বিশ্বমন্দা মোকাবিলায় শ্রমিক ও উৎপাদনবান্ধব নীতি জরুরি by ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান

মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিন। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা বিনোদনের দাবিতে ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকরা আন্দোলন ও সংগ্রাম করেন এবং ওই আন্দোলনে বহু শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন, বহু শ্রমিক আহত হন। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরা দাবি আদায়ে সমর্থ হন।


সেই থেকেই বিশ্বব্যাপী শ্রমিকরা এ দিনটিকে শ্রমিকদের বিজয়ের দিন এবং অনুপ্রেরণার দিন হিসেবে পালন করে আসছেন। আমাদের দেশে এ দিবসটি এখন বিজয়োৎসব বা অনুপ্রেরণার পরিবর্তে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসের পরিবর্তন, প্রযুক্তির উন্নয়নের মধ্যে পৃথিবীব্যাপী এক ধরনের বিপ্লব সাধিত হয়েছে। মানুষ উন্নত থেকে আরো উন্নত জীবন গড়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু মে দিবসের ১২৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও আমাদের দেশের শ্রমিকদের উন্নত জীবনযাপন তো দূরের কথা, এ দেশের শ্রমিক-কর্মচারীরা আজও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সভ্যতা বা উন্নতির ছিটেফোঁটাও আমাদের দেশের শ্রমিকদের ভাগ্যে জোটেনি। এ অভিযোগ খুব পুষ্ট যে বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে সরকার বা কুচক্রী মহল এ দেশের প্রতিষ্ঠিত সব বড় কলকারখানা বন্ধ করে দিয়েছে বা দিচ্ছে, যা দেশের জন্য একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এ পরিস্থিতিতে নতুন আঙ্গিকে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা। বিশ্বজুড়ে বিশ্বমন্দার এমন প্রসার ঘটছে, মনে হচ্ছে এ যেন শিল্পাঙ্গনে আরেক সিডর। এটা পুঁজিবাদী-ব্যবস্থার সৃষ্ট সংকট।
এ বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা প্রকৃতপক্ষে শিল্প-কলকারখানার মালিকের চেয়েও শ্রমিকের তথা শ্রমজীবী মানুষের ওপর 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হিসেবে জগদ্দল পাথরের মতো আচরণ করছে। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, চাকরিচ্যুতি ও বেতন-ভাতা কমে যাওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রকৃত মজুরি সর্বোপরি সাধারণ মানুুষের ক্রয়ক্ষমতা দারুণভাবে হ্রাস পাওয়ার কারণে শ্রমজীবী মানুষ দিশেহারা। বিশ্বমন্দার প্রভাব আমাদের দেশে শিল্প ও শ্রমিক সেক্টরে পড়তে শুরু করেছে। কারখানাগুলো কারণে-অকারণে বন্ধ বা আকারে ছোট করে ফেলা হচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত ফসল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন দেশের শিল্প ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি স্বাধীনতার অন্যতম মূল চেতনা লুণ্ঠিত হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শ্রমঘন শিল্প একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওইসব কারখানার দক্ষ শ্রমিকরা আজ অর্ধাহারে-অনাহারে দিনযাপন করছেন। পাশাপাশি তেমন নতুন শিল্প গড়ে না ওঠায় নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না_পরিণতিতে সমাজে বেকারত্বের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। নতুন উদ্যমে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি এবং প্রাইভেট শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। আজকে বাংলাদেশের লুটেরা ধনিক শ্রেণীও উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশের মতো জনগণের ট্যাঙ্রে টাকায় মন্দার দোহাই দিয়ে তাদের উদ্ধার করতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। মহামন্দায় আক্রান্ত দেশগুলোর প্রাইভেট ব্যাংক ও শিল্পপতিদের রক্ষায় নিজ নিজ দেশের তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে উদ্ধার কর্মসূচি ঘোষণা করছে। আমাদের দেশের শিল্পপতিরাও ইতিমধ্যে সরকারের কাছে এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিভিন্ন চেম্বার প্রতিনিয়ত দাবি জানাচ্ছে নগদ ভর্তুকির জন্য। পাশাপাশি তথাকথিত ক্ষতিগ্রস্ত লাখো-কোটি টাকার মালিকরা তাদের কালো টাকা সাদা করার দাবি তুলছেন। জনগণের ট্যাঙ্রে টাকায় এসব লুটেরা ধনিককে উদ্ধারের দাবি সাধারণ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের টাকার সুদের হার কমানোর পাশাপাশি মুনাফার হার কমিয়ে উৎপাদন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত মূল শক্তি শ্রমিক-কর্মচারীদের বাঁচার মতো মজুরি ও ভাতাদি প্রদান করে শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
গার্মেন্ট শিল্পে তৈরি পোশাকের ক্রেতা বা বিশ্ববাজারে চাহিদা না থাকলে এ শিল্পে নগদ ভর্তুকি দেওয়া হলেও গার্মেন্টের ওইসব তৈরি পোশাক কে কিনবে। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে, তা হলো শ্রমিকবান্ধব কর্মসূচি বা নীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি বিশ্বমন্দা পরিস্থিতি শিল্প রক্ষার্থে শুধু ঢালাওভাবে নয়, সুনির্দিষ্ট শিল্প সমস্যার জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্যাকেজের অধীনে সরকারকে অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ইত্যাদি অবকাঠামোগত অসুবিধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে, পণ্যের গুণগতমান বৃদ্ধি, প্রযুক্তির বিকাশ, শ্রমিক প্রশিক্ষণ, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব কারখানা আর্থিক তারল্য সংকটে পড়ে শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছে না এবং সে জন্য কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হচ্ছে, তাদের উদ্ধারের জন্য উপর্যুক্ত মাত্রায় কনসেশনাল সুদে ও শর্তে পর্যাপ্ত টার্ম লোনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্বায়নের নামে পুঁজিবাদীদের আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় আমাদের মতো দেশগুলোর শিল্পায়নে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। পাটসহ আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। সংস্কার বা অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে জনগণ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলোকে কোনোভাবেই বেসরকারিকরণ বা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করে নয়, বরং সরকারি উদ্যোগে নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানা ও বেসরকারি শিল্পগুলোর সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বন্ধ কলকারখানা চালুর ওপর জোর দিলে শ্রমজীবী মানুষ তথা সাধারণ জনগণের জন্য রাষ্ট্রের ওয়েলফেয়ার চরিত্রটি বিকশিত হবে। এ সংকটাপন্ন অবস্থায় দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে দেশের স্বার্থেই দেশীয় শিল্প এবং শ্রমিক শ্রেণীকে রক্ষা করা। তাই এই দৃষ্টিকোণে শিল্পপতি থেকে শুরু করে সরকার এবং শ্রমজীবী মানুষকে যথাযথ দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন

No comments

Powered by Blogger.