ধ্বংস ছাড়া সৃষ্টি কিংবা এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় by ড. শামসুল আলম

ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি নিয়ে গঠিত কমিটি সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে- এই মর্মে পত্রিকায় সংবাদ পড়েছি। তারা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুপারিশ করেছে সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে। সঠিক অর্থনৈতিক বিবেচনা থেকেই কমিটি এ পরামর্শ রেখেছে বলে পড়েছি।


খনন পদ্ধতিতে যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করা যাবে, তা লাভজনক হবে না এবং উত্তোলিত কয়লার পরিমাণ হবে খুবই কম। সে কারণেই সমুদয় ব্যয় উঠে না আসার আশঙ্কাই বেশি। আমরা যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করি, উপকরণ হিসেবে উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে ৮৭ ভাগ, কয়লা ৩ দশমিক ৭ ভাগ, বাদবাকি ফার্নেস অয়েল, জলবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসে থাকে। সারা বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার ৩৭ শতাংশ। আমাদের গ্যাস সম্পদ সীমিত এবং দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। শিল্প-কলকারখানায় গ্যাস ব্যবহারের চাহিদা কোনোভাবেই মেটানো যাচ্ছে না। আর একই উৎসের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঝুঁকিও যথেষ্ট। বিদ্যুৎ উৎপাদনের নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহার এখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যদিও পরিচ্ছন্ন উৎস হিসেবে সৌর বা বায়ুশক্তি ব্যবহারেও যত দূর সম্ভব যেতে হবে।
কয়লা উত্তোলন পদ্ধতি নিয়ে প্রতিবেদন বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই 'জ্বালানি বিশেষজ্ঞ' পরিচিতি নিয়ে দু-একজন কলম ধরেন, সব গেল সব গেল বলে রব তুলেছেন। কেউ পরামর্শ রাখলেন- এই সরকারের শেষ বেলায় নতুন পাড়ি না জমাতে। আমাদের দেশে কোনো বিষয়েই বিশেষজ্ঞের অভাব নেই, সে কথা মানি। কেবল বুঝ পাই না, যখন দেখি শত শত রোগী ভালো চিকিৎসার অভাবে ব্যাংকক, কলকাতা, ভেলর, সিঙ্গাপুর যেতে লাইন দিয়ে ভিসা নিচ্ছে। এত বিশেষজ্ঞের দেশে কিন্তু নতুন প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবন দেখি না। এমনকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাঁচ শ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখি না। সাড়াজাগানো কোনো বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা দেখি না, যদিও দেশের বাইরে অবশ্য দু-একজন সাড়া জাগিয়েছেন গবেষণাকর্মে। যা হোক, মনের অতৃপ্তির কথাটাই এ প্রসঙ্গে জানালাম, কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই।
উন্নয়ন বলতে কী বুঝি? উন্নয়ন অবশ্যই যেকোনো স্থিত অবস্থা থেকে পরিবর্তন। পুরনোকে না ভাঙলে, না পাল্টালে কোনো পরিবর্তনই সম্ভব নয়। কিছু পরিত্যক্ত বা ধ্বংস না হলে নতুন সৃষ্টি সম্ভব নয়। কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শহর থেকে তিন মাইল দক্ষিণে গ্রাম এলাকার প্রায় এক হাজার ২০০ একর কৃষিজমির ওপর। সে জন্য কয়েকটি পুরো ঘনবসতির গ্রাম এবং গ্রামের ১০ থেকে ১২ হাজার বাসিন্দাকে ১৯৬১ সালের মাঝামাঝি কয়েক দিনের ভেতর উচ্ছেদ করা হয়েছিল, জমিজমার পুরো দাম দিয়ে। কোনো প্রতিবাদের সুযোগই দেওয়া হয়নি। সেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় না হলে দেশে এখন চাল উৎপাদন সাড়ে তিন গুণ বাড়ত না, মৎস্যচাষের, পোলট্রি চাষের এত প্রচলন হতো না। বাউকুলের এত প্রসার হতো না। কৃষি গবেষণাকেন্দ্রগুলোতে বিজ্ঞানী পাওয়া যেত না। দেশের প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আপাত কিছু ধ্বংসের মধ্য দিয়েই এভাবে গড়ে