নতুন করে অনুপ্রাণিত হলাম by তৌহিদা শিরোপা

কাজের মাঝে খুঁজে পান আনন্দ। পেশাগত জীবনে নিয়েছেন বহু চ্যালেঞ্জ। তাঁর কাছে সফলতার মূলমন্ত্র হলো প্রতিদিন ভালো কাজ করে যাওয়া। সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনকে ধারণ করা। নিজেও সেই পথে হেঁটেছেন। হয়েছেন সফল মানুষ। বলছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানার কথা। এর আগে তিনিই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী মহাব্যবস্থাপক ও নির্বাহী পরিচালক হয়েছেন।


‘ছাত্রজীবন থেকেই ইচ্ছা ছিল চাকরি করার। মনে হতো কর্মজীবী নারীরা তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে পারছে দেশের জন্য। তাদের দেখলেই শ্রদ্ধায় মনটা ভরে উঠত। তখন কর্মজীবী নারীর সংখ্যাও ছিল কম। কিন্তু কোন পেশাকে বেছে নেব, সেটি কখনো ভাবিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলাম। স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) প্রায় তিন মাস কাজ করেছি। সে সময় পত্রিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। নিয়োগটি আমাকে বেশ আকর্ষণ করে। আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকে তখন কম্পিউটার উপবিভাগে নতুন কর্মকর্তা নেওয়া হবে। যোগ্যতা ছিল বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। বেশ মজা লাগল। আবেদন করলাম। এরই মাঝে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যোগ দিলাম। ছয় মাস কাজ করেছি সেখানে। তবে আমি চাইছিলাম আরও উদ্ভাবনীমূলক কাজের সুযোগ। এ সময়ই বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার উপবিভাগে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পদে চাকরি হয়ে গেল। কম্পিউটার প্রোগ্রাম লেখা দিয়ে শুরু হলো জীবনের নতুন অধ্যায়।’ বলেন নাজনীন সুলতানা।
১৯৮০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম কম্পিউটারের সঙ্গে সখ্যতা হয় তাঁর। ‘বাংলাদেশে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ছিল। আধুনিক প্রযুক্তির এই যন্ত্রকে নিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমার। নতুন নতুন সফটওয়্যার তৈরি করা। কর্মজীবনের শুরুতে বড় বড় সব প্রোগ্রাম লিখতাম কেবল প্রোগ্রামিং ভাষায়। যখনই একেকটি প্রোগ্রাম সফলভাবে শেষ হতো সবাই মিলে মিষ্টি খেতাম। আরেকটি মজার কথা হলো নতুন একটি সফটওয়্যার তৈরি ও তার প্রয়োগ হলে যে আনন্দ আমি পাই, তা প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর হওয়ার আনন্দের থেকে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন ৮০টিরও বেশি নিজেদের তৈরি সফটওয়্যার ব্যবহূত হচ্ছে। নিজস্ব ওয়েবসাইট, ই-রিক্রুটমেন্ট, ই-টেন্ডারিং, ইন্ট্রানেট পোর্টাল ইত্যাদি চালু করেছি। এ ক্ষেত্রে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।’
নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘পরিবারের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা না থাকলে আজকে এ অবস্থানে আসা সম্ভব ছিল না। পরিবারকে সব সময় যথাসম্ভব সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। অফিস থেকে ফিরে সন্তানদের লেখাপড়া তদারক করেছি। সময় পেলেই দুই ছেলেমেয়ের সঙ্গে গল্পগুজব করা, ওদের পছন্দের খাবার তৈরি করে খাওয়ানো ছিল আমার কাজ। মনে মনে আত্মগ্লানি হতো। ভাবতাম নিজের কর্মজীবনের জন্য ওদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না তো। অয়ন ও অনন্যা আমার দুই ছেলেমেয়ে। খুব বুঝত আমাকে। ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে এখন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত। মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। আর আমার স্বামী সারা জীবন আমাকে পাশে থেকে সমর্থন দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করার কিছুদিন পরে জার্মানিতে বিশেষ একটি প্রশিক্ষণের জন্য আমাকে নির্বাচিত করা হয়। তখন আমার ছেলের বয়স তিন বছর আট মাস। খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। প্রায় সতেরো মাস থাকতে হবে জার্মানিতে। মনে হয়েছে ছেলেকে ছাড়া কীভাবে থাকব আমি। একই সঙ্গে ভেবেছি আমার জায়গায় একজন পুরুষ হলে তো এসব ভাবত না। আমার স্বামী, মা-বাবা, শাশুড়ি তখন সমর্থন দিয়েছিলেন জার্মানি যেতে। তাই হয়তো সেদিন সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। মায়ের কাছে অয়নকে রেখে গিয়েছি। মাঝে অবশ্য ছেলেসহ আমার স্বামী জার্মানি গিয়েছে। তখন ছেলে আর আমাকে চেনে না। এ রকম অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে আজকের আমি। আর কর্মজীবনে চড়াই-উতরাই থাকে। আমারও ছিল। কখনো কখনো সময়মতো হয়তো কাজের মূল্যায়ন হয়নি। খুব মন খারাপ হতো। সেসব ভুলে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছি। সব সময় ইতিবাচক আচরণ পেয়েছি সবার থেকে তাও নয়। এখন তো বাংলাদেশ ব্যাংকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আছে। পেছনে ফিরে তাকাই, সন্তানেরা যখন খুব ছোট তখন হয়তো একদিন দুধ খাওয়ানোর জন্য বাসায় এসেছি। অফিসে গিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। একবার নিজের কাজের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে আর অসুবিধা হয় না। কর্মজীবী নারীদের সংসার ও অফিস মিলিয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হয়। সময় ব্যবস্থাপনা করতে জানলে দুদিকেই সফল হওয়া সম্ভব। আমার সহকর্মীরা আমাকে খুব ভালোবাসেন। এটি আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। এ ছাড়া পদোন্নতি হলে বর্তমান ও প্রাক্তন গভর্নররা যখন আমাকে অভিনন্দন জানান তখন আবার নতুন করে অনুপ্রাণিত হই।’
সংস্কৃতমনা পরিবেশে বড় হয়েছেন নাজনীন সুলতানা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আবৃত্তি করতেন। সাত বোন ও একমাত্র ভাই রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ‘আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব মা-বাবার। দুজনই খুব উদার মনের মানুষ ছিলেন। বাবা বেঁচে থাকলে আমার এই সফলতায় সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। সবার কাছে প্রশংসা করে গল্প করতেন। মাও গত বছর মারা গিয়েছেন।’ বলেন তিনি।
‘ঢাকার বদরুন্নেছা কলেজে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলাম। ভাইয়াও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মা-বাবা কখনো এসবে বাধা দেননি। সুফিয়া কামালের সঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে মা কাজ করতেন। আমিও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নারীর উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। দেশের জন্য কাজ করার স্পৃহার বীজ ১৯৭১ সালে বপন হয়েছে। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। এমনকি একাত্তর সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকে রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণও নিয়েছি। সেই ছবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আছে। তবে দেশকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম তা আজও অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু দেশের সব মানুষ ভালোভাবে বাঁচতে পারছে না। তাদের মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ হচ্ছে না। সেটি সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। আর নারীকে এগিয়ে যেতে হলে প্রতিদিনই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কাজ করতে হবে। তবেই সফলতা ধরা দেবে।’

No comments

Powered by Blogger.