দ্রব্যমূল্য-কেন তবু জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকে? by আনু মুহাম্মদ

মানুষ এখন শুধু জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে যে অস্থির, তা নয়, অস্থির ও ক্রুদ্ধ সরকারের নানা ব্যক্তির অসংলগ্ন কথাবার্তা এবং স্পষ্টতই ‘অর্থহীন’ তৎপরতায়ও। তাঁদের কর্মকাণ্ডে বাজার আরও তেজি হয়, লাভবান হয় কিছু লোক, বহু ব্যক্তির জীবন অতিষ্ঠ হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীর দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি শুনলেই মানুষ তাই আতঙ্কিত হয়, যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর


সন্ত্রাস দমনের কথা শুনলে সন্ত্রস্ত হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী মানুষকে কম খেতে বলেছেন। আর কত কম খাবে মানুষ? সরকারি দলিল বলছে, শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পুষ্টি গ্রহণ করতে পারছে, শতকরা পাঁচ জন গ্রহণ করছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বেড়েছে দুই গুণ; কিন্তু একই সময়ে খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। কেন তবে কম খাবে মানুষ?

২.
অর্থশাস্ত্রের সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জিনিসপত্রের দাম বাজারের চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। জোগান স্থির থেকে চাহিদা বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, চাহিদা কমলে দাম কমে। অথবা জোগান যতটা আছে, চাহিদা যদি তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে দাম আগের তুলনায় বেড়ে যায়। আবার চাহিদা স্থির থাকলে, মানে চাহিদার ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না, কিন্তু জোগান বেড়ে গেল, তাহলে দাম কমে যাবে। অথবা জোগান যতটা আছে, তার চাহিদা সেই রকম নেই, তা হলেও দাম কমে যাবে।
চাল, ডাল, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন কিংবা বাসভাড়া-ঘরভাড়া যা-ই হোক না কেন, তার দাম যদি বাড়তে থাকে, তাহলে প্রচলিত অর্থশাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কারণ খোঁজার জন্য চাহিদা-জোগানের দিকেই তাকানো হয়। জোগান কমে যেতে পারে, কোনো কারণে যদি উৎপাদন কমে যায়, কিংবা যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোনো কারণে উৎপাদন বিনষ্ট হয়, কিংবা যদি উৎপাদন-পরবর্তী বিপণন কোনো না কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। চাহিদা বেড়ে যেতে পারে দুইভাবে: এক. কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষ ধরে কোনো নির্দিষ্ট একটি বা একগুচ্ছ দ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে; কিংবা দুই. সাধারণভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় নিকৃষ্ট পণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্যেরই চাহিদা বেড়ে যেতে পারে।
প্রথম কারণটি বিশেষ উপলক্ষ ধরে হয় বলে তা সাধারণ চিত্র হওয়ার কথা নয়। যেমন—রমজান মাসে বাংলাদেশে মুড়ি, পেঁয়াজ ও ছোলার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু চাহিদার এই বৃদ্ধি যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের এবং আগে থেকেই জানা, সে জন্য এর জোগানও বেড়ে যায়। রমজান মাসে বিভিন্ন স্থান থেকে যে পরিমাণ মুড়ি এবং দোকানে দোকানে ছোলা, পেঁয়াজ, জিলাপি উৎপাদিত হয়, বছরের আর কোনো সময়েই তা হয় না। এতে বর্ধিত চাহিদা উপস্থিত হলেও অধিকতর বর্ধিত জোগান আসায় দাম বাড়ার কথা নয়। তবু বাড়ে!
রমজান মাস যদিও সংযমের মাস, কিন্তু রোজা রাখার সুবাদে বা তার উপলক্ষে খাওয়াদাওয়ার প্রতি একটু বিশেষ মনোযোগ দেন একেবারে অক্ষম ছাড়া সবাই। এ কারণে তেল, চিনি, ডাল, মাছ, মাংস, দুধ, মিষ্টি, সবজিসহ তৈরি করা নানা খাবারের চাহিদা বাড়ে। আবার জোগানও বাড়ে। কিন্তু দামও বাড়ে, বাড়ছেই। রমজান মাসে এবং আগে থেকেই জিনিসপত্রের এই মূল্যবৃদ্ধি তাই শুধু অর্থনীতির চাহিদা-জোগান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে আরও বিশেষ ভূমিকা পালন করে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে চাহিদার অনমনীয়তা। দাম বাড়লেও চাহিদা এখানে কমে না। এই অনমনীয়তা বা বাধ্যবাধকতার সুযোগটিই গ্রহণ করতে চেষ্টা করেন ব্যবসায়ীরা।

