নিত্যপণ্যের দাম সহনীয়! by আবুল কাশেম

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় যে ১৫টি পণ্য রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আটটি পণ্যের দাম গত এক বছরে বেড়েছে। দাম বাড়া এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে আটা, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, মসুর ডাল, ছোলা, আলু, পেঁয়াজ, লবণ ও ডিম। এসব দ্রব্যের মধ্যে ছোলা বাদে বাকিগুলো ছাড়া মানুষের দিন পার করাই কঠিন।


নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশির ভাগ পণ্যের দাম বাড়লেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহনীয়!
গত রবিবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তাঁর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে এক বৈঠকের কার্যপত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই সব পণ্যের দাম বাড়ার 'যৌক্তিকতা' তুলে ধরে। ওই কার্যপত্রে বলা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশির ভাগ পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি সাম্প্রতিক যেকোনো সময়ের তুলনায় সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
এসব বিষয়ে কথা বলতে বাণিজ্যসচিব মো. গোলাম হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক ড. সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বর্তমান মূল্য পরিস্থিতিকে সহনীয় বললেও আদতে তা নয়। এখনো মূল্যস্ফীতির হার ৯ থেকে ১০ শতাংশের মতো। এটা মোটেই সহনীয় নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরো কমাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।
অতিপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম বাড়লেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্বেগ নেই। বরং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা হন্যে হয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার 'যৌক্তিক কারণ চিহ্নিত করছেন। আর এই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ' হিসেবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার সংকটকে দায়ী করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এসবের অনিবার্য প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্নপণ্যের দাম ওঠানামা প্রায়ই লক্ষ করা যায়।
কার্যপত্রে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, গত রমজানের সময় প্রতি মার্কিন ডলার ৭৫.২০ টাকা, ব্যাংক সুদ হার ১২ শতাংশ, বিদ্যুৎ প্রতি একক সাড়ে পাঁচ টাকা এবং গ্যাস প্রতি একক ছিল চার টাকা। সে তুলনায় বর্তমানে মার্কিন ডলার ৮২.৪৫ টাকা, ব্যাংক সুদহার ১৮ শতাংশ, বিদ্যুৎ প্রতি একক আট টাকা এবং গ্যাস প্রতি একক ছয় টাকা। কার্যপত্রে বলা হয়, 'এ বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিলে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা পাওয়া যায়।'
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা কার্যপত্রে আরো বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ৪৪ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু ডলারের দাম ওঠানামার কারণে এর প্রভাব সয়াবিন তেলের ওপরে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মসুর ডালের দাম ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর প্রভাবও দেশের বাজারে পড়েছে। পেঁয়াজ ও আলুর দর আন্তর্জাতিক বাজারে না বাড়লেও দেশের বাজারে বাড়ছে। ব্যাংক সুদ হার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এ বছরের ২৮ এপ্রিলের সঙ্গে আগের বছরের একই দিনের মূল্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, এক বছরের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশেরও বেশি। এই সময়ে খোলা পাম অয়েলের দাম বেড়েছে প্রায় আট টাকা। মানভেদে মসুর ডালের দামও বেড়েছে ৮ শতাংশের মতো। আর এখনো রমজান আসতে দুই-তিন মাস বাকি। তা সত্তেও এ পণ্যটির দামও বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। আর কোনো কারণ ছাড়াই আলুর দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে গত বছরের এই সময়ের তুলনায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবেই আলুর দাম বেড়েছে প্রায় ৯১ শতাংশ। বছর ঘুরতেই লবণের দাম বেড়েছে ৪৪ শতাংশ এবং ডিমের দাম ৫১ শতাংশেরও বেশি।
১৫টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকার বাকি যে সাতটি পণ্যের দাম কমেছে তার মধ্যে রয়েছে চাল। মূলত বোরো মৌসুমের কারণে সবার ঘরেই চাল থাকায় এর দাম কমেছে। দাম কমা অন্য পণ্যগুলো হলো রসুন, আদা, চিনি, শুকনা মরিচ ও খেজুর, যেগুলোর প্রয়োজন সব সময় সবার হয় না। তবে এসব পণ্যের মধ্যে কয়েকটির দাম আবার গত এক মাসে বেড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত এক মাসের ব্যবধানে রসুনের দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ এবং খেজুরের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি।

No comments

Powered by Blogger.