আইন ও সংবিধান-নিয়োগের কষ্টিপাথর: আইন, নাকি ক্ষমতা? by শাহ্দীন মালিক

বড় বড় পদে নিয়োগ তিন প্রকারের। এক, বন্দুক উঁচিয়ে হাজির হয়ে বললেন, পদটি আমার; আপনি বিদায় হন। এই পদ্ধতির নিয়োগের একটা চরম ও জঘন্যতম উদাহরণ হলো ১৫ আগস্ট। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে তাঁর পদে অন্যদের আসীন করানো হয়।


পরবর্তী এক রাষ্ট্রপতিকে অর্থাৎ জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে তাঁর পদ দখল করতে চেয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন বড় বড় কর্মকর্তা। ১৯৮১ সালে বন্দুক উঁচিয়ে পদ দখলের চেষ্টায় সাফল্য না এলেও তার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২৪ মার্চ ১৯৮২ একই চেষ্টা করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং অত্যন্ত সাফল্যজনকভাবে বীরদর্পে নিজেকে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।
এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো, এক-এগারো। আবার কিছু লোক বন্দুক-টন্দুক নিয়ে নিজেদের বড় বড় পদে নিয়োগ প্রদান করে দেশ পরিচালনায় নিবেদিতপ্রাণ চেহারায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। তবে সেবার কিছুটা রাখঢাক ছিল। এবং বিতাড়ন করতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগেনি। যদিও আগেরজন অর্থাৎ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নিয়োগ বাতিল করতে আমাদের সময় লেগেছিল কম-বেশি আট বছর।
দ্বিতীয় প্রকারের নিয়োগ মামা-ভাগনে বা নিজের লোক হওয়ার যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। একজন বড় পদাধিকারী যাঁর নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা আছে, তিনি যদি আপনার মামা হন এবং আপনি তাঁর পেয়ারের ভাগনে বা ভাগনি হন, তাহলে মামার বদৌলতে বড় পদে নিয়োগ পাওয়া যায়। অথবা নিয়োগদাতার নিজের লোক হলে আর কোনো যোগ্যতার বিশেষ দরকার পড়ে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় বড় সব পদ তখন সহজেই আপনার হাতের মুঠোয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মায় মন্ত্রী পদ পর্যন্ত সবই দলীয় খাতিরে অনায়াসে আয়ত্ত করা সম্ভব। যোগ্যতা অত্যন্ত গৌণ। দলের পক্ষে অথবা দলীয় নেতার গুণগান গেয়ে বই লিখলে সেটাও একটা পরম যোগ্যতা বলে গণ্য হয়। তবে এ ধরনের কিছু পদে বিশেষত পদগুলো যদি দেশের জনগণের ভাগ্যের ওপর খুব বেশি প্রভাব না ফেলে, তাহলে আপত্তির বেশি কিছু নেই। যেমন, দলীয় লোককে যদি গরু প্রতিপালন কমিশন অথবা ছাগল প্রজননকেন্দ্রের প্রধান করা হয়, তাহলে আমার-আপনার বিশেষ গোস্সা করার কারণ থাকার কথা নয়। কিন্তু দলীয় বিবেচনায়, কথার কথা, কেউ যদি আণবিক বোমা বানানো কমিশনের চেয়ারম্যান হন, তাহলে আমরা সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হব। কারণ, ‘সে ব্যাটা ভুলক্রমে আতশবাজি মনে করে আণবিক বোমা ফাটালে বেঘোরে আমাদের সবার প্রাণ যাবে। এভাবে প্রাণ হারাতে আমরা সবাই নিশ্চয়ই উদ্গ্রীব নই।’
আর নিয়োগের তৃতীয় পন্থা: যার সহি পন্থা হলো, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বড় পদে নিয়োগ পাওয়া, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার বলে দেশ ও দশের কাজ করার জন্য নিয়োগ লাভ করা। প্রায় ৪০ বছর লেগে গেলেও জনগণের ভোটের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটা মোটামুটি আমাদের রপ্ত হয়ে গেছে। সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইত্যাদি পদে ভোটের মাধ্যমে নিয়োগ এখন ঠিকভাবেই হচ্ছে। কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যখন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যেমন, সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রদানের ক্ষমতা পাচ্ছেন, তখন সেটার অপপ্রয়োগ থেকে আজ পর্যন্ত বিরত হননি। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ করা থেকে তাঁরা সব সময়ই বিরত থাকছেন। মামা-ভাগনে অথবা দলীয় লোকের মডেল থেকে কোনোমতেই তাঁরা বেরিয়ে আসতে পারছেন না। ফলে খেসারত দিয়ে চলছি আমরা জনগণ।

