বাংলাদেশে গণতন্ত্র কত দূর? by ড. আবু এন এম ওয়াহিদ

পাঠকরা আমার আজকের নিবন্ধের শিরোনাম পড়ে অবাক হতে পারেন। কেউ কেউ বলতে পারেন, 'শুরু থেকেই তো বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে।' অন্যরা আবার বলবেন, 'প্রথম থেকে না হলেও অন্তত ১৯৯০ সালের পটপরিবর্তনের পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশে নিয়মিত নির্বাচন হয়ে আসছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার পরিবর্তন হচ্ছে।


গণতন্ত্র বাংলাদেশ থেকে দূরে নয়, কাছেও নয়- বরং গণতন্ত্র বাংলাদেশের ভেতরে আছে, আছে এ দেশের অন্তরে।' আমার বক্তব্যটা এখন আরেকটু খোলাসা করে বলি। এখানে আমি গণতন্ত্র বলতে যা বোঝাতে চাচ্ছি, তা শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া যায় না। আমি গণতন্ত্র বলতে প্রকৃত গণতন্ত্র এবং আসল গণতন্ত্রকেই বোঝাচ্ছি, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সরকার নির্বাচিত হবে বটে; কিন্তু সরকার পরিচালনায় সংখ্যালঘুদের মতামত নিছক সংখ্যার কারণে উপেক্ষিত হবে না। যুক্তিসংগত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার সংখ্যালঘু বা বিরোধী দলের কথাও শুনবে। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে, দরকষাকষি করবে, দেওয়া-নেওয়া করবে। সংখ্যালঘুদের কথায় বা প্রস্তাবে মেরিট থাকলে তাকে স্বাগত জানাবে, সম্মান করবে, গ্রহণ করবে। আর বিরোধী দলও বিরোধিতার খাতিরে সব কিছুতে কেবল 'না', 'না' করবে না। সংসদের ভেতরে ও বাইরে তারা অব্যাহতভাবে সরকারের সমালোচনা করবে এবং সে সমালোচনা হবে ইতিবাচক, গঠনমূলক কিন্তু হিংসাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক নয়। সমালোচনার সঙ্গে সঙ্গে তারা সরকারকে উত্তম বিকল্প পথ দেখাবে। গণতন্ত্র বলতে আমি এমনই পরিবেশ-পরিস্থিতি বোঝাচ্ছি। আশা করি পাঠকরা আমার সঙ্গে একমত পোষণ করবেন, দেশে বর্তমানে সে পরিবেশ মোটেও নেই। আমার আজকের বক্তব্য আমি শুরু করছি আমেরিকায় গণতন্ত্র চর্চার একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে।
২০০৫ সালের কথা। টেনেসি স্টেইট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে কলেজ অব বিজনেসের ডিন বরাবর একটি প্রস্তাব আসে। প্রস্তাবে বলা হয়, কলেজের অধীনে 'হোটেল অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট' (অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় 'উত্তরণশালা এবং আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা') নামে যেন একটি নতুন বিভাগ খোলা হবে। এ প্রকল্পের জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ না দিয়ে ডিনকে বলেছেন, কলেজের নিজস্ব তহবিল এবং সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে প্রয়োজনীয় ফান্ড জোগাড় করতে। কলেজের ডিন এবং অ্যাসোসিয়েট ডিন মনে করেন, কলেজের রিজার্ভ ফান্ড থেকে অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক বাইরের গ্র্যান্ট নিয়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পের বাস্তবায়ন সহজেই সম্ভব। মোটকথা ডিন, অ্যাসোসিয়েট ডিন এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ এ প্রস্তাবে রাজি এবং পরোক্ষভাবে তারা প্রস্তাবটির স্বপক্ষে কিছুটা ক্যাম্পেইনও করে।