৩.
ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণভাবে অর্থনীতিতে গড় চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সব পর্যায়ের পেশাজীবীসহ আয়ের দিকটা বিশ্লেষণ করলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার আরেক নাম প্রকৃত আয়ের বৃদ্ধি। টাকাপয়সার আয় বাড়লেই ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি দামস্তর বেড়ে যায়, মুদ্রাস্ফীতি হয়, টাকার মূল্য বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে টাকার অঙ্কে আয় বাড়লেও প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে।
আয়ের বিশ্লেষণ করলে আমরা বরং একটি বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রকৃত আয়ের নিম্নগতি দেখি। ৩০ বছর আগের ও পরের টাকার অঙ্কে মজুরি ও দামস্তর নিয়ে সাধারণ হিসাবেই প্রকৃত চেহারাটি পাওয়া যাবে। আমরা যদি তুলনার জন্য দুই সময়ের গড় ও ন্যূনতম মজুরি বিবেচনা করি, তাহলে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায় যে শিল্পশ্রমিকদের গড় প্রকৃত মজুরি ৩০ বছর আগের তুলনায় অন্তত এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। পেশাজীবীদের মধ্যে যদি সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকদের কথাই বিবেচনা করি, যেমন—সচিব, যুগ্ম সচিব কিংবা রাষ্ট্রীয় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক কিংবা প্রকৌশলী, ডাক্তারদের—দেখব, গত ৩০ বছরে টাকার অঙ্কে তাঁদের বেতন বেড়েছে ১০ থেকে ২০ গুণ। কিন্তু এই সময়কালে সাধারণ দামস্তর আরও বেড়েছে; কমপক্ষে ৩০ গুণ।
তবে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। চাহিদার মধ্যে বৈচিত্র্য এসেছে। প্রায় সবকিছুই বাজার থেকে কিনতে হয়—এ রকম মানুষ বাড়ছে। তাতে চাহিদার অনেক সম্প্রসারণ হয়েছে। আবার জোগানও বেড়েছে, কোনো কোনো পণ্যের জোগানই চাহিদা তৈরি করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয়ের গতিসহ এই নানা দিক বিবেচনা করলে তাই কোনোভাবেই বলা যায় না যে জোগানের তুলনায় অসমানুপাতিক হারে গড় চাহিদা বেড়েছে।
প্রকৃত আয় বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে কমে গেছে—এই তথ্যে আমাদের খটকা লাগার যথেষ্ট কারণ আছে। দুটি প্রশ্ন সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এসে বিড়বিড় করতে পারে। যেমন: ১. তা-ই যদি হয়, তাহলে এত কেনাকাটা, এত বাজার কী করে চলছে? ২. কী করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যায়েও নতুন নতুন পণ্য যোগ হয়েছে?
পরিস্থিতির এই আপাত-স্ববিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর উত্তর পেতে গেলে অর্থনীতির ধরনে কী কী পরিবর্তন হয়েছে, সেই দিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে, প্রতিটি পরিবারে কীভাবে একজনের বদলে একাধিক ব্যক্তির উপার্জনের তাগিদ তৈরি হয়েছে, বেশি সময় কাজ করতে হচ্ছে, নির্দিষ্ট আয়ের বাইরে আয়ের নানা পথ ও পেশা তৈরি হচ্ছে, প্রবাসী-আয়ের প্রবাহ যোগ হয়েছে, সমাজের একটি অংশের আয়ের বিপুল বৃদ্ধি ঘটেছে; বিভিন্ন ধরনের ঋণবাজার কৃত্রিম ক্রয়ক্ষমতা তৈরি করেছে এবং সর্বোপরি বাজার সম্পর্কের বিকাশ ও ভোগবাদিতার সম্প্রসারণ পণ্য উন্মাদনার প্রসার ঘটিয়েছে।