দুই.
সাংবিধানিক পদগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিয়োগের ব্যাপারটা এখন সবার সামনে উঠে এসেছে। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের কাজের মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ শেষ হয়ে যাবে। এই তথ্য মোটামুটি আমরা সবাই এখন জানি। আর সবার মনেই প্রশ্ন, মধ্য ফেব্রুয়ারির পর কারা হবেন নির্বাচন কমিশনার।
দুনিয়ার সব দেশেই নির্বাচন কমিশন আছে। পদবির একটু হেরফের হতে পারে; তবে সব দেশের নির্বাচন কমিশনে একজন প্রধান এবং কম-বেশি দুই থেকে পাঁচজন তাঁর সহযোগী-সদস্য অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনার থাকেন। এবং তাঁরা একটা গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় নিয়োগ লাভ করেন। কম-বেশি বছর ৩০ আগে, ভারতেও নির্বাচন কমিশনার কে হবেন, কতজন হবেন, এই নিয়ে হুলস্থুল থেকে শুরু করে মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত হয়েছিল। যতদূর জানি, ইউরোপ-আমেরিকায়ও নির্বাচন হয়। সেসব দেশেও নির্বাচন কমিশন আছে, কিন্তু নিয়োগ নিয়ে হুলস্থুলের খবর পাইনি বহু যুগ।
অর্থাৎ, এমনটি নয় যে অন্য কোনো দেশে নির্বাচন কমিশন নেই। এটা শুধু আমাদের দেশেই আছে। অতএব, কীভাবে কী করতে হবে আমরা ঠাহর করতে পারছি না। ইচ্ছা করলেই যোগ্য লোকের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদ্ধতি সহজেই ঠিক করে ফেলা যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো নিয়োগের ব্যাপারে একটা আইন প্রণয়ন করা যায়। নিয়োগ-সংক্রান্ত এ ধরনের আইন মোটেও জটিল নয়। আইনে একটা নিয়োগ কমিটির কথা বলা থাকে—যেমন বর্তমান অথবা সাবেক বিচারপতি, একজন বা দুজন মন্ত্রী, প্রশাসন থেকে অবসরপ্রাপ্ত কেবিনেট অথবা সংস্থাপনসচিব বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইত্যাদি গোছের আস্থাভাজন ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য নিয়োগপ্রার্থীর একটা প্রাথমিক তালিকা প্রণয়ন করবেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে এই তালিকা অবশ্যই জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এই তালিকা নিয়ে দিন ১৫ পত্রপত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন, সভা-সেমিনারে আলোচনা, মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা হলে অদক্ষ ও দলীয় প্রার্থীদের নাম আপনা থেকেই ঝরে পড়বে। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক তালিকা থেকে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করবে আরও একটা বড় কিন্তু ছোট কমিটি। বড় এই অর্থে যে দ্বিতীয় কমিটিতে থাকতে পারেন স্পিকার, সরকারি দলের উপনেতা, চিফ হুইপ এবং একইভাবে বিরোধী দলের উপনেতা অথবা সেই মাপের অন্য কোনো প্রতিনিধি। ছোট এই অর্থে যে এই কমিটির আকার বড় করা নিষ্প্রয়োজন। তা ছাড়া আলাপ-আলোচনার ফলে প্রাথমিক তালিকা থেকে চূড়ান্ত তালিকা অনেকটা নির্দিষ্ট হয়েই যাবে।
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে এ ধরনের একটা কাঠামো ও প্রক্রিয়াসংবলিত আইন প্রণয়ন মোটেও দুরূহ কাজ নয়। এর দুরূহ দিকটা হলো, রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা। তবে এখন প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা না হলে দেশ অচিরেই চরমভাবে অস্থিতিশীল হবে। যার দায় বর্তাবে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের ওপর। দোষ হবে কারও একটু বেশি অথবা কারও একটু কম। কিন্তু এই আসন্ন অস্থিতিশীলতার খেসারত দিতে জনগণ আর প্রস্তুত নয়। তবে সাধারণভাবে আইন প্রণয়নের প্রধান দায়ভার সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের। অতএব, উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্বটাও তাদের।