উঠেছে। মেঘনা-ধনাগোদা প্রকল্প পাঠকদের অনেকেই না-ও দেখে থাকতে পারেন। পুরো মতলব-উত্তর উপজেলাটি চারদিকে নদী রক্ষা বাঁধের ভেতর। এর উত্তর-পশ্চিমে মেঘনা নদী, পূর্ব-দক্ষিণে ধনাগোদা নদী (মেঘনা গোমতীর উপশাখা) বেষ্টিত দ্বীপ, হতো প্রতিবছর বন্যা আর নদীভাঙন। ১৯৮৮ সালে সে সময়ে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা ব্যয়ে চারদিকে বাঁধ দিয়ে মতলব-উত্তরকে বন্যামুক্ত করা হলো। প্রতিটি গ্রামেই এখন পাকা সড়ক যুক্ত, প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বিদ্যুৎ। বাঁধের ওপর দিয়ে ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত হয়েছে এই উপজেলা, ধনাগোদা নদীর ওপর হয়েছে ব্রিজ। মৎস্য চাষ, পোলট্রি খামার, ফলের বাগান, শাকসবজির চাষ, ইরি-বোরো চাষ, গ্রামে গ্রামে বিল্ডিং, প্রতিটি বাজার এখন বাণিজ্যকেন্দ্র। বাঁধ করতে গিয়ে কৃষকদের হাজার হাজার একর জমি গেছে। ৭০ ফুট প্রশস্ত ও প্রায় ২০-২৫ ফুট উঁচু পুরো উপজেলার চতুর্দিকে বাঁধ নির্মাণ করতে প্লাবন জমিতে কত কৃষকের কত জমি ধ্বংস হয়েছে ভাবুন। আড়িয়ল বিলের মতো সেদিন যদি সব কৃষক ঘুরে দাঁড়াত, বাধা দিত- এ বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ হতো কি? হতো কি মতলব-উত্তর প্রায় সব নাগরিক সুবিধাসহ কৃষিতে উন্নত আধুনিক উপজেলা? ফুলবাড়িয়া-নবাবপুর রোডের উত্তর দিক, গুলিস্তান থেকে নতুন ঢাকা, রেলস্টেশনের উত্তর দিকের প্রায় সবটা ছিল গ্রামাঞ্চল। শাহজাহানপুর, কমলাপুর সেই পঞ্চাশের দশকেও ছিল কুপিবাতি জ্বলা শিয়াল-ডাকা গ্রাম। শত শত গ্রাম ধ্বংস না হলে হতো কি ঢাকা নগরী? মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বনানী, গুলশান, উত্তরা গড়তে কত শত গ্রাম ধ্বংস হয়েছে, তার হিসাব করাই কঠিন। উন্নয়নের যথাযথ সংজ্ঞা হলো- সৃষ্টিশীল ধ্বংস বা creative destruction. অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতেই শিল্প বিপ্লবের শুরু। স্টিম ইঞ্জিনে চলা শুরু হলো রেলগাড়ি। রেললাইন বসাতে প্রচুর জমির প্রয়োজন। তখনকার জার শাসিত রাশিয়ায় রেললাইন বসাতে শাসক জারেরাই বাধা দিয়েছে। প্রচুর জমি নষ্ট হবে- এই বলে। উপনিবেশকালীন ভারতবর্ষে স্বরাজ আন্দোলনের নামে চরকার জয়গান গাওয়া হয়েছে, কাপড়ের মিল চালু করতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, এতে হাজার হাজার তাঁতি ও সুতা ব্যবসায়ী পথে বসবে। হয়তো বসেছেও। বস্ত্রমিল অর্থনৈতিক কারণেই একদিন জায়গা করে নিয়েছে তার পরও। বহু পরিবারের ধ্বংসও হয়েছিল অবধারিত। সড়ক, জনপথ, বিমানবন্দর গড়তে শত শত একর জমি রূপান্তরিত হয়েছে। Creative destruction সে জন্য থেমে থাকেনি। প্রযুক্তি গ্রহণে যেসব দেশ বা সমাজ বাধা দিয়েছে বা দ্বিধা করেছে, এরা শুধুই পিছিয়ে পড়েছে; অথচ শিল্প বিপ্লবে দ্রুত এগিয়েছে ইংল্যান্ড, পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র। ওই সব দেশে সমাজের কাঠামো বহু মতামতভিত্তিক থাকায় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে দ্রুত সমন্বয়ের সামর্থ্য নিয়ে। বাজারের বিকাশে রাজনৈতিক শক্তিগুলো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। অথচ ব্যতিক্রম দেখা গেছে পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো, সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চল, চীন ও ভারতবর্ষে। যে কারণে শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়া লেগেছে এসব দেশে বহু বিলম্বে। বিংশ শতাব্দীজুড়েই এসব অঞ্চল ছিল নানা টানাপড়েনে পশ্চাৎমুখী। যদিও একবিংশ শতাব্দীতে এসে নতুন করে এসব অনেক দেশই মাথা তুলছে, যদিও এর মধ্যে পার হয়ে গেছে শত বছর। ইতিহাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ 'সন্ধিক্ষণ' আসে, যখন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত