'এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়' by মাহমুদুর রহমান মান্না

আজ কিছু লিখতে বসে বারবার মনে পড়ছে শামসুর রাহমানের কবিতার সেই লাইনটি- 'এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।' আজকের শোকের কোনো ভাষা নেই। বলা যায়, বাকরুদ্ধ। তবু আমরা যারা বেঁচে আছি, আমাদের বলতে হবে। বাঁচতে হবে।
আরো লাখ লাখ শ্রমিক বাঁচার জন্য হাজার হাজার গার্মেন্টে কাজ করছে, তাদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। এই শতাধিক লাশের বিনিময়ে অন্তত জীবিতরা আর যাতে পুড়ে না মরে সে নিশ্চয়তাটুকু প্রতিষ্ঠিত হোক। তাহলেও এদের আত্মা শান্তি পাবে, বেঁচে থাকা আরো অনেক শ্রমিক ভাই-বোন ও স্বজন স্বস্তি পাবে।
পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে, এ পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডে ৫০০ গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য বিজিএমইএ বলছে ৪০০। সংখ্যার কমবেশিতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সব সময় মাপা যায় না। আমরা আতঙ্কিত এই ভেবে যে এরূপ মর্মান্তিক মৃত্যুর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। প্রতিকারের কথা যাদের ভাবা উচিত, তারা ভাবছে না। ধারাবাহিকভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। শ্রমিকরা পুড়ে খাক হচ্ছে। প্রতিবছর ঘটছে; কিন্তু কেন ঘটবে? আর কেন এভাবে অসহায় মৃত্যু থেকে বাঁচার পথ থাকবে না। এসব প্রশ্ন আজ নিশ্চয়ই বড় হয়ে দেখা দেবে। আসলেই কি আমরা শ্রমিকের জীবনকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখছি, নাকি এমন দুঃখজনক ঘটনার একমাত্র কারণ অবহেলা, উদাসীনতা? অবশ্য প্রধান অভিযুক্ত হবেন গার্মেন্ট মালিকরা। জবাব তাঁদের কাছ থেকেই পেতে হবে।
গার্মেন্ট শিল্প এ দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শিল্প। এই সমৃদ্ধি খুব তাড়াতাড়ি আসেনি। যদিও অন্যান্য শিল্প-কারখানার তুলনায় অল্প সময়েই দাঁড়িয়ে গেছে গার্মেন্ট শিল্প। কিন্তু কিভাবে? আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি নিশ্চয়ই স্বল্প মজুরির শ্রমিকরা। খুব অল্প মূল্যে তাদের শ্রম কেনা যাচ্ছে বলেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা এগিয়ে গেছি। প্রথমে গার্মেন্ট কারখানা ঘর ও বাসাবাড়িতে শুরু হয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় ছিল না, চেইন প্রোডাকশন ও লাইন প্রোডাকশন সম্পর্কে। ফ্যাক্টরি প্রোডাকশন কী তা এখনো অস্পষ্ট। একটি বিল্ডিংয়ে যদি চারটি ফ্যাক্টরি থাকে, তা দোষণীয় নয়। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ, প্রশস্ত বহির্গমন পথ- এসব থাকতে হবে।
এই শিল্প বিকাশের প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত সরকার গার্মেন্টের জন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। শ্রম অধিদপ্তর বা সরকারি শ্রম আইনেও কারখানা নীতিমালা, বিশেষ করে গার্মেন্ট ক্ষেত্রের জন্য যেটুকু আছে, তা যদি মালিকরা মেনে চলতেন, তাহলে এমন দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমে যেত। কিন্তু এ পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত নেই উদাসীন মালিকদের ক্ষেত্রে। যে কারণে আজ এমন ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড ঘটার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, বেশির ভাগ গার্মেন্টে শতভাগ সঠিক রয়েছে তাদের কর্মপরিবেশ। অথচ তাজরীন ফ্যাশনস নামে যে গার্মেন্টে শতাধিক শ্রমিক পুড়ে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের কেউ বেরোতে পারেনি বলেই পরিণতি এমন হয়েছে। যেমন আগুন লেগেছে গোডাউনে, আর বেরোনোর সংকীর্ণ পথটি গোডাউনের মধ্য দিয়েই। অতএব তাদের বেরোতে হলে অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিতে হয়। তাহলে এটা বিপদে নির্গমনের পথ, নাকি অগ্নিকূপ? নিহতদের আত্মীয়স্বজনরা বলছে, এটা দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড।
যা-ই হোক, যে খাতটি দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় করছে, সেই খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কিন্তু আমাদের শ্রমিক-কর্মীরা। তাদের জীবনের নিরাপত্তা যদি বিবেচনা করা না হয় তাহলে এমন দুর্ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এই শিল্পটি অনেকদূর এগিয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অথচ আজ পর্যন্ত দেশে একটি গার্মেন্ট পল্লী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কোনো সরকারের আমলেই নেওয়া হয়নি। তাই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে শ্রমিকের এই ধারাবাহিক অপমৃত্যু, দুর্ঘটনা, ন্যায্য পাওনা না পাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে আজ না হলেও অদূর ভবিষ্যতে ক্রেতাদের ওপর এর প্রতিক্রিয়া পড়বে এবং আমরা বাজার হারাতে পারি। আজকে এই জাতীয় শোক যেন শোকের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। আজকের শোক ও ভবিষ্যতে এমন শোক সৃষ্টি যাতে না হয়, সেই উত্তরণ যেন ঘটে। শোক পালনের দিনে এই হোক প্রতিজ্ঞা।

