মিজানুর রশিদ হত্যা মামলা-আসিফ ও রাজনের যাবজ্জীবন সাজা

ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদকারী কলেজশিক্ষক মিজানুর রশিদ হত্যা মামলার রায়ে দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক একরামুল হক চৌধুরী এই রায় ঘোষণা করেন।


রায় ঘোষণার সময় আসামি মামুনুর রশিদ ওরফে আসিফ আলী ও আবদুল আওয়াল ওরফে রাজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত থেকে রাজশাহী কারাগারে পাঠানোর সময় আসামিরা কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করেন।
রায়ে বলা হয়, দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় সন্দেহাতীতভাবে দুই আসামির অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। সাজার মেয়াদ থেকে তাঁদের হাজতবাসের সময় বাদ যাবে।
২০১০ সালের নভেম্বর মাসে গ্রেপ্তারের পর থেকে আসামিরা হাজতে রয়েছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক মিজান হত্যা মামলায় ৩০ জনকে সাক্ষী করা হয়। গত বছরের ২ নভেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ কার্যদিবসে ২০ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এর মধ্যে এক সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করেন আদালত। বাকি ১০ সাক্ষীর মধ্যে তিনজন আসামিপক্ষের মাইক্রোবাসে চড়ে সাক্ষ্য দিতে আসায় আদালত তাঁদের সাক্ষ্য নেননি। অন্য সাতজনের সাক্ষ্য নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি আদালত।
ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার লোকমানপুর কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক মিজান বখাটে আসিফ ও রাজনকে শাসন করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর মোটরসাইকেল দিয়ে মিজানকে আঘাত করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ২৫ অক্টোবর ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মিজানের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে নাটোরসহ দেশের অসংখ্য সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কালোব্যাজ ধারণ, মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করে। তারা বখাটে আসিফ ও রাজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি জানান।
২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর মিজান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। নাটোরের অতিরিক্ত দায়রা জজ গত বছরের ১৯ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য মামলাটি রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠান।
রাষ্ট্রপক্ষে এই মামলা পরিচালনা করেন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি এন্তাজুল হক। সঙ্গে ছিলেন বাদীপক্ষের আইনজীবী অংকুর সেন ও শাহনেওয়াজ এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দিল সেতারা ও আবদুল মালেক। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী হামিদুল হক ও আবু বাকার।
ফাঁসির প্রত্যাশা: মামলার বাদী নিহত শিক্ষক মিজানের ভাই মামুনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভবিষ্যতে যাতে কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদকারী কোনো ব্যক্তি বা শিক্ষককে হত্যা করার সাহস না পান, সেজন্য আমাদের প্রত্যাশা ছিল আসামিদের ফাঁসির শাস্তি হবে। তার পরও আমরা রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’
লোকমানপুর কলেজের এক ছাত্রী বলেন, ‘স্যারের হত্যাকারীদের ফাঁসি হলে আমরা আরও বেশি খুশি হতাম।’ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ওই কলেজের অধ্যক্ষ মতিউর রহমান।
একনজরে আসিফ ও রাজন: আসামি আসিফ ও রাজন সম্পর্কে শ্যালক-দুলাভাই। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মাস তিনেক আগে রাজন আসিফের এক বোনকে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করেন। রাজনের বিরুদ্ধে বাগাতিপাড়া থানায় স্থানীয় তমালতলা কৃষি ও কারিগরি কলেজের ছাত্র দোহাকে হত্যার অভিযোগে মামলা রয়েছে। তাঁরা দুজনই ওই কলেজের ছাত্র।
আপিল হবে: রায় ঘোষণার পর আসিফের বাবা আবদুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচার পাইনি। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব। আশা করছি সেখানে আমাদের ছেলেরা খালাস পাবে।’

No comments

Powered by Blogger.