একটা জাতিকে শত বছর এগিয়ে দেয়। না হয় তেমনি পিছিয়েও পড়তে হয় শত বছর। ১৯৬৬ সালের তৎকালীন প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের ছয় দফার একটি ইশতেহার পরবর্তীকালে একটি স্বাধীন জাতির জন্ম দিয়েছিল। ইতিহাসের 'সন্ধিক্ষণের' কোনো ছোট ঘটনা পরবর্তী সময়ে জাতির জন্য বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশি পণ্য গ্রহণ করব না, অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে পরিচিত হব না। তখন একটি জাতিকে নীরবে শত বছরের জন্য পিছিয়ে পড়তে হয়। ভারতবর্ষ, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো, আফ্রিকার সাব সাহারান অঞ্চলগুলো শিল্প বিপ্লবের সুযোগ থেকে এভাবেই শত বছরের জন্য পিছিয়ে পড়েছিল। Creative destruction ছাড়া উন্নয়নের বা অগ্রগতির বিকল্প নেই। আমাদের দেশে 'তেল-গ্যাস, খনিজ-সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিও' রয়েছে। তারা কার থেকে কী রক্ষা করছে জানি না। অন্যরা লুটে নিয়ে যাবে এই বলে সব কিছু মাটির নিচে রাখতে হবে- স্লোগানটা বোধ হয় এমনই। এসব কমিটি রূপনগর, পূর্বাচল সিটি করার সময় শব্দ করে না, কেননা তখন পরিবর্তিত প্লটের তাদেরও কেউ কেউ অংশীদার। আসলে এরা এই creative destruction-বিরোধী। পশ্চিমা শক্তির প্রযুক্তি ও অর্থ সাহায্যের মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে তেল সম্পদের উত্তোলন ও সম্পদের বিকাশ সম্ভব হয়েছে। সবই যদি নিয়ে যাবে, তবে সৌদি আরব, কুয়েত, আরব আমিরাত এত সম্পদশালী হলো কিভাবে? তাদের তো আর কোনো সম্পদ ছিল না।
দেশ ও সমাজের অগ্রগতি চাইলে আমাদের গ্যাস ও কয়লা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে যেতেই হবে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন বেশি যুক্তিযুক্ত হলে সে পথেই এগোতে হবে। কয়লা, সোনা, হীরা- যা-ই উত্তোলন করা হোক, কিছু বাসিন্দার স্থানচ্যুতি ছাড়া তা পৃথিবীর কোথাও সম্ভব হয়নি। সে নিউক্যাসল হোক, জোহানেসবার্গ হোক, ফিলিপিন্স হোক কিংবা হোক বাংলাদেশ। তবে যা প্রয়োজন তা হলো, ক্ষতিগ্রস্তদের সময়মতো যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়া। প্রয়োজনে পুনর্বাসন, এমনকি আহরিত সম্পদের লভ্যাংশ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তানসন্ততির লেখাপড়ার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। সবই হবে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে। তবে ক্ষতিপূরণের ধরন ও পরিমাণও শেষ বিবেচনায় নির্ভর করবে একটি দেশের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর। ক্ষতিপূরণ, অর্থনৈতিক লভ্যাংশ ও ঝুঁকির জন্য যে ব্যয় তা কয়লা উত্তোলনের লাভকে অবশ্যই ছাড়িয়ে যাবে না। আমাদের দেশে creative destruction যত দ্রুত হবে, সমাজও তত দ্রুত পাল্টাবে এবং দেশ সম্পদশালী হবে। দেশের সমৃদ্ধি চাইলে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও জনকল্যাণকামী কোনো সরকার প্রাকৃতির সম্পদ ব্যবহারের দায় থেকে পিছিয়ে আসতে পারে না। লাভজনক হলে উন্মুক্ত পদ্ধতিতেই যেতে হবে। তবে যতটা সম্ভব প্রতিবেশ-পরিবেশ রক্ষা করে, চিন্তাভাবনা করে। 'শেষে অনুতাপ নয়'- আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এমন পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হবে। কয়লা উত্তোলনে যেতেই হবে। প্রবৃদ্ধি চাইলে সৃষ্টিশীল ধ্বংসকে মেনে নিতে হবে। আট-দশটি-বিশটি গ্রামের পুনর্বাসন কোনো কঠিন বিষয় নয়।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সদস্য, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি), বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন

No comments

Powered by Blogger.