তিন.
তবে ভরসা পাই না। কেন জানি মনে হয়, আমাদের নেতা-নেত্রীরা হয় আইন-সংবিধান বোঝেন না, অথবা তার ধার ধারেন না। সদ্য অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোতেই দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস।’ ভাবখানা মনে হয়, ক্ষমতা আমারই বটে, কিন্তু জনগণ হলো তার উৎস। আমার প্রথম বর্ষের সংবিধান ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা প্রথম লেকচারের পরই বুঝতে পারেন যে সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের সবচেয়ে মূল্যবান যে কথাটা লেখা আছে সেটা হলো, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ উৎস আর মালিকের মধ্যে ফারাক অনেক। জনগণ যেই ক্ষমতার মালিক, সেই ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে অত্যন্ত সীমিত আকারে প্রয়োগ করা ‘মন্ত্রী-মিনিস্টারদের’ কর্তব্য। ম্যানেজার কখনো মালিক হন না। অর্থাৎ, খেয়ালখুশিমতো নিয়োগ দেওয়া যাবে না। আইন করে আইন অনুযায়ী দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই নিয়োগ দিতে হবে।
একইভাবে আলামত দেখতে পাচ্ছি, দলীয় বিবেচনায় আবারও বিচারপতি নিয়োগের পাঁয়তারা চলছে। বিচারপতি নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কথা সংবিধানে ১৯৭২ থেকেই বলা আছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর গুটি কয়েক ভালো দিকের একটা হলো, সংশোধিত ৯৫ অনুচ্ছেদ; যেখানে বলা হয়েছে প্রথমত, ‘প্রধান বিচারপতির সহিত পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারপতিকে নিয়োগ দান করিবেন।’ এমতাবস্থায়, প্রধান বিচারপতি অবশ্যই যোগ্যতা ও দক্ষতাকে বিচারপতি নিয়োগে যে প্রধান মাপকাঠি করবেন, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তদুপরি এবং বলা বাহুল্য প্রধান বিচারপতি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন এবং রাজনৈতিক বিবেচনা তাঁর আমলে নেওয়ারও কথা নয়। তবে বিচারপতি নিয়োগেও অবিলম্বে আইন প্রণয়ন করা দরকার। বিচারপতি নিয়োগে এই আইন প্রণয়নের কথা প্রায় ৪০ বছর ধরে সংবিধানের ৯৫ (২) (গ) এ বলা আছে। এই ৪০ বছরে অনেকেই অনেকবার ক্ষমতায় এসেছেন ও গিয়েছেন। কিন্তু বিচার বিভাগকে নিজের লোক নিয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার কুমতলব পরিহার করতে পারেননি। দেরিতে হলেও সময় এসেছে, এই আইন প্রণয়ন করে নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার। এই আইন প্রণয়ন না করে, খেয়ালখুশিমতো বিচারপতি নিয়োগ দিলে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা আরও কমবে। সেটা হবে দেশ ও জাতির জন্য আত্মঘাতী।
শেষের কথা: নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিচারপতি নিয়োগের আইন সংসদের আগামী অধিবেশনেই উত্থাপিত ও পাস হতে হবে। এগুলো কঠিন কোনো আইন নয়। অবিলম্বে এই আইন দুটো না হলে আমরা ধরে নিতে বাধ্য হব যে ক্ষমতায় থাকা অথবা ক্ষমতায় যাওয়া ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রধান উদ্দেশ্য। দেশ ও সমাজের উন্নতির জন্য স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ-প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা তাদের কাছে কাম্য নয়। ক্ষমতার হালুয়া-রুটির লোভ সংবরণ তাদের জন্য অসাধ্য।
ড. শাহ্দীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, শিক্ষক, ব্র্যাক স্কুল অব ল।

No comments

Powered by Blogger.