রঙ্গব্যঙ্গ-চাল নিয়ে চালবাজি by মোস্তফা কামাল

চাল নিয়ে চালবাজির একটি কাল্পনিক গল্প বলি। আলেক মাস্টার ধলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। গ্রামের মানুষ তাঁকে সৎ মানুষ হিসেবে জানেন। মাস্টার মানুষ, তাই সবাই সম্মানও করেন। তিনি মানুষের সঙ্গে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। ছোট-বড় সবাইকে সালাম দিয়ে হাসিমুখে কুশলবিনিময় করেন।


তিনি অন্যায়-অনিয়ম করতে পারেন_এটা কেউ বিশ্বাসও করেন না। ভোটের আগে গ্রামের মানুষকে তিনি কথা দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে শুধু সাধারণ মানুষের সেবা করবেন। নিজের কিংবা পরিবারের সেবা করবেন না। জীবনের কোনো পর্বে তাঁর লোভ-লালসা ছিল না। এখনো নেই। এখন শুধু মানুষের সেবা করবেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছে। গ্রামের মানুষের আশা, এবার তাদের ভাগ্যের চাকা কিছুটা ঘুরবে। তাদের প্রাপ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলবে না। এখন আর গরিবের চাল-গম মেম্বার-চেয়ারম্যানের বাড়িতে উঠবে না। এখন ঠিকই ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে থেকে গরিবের চাল বিতরণ হবে। সালিসির নামে নিশ্চয়ই এখন আর চেয়ারম্যানের পকেট ভারী হবে না। কেউ বিনা অপরাধে নিপীড়িত হবে না। আবার অপরাধীও পার পাবে না।
আলেক মাস্টারকে নিয়ে বুকভরা আশা বুকেই রইল ধলপুরবাসীর। তারা শুধু আলেক মাস্টারকে নিয়ে কল্পনাই করছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরোপুরি উল্টো। আলেক মাস্টার এখন বেশি বেশি দুষ্ট লোকের সঙ্গে মেশেন। তাদের বেশি সঙ্গ দেন। আর ভালো লোকগুলো আস্তে আস্তে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরতে লাগল। এটা দেখে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ জনৈক কফিল উদ্দিন জানতে চাইলেন, চেয়ারম্যান সাব, আপনি তো আগে দুষ্ট লোকদের থেকে দূরে থাকতেন। এখন দেখছি ওদের সঙ্গেই বেশি মেশেন। ব্যাপারটা কী?
'ব্যাপার কিছুই না। মানুষে বলে, শত্রুকে নাকি উঁচু পিঁড়ি দিতে হয়। দুষ্ট লোকগুলো যাতে আমার ক্ষতি না করতে পারে সে জন্য ওদের সঙ্গে একটু তাল মেলাচ্ছি।'
'তাল মেলাতে গিয়ে আপনার তাল তো কেটে যাচ্ছে।'
'তাই নাকি!'
'জি। দেখছেন না, আগে যারা আপনার চারপাশে ছিল তারা এখন কেউ নেই!'
'ওদের আমার দরকার নেই। সবাই আমার প্রশংসা করে। আর ওরা কথায় কথায় আমার ভুল ধরে।'
'এই তো! আপনার ভুলটা তো এখানেই! ভুল না ধরলে আপনি শোধরাবেন কী করে!'
'আমি কি অন্যায় করেছি যে আমাকে শোধরাতে হবে? শোনো বাপু, আমাকে ওসব জ্ঞান দিতে এসো না। আমি সারা জীবন অমানুষকে মানুষ করেছি। আমাকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। আর তোমরা আমাকে সবক দিচ্ছ!'
'কিন্তু মানুষ যখন অমানুষ হয়, তখন কিন্তু পশুর চেয়েও খারাপ হয়। এটা কি আপনি বিশ্বাস করেন?'
আলেক মাস্টারের মেজাজটা খুব গরম হয়েছে। তিনি বিরক্তির সুরেই বললেন, আরে, রাখো তো বাপু। তোমার কথাবার্তা আমার ভালো লাগছে না। তুমি যাও তো।'
কফিল উদ্দিন বললেন, 'আমি তো চলেই যাব। কোনো দিন আসব না। আরেকটা কথা চেয়ারম্যান সাব, ওইদিন দেখলাম আপনার বাড়িতে নৌকা বোঝাই করে চাল নিয়ে এল। ওগুলো কিসের চাল?'