২.
বহদ্দারহাটে যে দুর্ঘটনা ঘটে গেল, তা-ও সংশ্লিষ্ট লোকদের গাফিলতি, অতি মুনাফার লোভ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে নির্মিতব্য উড়াল সড়কের ভাঙনে। চট্টগ্রামের নগর মহাপরিকল্পনায় এই উড়াল সড়কের কোনো চিহ্ন না থাকলেও স্রেফ রাজনৈতিক কারণে তা তৈরি হচ্ছিল বলে পত্রিকার খবরে প্রকাশ। তা-ও খুব তড়িঘড়ি করে শুরু হওয়া কাজ আবার মার্চের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ ছিল। ওই সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করানোর বাসনা ছিল উদ্যোক্তাদের। এ উড়াল সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নকারী হলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, যিনি সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতা। যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তা-ও আওয়ামী লীগ নেতার।
আর এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যাঁরা কাজ করছেন তাঁরাও ওই একই, অর্থাৎ দলের সঙ্গে যুক্ত। তাই এখানে কাজ পাইয়ে দিতে প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা নির্ণয় না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। যার পরিণাম হলো ভয়াবহ, আর ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেছেন, এখানে উড়াল সড়কের কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। কিন্তু স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য সিডিএর (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের মদদে এটি নির্মাণ করা হচ্ছিল।
অবশ্যই আমাদের এরূপ রাজনৈতিক 'উন্নয়ন' থেকে সরে আসতে হবে। রাজনৈতিক লক্ষ্য যত দিন না পর্যন্ত জনগণ হবে, তত দিনই এ জাতীয় ব্যবসা-বাণিজ্যভিত্তিক রাজনীতির কবলে ধসে পড়বে গার্ডার, আগুন ধরবে হাজারীবাগ বস্তিতে, গার্মেন্টে- থামবে না মৃত্যুর মিছিল। আমরা আশা করব, সব সরকার দেশ ও জনগণের কথা বিবেচনা করবে সবার আগে। তা না হলে যা চলছে, তা তেমন করে দীর্ঘদিন চলবে না- এ সত্য উপলব্ধি করতেই হবে ক্ষমতাসীনদের।

৩.
আজ ডাক্তার মিলন দিবস। শহীদ নূর হোসেন ও ডাক্তার মিলন যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, যে দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলেন, আজকের এই দেশ তো সেই স্বপ্নের দেশ নয়। মানুষের লাশের ওপর দিয়ে বাণিজ্য চলতে পারে না। ঠিকাদারি হোক আর গার্মেন্ট ব্যবসা হোক, আগে মানুষের জীবন রক্ষা, শ্রমিকের জীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেই তবে সম্ভব বাণিজ্য বিস্তার। তা না হলে মাঝপথে সর্বনাশ হবেই।
আজ ডা. মিলন দিবসে আমরা জাতীয় শোক পালন করছি। দেশের বাতাসে ঢাকা ও চট্টগ্রামের লাশের গন্ধ। আজকে মিলন দিবস ও জাতীয় শোক পালনের দিনে আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে।
(অনুলিখন)

লেখক : রাজনীতিবিদ, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক
২৭.১১.২০১২

No comments

Powered by Blogger.