কিন্তু কলেজের একাডেমিক ব্যাপারে এ ধরনের একটি বড় সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষ বৃহত্তর পরিসরে কলেজের সব ফ্যাকাল্টি মেম্বারের (অধ্যাপনারত শিক্ষকরা) সঙ্গে উন্মুক্ত আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক এবং ভোটাভুটি ছাড়া গ্রহণ করতে পারে না। ওই বছরের ফল সেমিস্টার শুরু হওয়ার পর অক্টোবর মাসে কলেজের বাইরে একটি প্রাইভেট বোটানিক্যাল গার্ডেনের কনফারেন্স হলে ডাকা হলো পুরো কলেজের ফ্যাকাল্টি মিটিং। ডিনের সভাপতিত্বে কোনো এক শুক্রবার সকাল ৮টায় যথাসময়ে শুরু হলো মিটিং। মিটিংয়ে কলেজের প্রায় সব ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা উপস্থিত। প্রথমে এ্যাজেন্ডার ছোটখাটো দু-একটি আইটেম নিয়ে আলোচনা হলো। তারপর ফ্লোরে উঠে এলো মূল প্রস্তাব। স্বপক্ষে একটি ছোট্ট বক্তৃতা দিয়ে কলেজের অ্যাসোসিয়েট ডিন প্রস্তাবটি উত্থাপন করলেন। সমর্থন করলেন কলেজেরই একজন সিনিয়র অধ্যাপক। অন্যান্য সব ফ্যাকাল্টি মেম্বার জানেন যে কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি শুধু উত্থাপনই করেনি, তারা এটা মনে-প্রাণে সমর্থন করে এবং কলেজের ডিন ও অ্যাসোসিয়েট ডিন এটিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।
শুরু হলো প্রস্তাবের ওপর আলোচনা-সমালোচনা। ক্যাপিটল হিলে কংগ্রেস অধিবেশনে যেমন বিতর্ক হয়, চলল সে রকম বিতর্ক। অত্যন্ত খোলামেলা পরিবেশে আলোচনা হতে লাগল এই নতুন প্রোগ্রামের সুবিধা-অসুবিধা, লাভ-লোকসান, আকার-আকৃতি, লেভেল, ভবিষ্যৎ এবং এর আর্থিক ও অর্থায়ন তাৎপর্য ইত্যাদি নিয়ে। উত্তপ্ত বিতর্ক চলল প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে। চুলচেরা বিশ্লেষণ হলো যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়-আসয়ের। অবশেষে এলো ভোটাভুটির সময়। ভোট হলো গোপন ব্যালটের মাধ্যমে। গুনে দেখা গেল বিস্তর ব্যবধানে কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবটি ফ্লোরে হেরে গেল। মিটিং শেষে ডিন বললেন, 'আই হ্যাভ লস্ট দ্য ব্যাটল, বাট ওয়ান দ্য ওয়ার। মাই কলেজ ইজ প্রাকটিসিং অ্যামেরিকান একাডেমিক ডেমোক্রেসি।' অর্থাৎ 'আমি একটি লড়াই হেরেছি, কিন্তু সার্বিক যুদ্ধে জিতেছি। আমার কলেজে আমেরিকার শিক্ষা গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে।'
এ দেশের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসে এবং হোয়াইট হাউসে প্রতিনিয়ত অনেক ছোট-বড়, গুরুত্বপূর্ণ এবং মামুলি ধরনের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, যেখানে প্রেসিডেন্টের মতামত ও পছন্দের প্রতিফলন থাকে না। থাকলেও অনেক সময় থাকে আংশিকভাবে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি বলে জ্ঞাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রতিটি জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ক্রমাগত বিরোধী দল এবং তাঁর নিজের ক্যাবিনেট সদস্যদের সঙ্গে দরকষাকষি ও দেওয়া-নেওয়া করে থাকেন। একা একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত দেশ ও জাতির ওপর চাপিয়ে দেন না তিনি, দিতে পারেন না। এটাই নিয়ম, এটাই গণতন্ত্র, এটাই আমেরিকার গণতান্ত্রিক ট্র্যাডিশন এবং বলতে গেলে এটা তাদের একটি জাতীয় অহঙ্কারও বটে।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে কী দেখতে পাই। একাডেমিকজগতে কিছুটা উপস্থিত থাকলেও জাতীয় জীবনে, রাজনীতিতে, কী সংসদে, কী দলীয় ফোরামে- কোথাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে খোলামেলা বিশদ আলোচনা-সমালোচনা হয় না, প্রস্তাবের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয় না। মিটিংয়ে বক্তব্য দেওয়ার আগে নেতা-নেত্রীরা পার্টি প্রেসিডেন্ট কিংবা চেয়ারপারসনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। নিজের মুখের কথা বের করার আগে নেত্রীর মনের কথাটা বোঝার চেষ্টা করেন। সারা দিন আলোচনা করে ক্রিটিক্যাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হলে