'সেটা জেনে তুমি কী করবে?'
'নকুল মাস্টার বলল, ওই চাল নাকি ওএমএসের? সত্যি নাকি?'
'কে বলল? নকুল মাস্টার! পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। নকুল মাস্টারের পাখা গজাইছে! ঠিক আছে। সাইজ করার ব্যবস্থা করছি।'
'না না। আপনি নকুল মাস্টারকে কিছু বলবেন না। তাঁর কোনো দোষ নেই। তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম বলেই বলেছে। আপনি একসময় বলেছিলেন, মানুষের সেবা করেই বাকি জীবন পার করবেন। নিজের কিংবা পরিবারের সেবা করবেন না। কি, বলছিলেন না?'
'আরে মানুষের সেবাই তো করছি। এই পুরনো পচা-গান্ধা চাল কি মানুষে খায়! এরা সবাই নাকি বড়লোক হয়ে গেছে। দেখছ না, গ্রামে একটাও মাটির ঘর আছে? বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে সবাই জীবন পাল্টে ফেলেছে। তাই আমিও আমার চরিত্র পাল্টে ফেলেছি। বুঝতে পারছ!'
'কথাটা আপনি মন্দ বলেননি। সৎভাবে কি আর সংসার চলে? সরকারি চালই যদি আপনার পেটে না পড়ল তাহলে আর কিসের চেয়ারম্যান!'
'কফিল উদ্দিন, তোমার লাগলে এক বস্তা নিয়ে যাও। বকবকানি বন্ধ করো।'
'ছি চেয়ারম্যান সাব, ছি! আপনি চরিত্র পাল্টাতে পারেন। আমি গরিব হলেও চরিত্র পাল্টানোর মতো অবস্থা আমার হয়নি। আর আমি হারাম খাই না। হারাম খেলে আমার বদহজম হয়।'
আলেক মাস্টার হাসেন। হাসি থামিয়ে বলেন, কফিল উদ্দিন, তুমি আসলে একটা পাগল মানুষ! মস্তবড় পাগল মানুষ!
তুমি ঘরে যাও। তোমার ভাবি তোমার জন্য মিষ্টি নিয়ে বসে আছে। কয়েকটা মিষ্টি খাও। তোমার মুখটা বড়ই তিতা হয়ে গেছে। এত তিতা ভালো না। হি হি হি!
চেয়ারম্যান সাব! আপনার হাসিটাও এখন দুষ্ট লোকের হাসির মতো হয়ে গেছে। মানুষে বলে না, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ! আপনার সর্বনাশ হয়ে গেছে!
'এই মিয়া! তুমি চুপ করবা? নাকি মুখে গামছা বাঁধব?'
'আমার মুখ আপনি বন্ধ করতে পারবেন। কিন্তু গ্রামের মানুষের মুখ বন্ধ করবেন কী দিয়ে? মানুষ কিন্তু মুখ খুলতে শুরু করেছে। রাস্তা নির্মাণের জন্য গম এনে আপনি বিক্রি করে দিয়েছেন! ব্রিজ নির্মাণের অর্থ আপনি পকেটে ভরেছেন! উত্তরপাড়ার গরিবদের নামে আসা ভিজিএফ কার্ড আপনি নিজের লোকদের নামে করিয়েছেন। একদা সৎ মাস্টারের পরিচয় এখন দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান!'
কথা শেষ করে কফিল উদ্দিন হন হন করে চলে গেলেন। চেয়ারম্যান সাহেব তাঁর দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তিনি মনে মনে ভাবেন, কফিল উদ্দিনের মতো পুঁচকে ছেলে তাঁর মুখের ওপর এত বড় কথা বলে গেল! সে নিজে এসব কথা বলেনি। নিশ্চয়ই কেউ তাকে উসকে দিয়েছে। নিশ্চয়ই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।
চেয়ারম্যান সাহেব দরাজ গলায় স্ত্রীকে ডাকলেন। কোহিনূর, কোহিনূর...
কোহিনূর বেগম দৌড়ে এলেন। চেয়ারম্যান সাহেব তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, কোহিনূর, তুমি বলো তো, আমি কি দুর্নীতিবাজ?
কোহিনূর বেগম কোনো জবাব দিলেন না। তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.