উপজেলা পরিষদ-দুর্নীতির অভিযোগ গুরুতর

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ_ রোববার সমকালে এমন শিরোনামের প্রতিবেদনটি যথেষ্ট অনুসন্ধানভিত্তিক। একই সঙ্গে তাতে রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া অনেক অভিযোগের উদাহরণ।


সরকারি কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্য থেকে সাধারণ মানুষের তরফ থেকেই অভিযোগ_ টেস্ট রিলিফ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, ভিজিএফ, ভিজিডি, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ইত্যাদি সামাজিক সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে তারা অনাবশ্যক হস্তক্ষেপ করেন এবং নিয়মকানুন মানতে চান না। উপজেলার মধ্যে সরকারি গাছ কাটা, স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অর্থ গ্রহণ, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও কম নেই। সর্বোপরি রয়েছে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব। এ যেন এক ঘরে দুই পীরের অবস্থান। আবার জাতীয় সংসদ সদস্যরা দীর্ঘকাল ধরে যেসব সুবিধা ভোগ করছেন_ যেমন উন্নয়ন কাজের তদারকি; উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা তাতে হিস্যা চান। অথচ একই সময়ে তারা পরিষদের দুই নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যানকে কার্যত কোনো ক্ষমতাই দিতে চান না। নারী ভাইস চেয়ারম্যানদের বাড়তি অভিযোগ_ তাদেরকে সাইডলাইনে ঠেলে রাখতে সবাই যেন এক জোট। অনেক স্থানে সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে কে বেশি ক্ষমতাবান_ সেটা প্রকট হয়ে পড়ে। ত্র্যহস্পর্শের মতো অশুভ এ দ্বন্দ্বের অসহায় শিকার স্থানীয় জনগণ। এতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজেও বিঘ্ন ঘটে। যেখানে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার কথা, সেখানে সারাক্ষণ চলে কর্তৃত্ব ও প্রভাব প্রদর্শনের লড়াই। অভিযোগ এলেই তা যথার্থ হবে_ এমন কথা নেই। কিন্তু সারাদেশের এক-পঞ্চমাংশ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তখন বিষয়টিকে হালকা করে দেখার উপায় থাকে না। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা বলতেই পারেন যে, সংসদ সদস্যরা তাদের প্রতি প্রথম থেকেই বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন। ২০০৮ সালে যখন স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইন অনুমোদিত হয়েছিল, তখন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। এ আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদ সদস্যরা কেবল আইন প্রণয়নের মতো কাজেই সংশ্লিষ্ট থাকবেন। তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখভাল করার পুরো দায়িত্ব যাবে উপজেলা পরিষদের হাতে। কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে গঠিত জাতীয় সংসদে মহাজোট সরকার তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর দৃশ্যপট আমূল বদলে যেতে থাকে। উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা হয়, যা ছিল সংসদ সদস্যদের সঙ্গে প্রকট দ্বন্দ্বেরই ফল। কিন্তু সীমিত ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও যদি উপজেলা চেয়ারম্যানরা দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে অধিকতর কর্তৃত্বের দাবির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা বলতে পারেন যে, অনিয়ম তো সবাই করছেন। সংসদ সদস্যদের যে 'আমলনামা' বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিয়মিত প্রকাশিত হয়, সেটাও তাদের পক্ষে বলিষ্ঠ যুক্তি হতে পারে। কিন্তু একের ভুল তো অপরের ভুল করা কিংবা অনিয়মে জড়িত হয়ে পড়ার যুক্তি হতে পারে না। অধিকারের সঙ্গে জবাবদিহিতার প্রশ্ন থাকেই। উপজেলা পরিষদ কার্যকর স্থানীয় সরকারের সংস্থা হতে পারবে কি-না, সেজন্য বর্তমান পরিষদ ট্রেন্ডসেটার হতে পারত। কিন্তু গত পৌনে চার বছরে তাদের বেশিরভাগের যা পারফরম্যান্স, তাতে এ ব্যাপারে সংশয় দেখা দিতেই পারে।
 

No comments

Powered by Blogger.