পার্টিপ্রধানের ঘাড়ে সিদ্ধান্তের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে নেতা-নেত্রীরা হাসিমুখে বাড়ি ফিরে আসেন এবং পার্টিপ্রধানরা ভাব দেখান তাঁরা নেতা-নেত্রীদের সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন; কিন্তু সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয় শুধু তাদের ব্যক্তিগত মত ও জেদ এবং বড়জোর একজনের ক্ষেত্রে ছেলে এবং বোন, আরেকজনের ক্ষেত্রে ছেলে এবং ভাইয়ের মতামত। দুঃখজনক হলেও এ কাহিনী বাংলাদেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের ব্যাপারেই সাধারণত সমানভাবে প্রযোজ্য।
তিন-চার বছর আগে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন কেয়ারটেকার সরকারের সময় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির এক সভায় কয়েকটি জরুরি সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনায় একজন অতিথি বললেন, সব সিদ্ধান্ত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। একই টকশোতে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমদ। আলোচনার একপর্যায়ে ড. ইমতিয়াজ বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, 'শতাধিক মানুষের মিটিংয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হলো; অথচ কেউ কোনো দ্বিমত পোষণ করলেন না বা করার সাহস পেলেন না, এটা কেমন গণতন্ত্র'? তর্ক-বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা, এবং পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটির মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত হয় সেটাই গণতন্ত্র, সেটাই গণতন্ত্রের দাবি এবং সেটা হওয়াই স্বাভাবিক এবং বাঞ্ছনীয়। একতরফাভাবে কোনো রকম ভিন্নমত ছাড়া নেতৃত্বের সব প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া আর যাই হোক গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে সব বিল তার মনমতো করে পাস করাতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট এবং ডিনের পছন্দমতো প্রস্তাব সব সময় ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। অথচ বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে এবং দলের সব ফোরামে সামান্যতম মতদ্বৈধতা ছাড়াই অহরহ একতরফাভাবে সর্বসম্মতিক্রমে প্রায় সব সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়ে থাকে এবং এসব সিদ্ধান্তে সব সময় প্রধানমন্ত্রী এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মতামতই প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে যেদিন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার ও পছন্দের বিরুদ্ধে বিল পাস হবে অথবা বিলে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন হবে না এবং দলীয় ফোরামে যখন পার্টিপ্রধানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে অথবা তাঁর একক প্রস্তাবে কাটছাঁট করা হবে, তখনই বুঝতে হবে দেশে গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে। এখন পাঠকরাই বিবেচনা করুন, বাংলাদেশে সেদিন কত দূর, যেদিন প্রধানমন্ত্রী এবং দলীয়প্রধান নিজের ইচ্ছামতো বিল এবং প্রস্তাব একচেটিয়াভাবে পাস করাতে ব্যর্থ হবেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, প্রধানমন্ত্রী এবং দলীয়প্রধান দলের অন্য নেতাদের কথায় আপস করতে বাধ্য হবেন। আমার মতে, সেই শুভ দিন যত দূর, বাংলাদেশে গণতন্ত্রও তত দূর।

লেখক : অধ্যাপক টেনেসি স্টেইট ইউনিভার্সিটি ও
এডিটর জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ।
awahid2569@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.