সংসদীয় দলের বৈঠকে শেখ হাসিনা-আওয়ামী লীগের ৬০ এমপির অবস্থা খারাপ by পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য ও পাভেল হায়দার চৌধুরী

সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এমপিদের মধ্যে ৬০ জনের অবস্থা খারাপ। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে এই আসনগুলোতে তাঁর দল ভালো ফল নাও করতে পারে। তবে তিনি বলেছেন, ২০০ আসনে দলীয় সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ড আশাব্যঞ্জক এবং এই আসনগুলোতে দল ভালো ফল করবে বলে তাঁর আশা।


গতকাল সোমবার বিকেলে সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে যাওয়া যাবে না বলেও তাঁর সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে শেখ হাসিনা সংসদ সদস্যদের এখন থেকেই পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারির আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই এখন থেকেই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এলাকায় জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। নেতা-কর্মীদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা মিটিয়ে ফেলে তাঁদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
গত ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের বৈঠকে এমপিদের আমলনামা পরীক্ষা করে দেখার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা যেসব এমপির বিরুদ্ধে নানা রকম অভিযোগ আছে, সামনের নির্বাচনে তাঁদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সাধারণ মানুষ, দলীয় কর্মী ও দলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছিলেন।
সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকে দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, 'এমপিদের রিপোর্ট আমার কাছে আছে। আমি সেগুলো দেখেছি। এর মধ্যে ২৫-৩০টি সংসদীয় আসনে দলীয় এমপিদের অবস্থা খুবই নাজুক। বাকি ২৫-৩০টির অবস্থাও খারাপ।
সেগুলোর অবস্থা- ফিফটি ফিফটি সম্ভাবনা। প্রায় ২০০ আসনে দলীয় এমপিদের অবস্থা ভালো। তবে এখনো নির্বাচনের দেড় বছর বাকি আছে। এ অবস্থার কম-বেশি পরিবর্তন হতে পারে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে প্রায় সব এমপিই দেশের চলমান বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, 'আমরা এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি, কিন্তু মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। নির্বাচনের সময় বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ করতে পারছি না। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী নির্বাচনে মানুষের কাছে যাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।'
এর পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ইতিমধ্যে উৎপাদন করেছে। তিনি নির্বাচনী ইশতেহারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এমপিদের বলেন, 'নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছিলাম। কিন্তু ইতিমধ্যে আমরা পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছি।'
সংসদ নেতা এমপিদেরকে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এলাকায় প্রচারের এবং তৃণমূলের সম্মেলনগুলোতে ভূমিকা রেখে তা সফল করার নির্দেশ দেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, কিছু এমপি আছেন তাঁরা নির্বাচনের আগেই সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের অবস্থা- 'পারব না, পারব না।' সাহসী লোক ছাড়া পরবর্তী নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
সূত্র জানায়, এমপিদের উদ্দেশে রাখা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তাঁর বাজেট ভাবনার বক্তব্যে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক বলে অভিযোগ করেছেন। 'বেগম জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করছেন, আবার বলছেন দুই বছর অসাংবিধানিক সরকার ছিল। তিনি নিজেই যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক সরকার বলছেন, কাজেই আমরা আর এই অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে যাব না'- মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে একজন সংসদ সদস্য জেলা পরিষদের জন্য বরাদ্দ করা বাজেট নিজেরা খরচ করার দাবি জানান। তবে প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্যে কোনো গুরুত্ব দেননি বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলীয় এমপিদের আচরণ সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের জন্য শুধু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করলেই ভোট পাওয়া যাবে না। ভোট পেতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে, তাদের সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে হবে। আচরণের পরিবর্তন করতে হবে। দুর্ব্যবহার করে পিস্তল উঁচিয়ে ভোট পাওয়া যায় না- স্মরণ করিয়ে সৈয়দ আশরাফ দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, 'মানুষের সঙ্গে আঙুল উঁচিতে কথা বলবেন না। কর্মীদের পিস্তল দেখাবেন না। পুলিশ দিয়ে জেলে পাঠাবেন না। জমি দখল করবেন না।'
'কর্মীদের কারণেই আজ আমরা সরকার গঠন করেছি'- এ কথাটি সব সময় এমপিদের স্মরণ রাখার কথাও বলেন দলের সাধারণ সম্পাদক। বিভিন্ন অপকর্ম করে সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছেন যেসব এমপি, তাঁদেরকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, এসব এমপির কারণে সরকার ও দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উল্লেখ্য, এর আগে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে পরবর্তী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া যাবে না বলে দলীয় এমপিদের সতর্ক করেছিলেন সৈয়দ আশরাফ।
গতকালের বৈঠকে অন্যদের মধ্যে আমির হোসেন আমু, এ বি এম আনোয়ারুল হক, আবদুল্লাহ আল ইসলাম, আ স ম ফিরোজ, শহীদুজ্জামান সরকার, সাধন মজুমদার, আতিউর রহমান আতিক, তারানা হালিম, ফজিলাতুনেচ্ছা ইন্দিরা, কায়সার হাসনাত প্রমুখ বক্তব্য দেন।

No comments

Powered by Blogger.