৪.
চাল, ডাল, চিনি, সবজি ইত্যাদির জোগানধারা খেয়াল করলে আমরা স্পষ্টই দেখি, জোগান যে কম হচ্ছে, তা নয়। তাহলে খাদ্যসহ জিনিসপত্রের ক্ষণে ক্ষণে, ধীরে কিংবা লাফিয়ে মূল্যবৃদ্ধি কেন? দেশের ভেতর যেসব পণ্যের উৎপাদনে নানা কারণে ঘাটতি হচ্ছে, সেসব পণ্যের জোগানে বৈধ আমদানি বা চোরাচালান (অবৈধ আমদানি) বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। যেসব আমদানিকৃত পণ্যের আমদানি দামও বাড়েনি, সেগুলোরও অভ্যন্তরীণ দাম বাড়ছে (দেখুন প্রথম আলো, ৪ আগস্ট ২০১১)। কেন? এমন অনেক পণ্যের বাজারদর চড়া থাকছে, যেগুলো দেশে উৎপাদিত এবং উৎপাদনের স্তরে, সেই পণ্যের দাম ভোক্তার পর্যায়ে দামের তুলনায় অনেক কম। যখন ঢাকার বাজারে মাছ, সবজি, চাল ইত্যাদির দাম বাড়ছে, তখন রাজশাহী, জামালপুর বা দিনাজপুরের উৎপাদকের প্রাপ্তি দাম বাড়ছে না। তাহলে বর্ধিত দাম যাচ্ছে কোথায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা পাব ‘মুক্ত বাজার’-এর আড়ালে কতিপয় গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও একচেটিয়া কর্তৃত্বের সন্ধান। শনাক্ত হবে কতিপয় আমদানিকারক, কতিপয় পাইকার ও পণ্য বাজারজাত-প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় খাজনা বা চাঁদাবাজ গোষ্ঠীর দাপট। চাহিদা-জোগানের অদৃশ্য হস্ত নয়, কতিপয় সংগঠিত গোষ্ঠীর দৃশ্যমান হস্ত দিয়েই অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির রহস্য বোঝা যাবে। বাজার যে কতিপয় গোষ্ঠী প্রচলিত কথায় ‘সিন্ডিকেট’ দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে, তার সর্বশেষ চিত্র ‘নিত্যপণ্যের বাজার পাঁচ শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও স্পষ্ট হয়েছে (প্রথম আলো, ১ আগস্ট ২০১১)।

৫.
এসব তৎপরতা দুর্নীতি বলেই সাধারণভাবে গণ্য। কিন্তু দুর্নীতি কোনো আলগা বিষয় নয়। এর শিকড় সরকারনির্বিশেষে, নীতি-কাঠামোর (পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক) মধ্যেই দেখতে হবে, যা অবিরাম মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া জোরদার করছে। মূল্যবৃদ্ধির আন্তর্জাতিক মাত্রাটিও গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম এবং সেই সঙ্গে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আর শুধু কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণ-প্রক্রিয়ায় এটি এখন অনেক বেশি বিশ্বায়িত। তবে এগুলো মোটেই কথিত মুক্তবাজারের মধ্য দিয়ে ঘটে না, ঘটে একচেটিয়া পুঁজির কতিপয় বাহুর কঠোর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে। এই কতিপয় বাহুর মধ্যে যেমন আছে একচেটিয়াকৃত বিশ্ববাজার, বহুজাতিক কোম্পানি, সেই সঙ্গে আছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের মতো দেশের সরকারের ‘ফ্রেন্ড, ফিলসফার অ্যান্ড গাইড’। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে দেশীয় সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের সঙ্গে সঙ্গে এদের ভূমিকাও কম নয়। ‘দাতা সংস্থা’ পরিচয় নিয়ে নির্ভরশীলতা ও চিন্তার আধিপত্য তৈরি করে নানা উন্নয়ন-কর্মসূচি বা সংস্কারের নামে এসব প্রতিষ্ঠান বস্তুত জনস্বার্থের বিনিময়ে মুনাফামুখী তৎপরতার পথ তৈরি করতেই নিয়োজিত থাকে। এভাবেই বিচার-বিবেচনা ছাড়া বেসরকারীকরণ, আমদানি বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় খাতে তহবিল কাটছাঁট, শিক্ষা-চিকিৎসা-পানির বাণিজ্যিকীকরণ, বাজারের স্বাধীনতার নামে কতিপয় গোষ্ঠীর একক কর্তৃত্ব, গ্যাস-তেল-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি-উপকরণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য, জাতীয় প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করা, জাতীয় সক্ষমতার পথে বাধা সৃষ্টি ইত্যাদি ‘উন্নয়ন’ নীতি ও কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। গত তিন দশকে বিভিন্ন সরকারের গৃহীত এসব নীতি ও কর্মসূচিই দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বৈষম্য বৃদ্ধি এবং সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। জনস্বার্থবিরোধী ‘উন্নয়ন’-নীতি ও কতিপয় ব্যক্তির দুর্নীতির বলগাহীন তৎপরতায় পিষ্ট হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।

৫ আগস্ট, ২০১১
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.