী চাওয়া হলেও অনুরূপ চিত্রই পাওয়া যাবে। আর দুর্নীতি যে কেবল রেল বিভাগে হচ্ছে, তা-ও মনে করার কারণ নেই। পুলিশ, রাজস্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রায় প্রতিটি সরকারি খাতে দুর্নীতি যে শিকড় গেড়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে গতি নেই। ব্যুরো আমলে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে আগাম অনুমতি নিতে হতো সরকারের কাছ থেকে। এখন তারা স্বাধীনভাবেই তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দুদকের চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী সংস্থাটি ‘নখদন্তহীন বাঘ’ হওয়ায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

No comments

Powered by Blogger.