সময়ের প্রেক্ষিত-এ গাড়ি কি আপনার না হলেই নয়? by মনজুরুল হক

আমরা যারা দীর্ঘদিনের প্রবাসী, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতিকে এ কারণেই আমরা সব সময় স্বাগত জানাই যে এর মধ্য দিয়ে সত্যিকার অর্থে দেশের অগ্রযাত্রার প্রতিফলন ফুটে ওঠায় আমাদের আর মাথা হেঁট করে স্বৈরশাসনের সমালোচনার দায়ভার বয়ে বেড়াতে হয় না।


দেশটা আমাদের পিছিয়ে পড়া এক দারিদ্র্যপীড়িত জনবসতি হলেও অন্তত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার বেলায় আমাদের যাত্রা যে পেছনমুখী নয়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সেই সত্যকে তুলে ধরার সুযোগ আমাদের জন্য করে দেয় এবং নিজের দেশের প্রশাসনের জন্য আমাদের আর লজ্জায় পড়তে হয় না, যেমনটা হয়ে থাকে সামরিক শাসনের বেলায়। তৃতীয় বিশ্বের সামরিক শাসকেরা চটকদার স্যুট গায়ে চাপিয়ে রঙিন চশমায় খুনিচোখ ঢেকে রেখে যতই মধুর বুলি আউড়ে বিদেশিদের সামনে নিজেদের মানবপ্রেমী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাক না কেন, আড়ালে তারা হাসির পাত্রই থেকে যায়। পাঠকদের অনেকেই হয়তো মনে করতে পারবেন, হাইতির একসময়ের স্বৈরশাসক পাপা ডক দুভেলিয়ে সম্পর্কে এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই উক্তি, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘সে শূকরছানা হতে পারে, তবে ভুলে যাবেন না, সে হচ্ছে আমাদের শূকরছানা।’ আমরা ভাগ্যবান যে শূকরছানার দেশ হিসেবে গণ্য হওয়ার সেই সময় এখন অতীত ইতিহাস, সমকালীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের বাস্তবতা সেটা নয়।
এই একটি দিক থেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বকে বিশ্বের অগ্রসর অনেক দেশে আজকাল পুরোপুরি অবহেলার চোখে দেখা হয় না। এর প্রধান কারণ অবশ্যই হচ্ছে আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, চলার পথে হোঁচট খেতে হলেও যে পথে আমরা থমকে দাঁড়িয়ে নেই। তবে গণতন্ত্রকে অর্থবহ করে তুলে এর সুফল জনগণের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে আরও যে দীর্ঘপথ আমাদের এখনো পার হওয়া দরকার, সেই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। সেদিক থেকে আমরা যে খুব একটি জোর কদমে হাঁটতে শিখেছি, তা অবশ্য বলা যায় না। এর প্রমাণও প্রতিনিয়তই আমাদের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে উঠে আসছে, যা কিনা প্রবাসে আমাদের আশাহত করে। আমরা ব্যথিত বোধ করি, যখন দেখি গণতন্ত্রের সামনের সারির রক্ষক ধরে নিয়ে জনতা যাঁদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে, তাঁরা নিজেরাই যখন একান্ত ব্যক্তিগত পার্থিব লাভ-ক্ষতির চুলচেরা হিসাব কষে নিয়ে একধরনের ভক্ষক হয়ে ওঠেন। হ্যাঁ, আমি সেই গাড়ি কেনার কথা বলছি, নিজেদের জন্য শুল্কমুক্ত যে সুবিধা আদায় করে নেওয়ার বেলায় বাংলাদেশের সংসদে দলীয় অবস্থান-নির্বিশেষে অভাবনীয় এক ঐক্য, আমাদের সেই বেদনাকে অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক করে তুলছে। আমরা অবাক হয়ে ভাবছি, সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার জাগতিক প্রাপ্তি শেষ পর্যন্ত যদি দাঁড়ায় কত বড় গাড়ি আমি কত কম খরচে কেনার সুযোগ পাব, তবে কেন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ নিয়ে লোকদেখানো এই বিভেদ?
পত্রিকার খবরে আমরা জানতে পারলাম, বাংলাদেশে সাংসদেরা তিন কোটি টাকার গাড়ি ৫০ লাখ টাকায় কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। আরেকটু খোলাসা করে বললে বলতে হয়, পদাধিকার বলে সেই সুযোগ নিজেরাই তাঁরা নিজেদের জন্য করে নিয়েছেন। সাংসদের আরেক অর্থ হচ্ছে আইনপ্রণেতা, ফলে নিজেদের ব্যক্তিগত পার্থিব সুবিধা নিশ্চিত করে নেওয়ার আইনও তাঁরা সহজেই তৈরি করে নিতে পারেন, যদিও অগ্রসর গণতন্ত্র এই শিক্ষা আমাদের দিয়ে থাকে, আইন তৈরি করতে হয় দেশের মঙ্গলের ভাবনাকে সামনে রেখে, নিজের লাভ-ক্ষতির হিসাবকে নয়। ফলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় জনতার ভোটে নির্বাচিত সাংসদেরা যখন সাংসদদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তির ধারণাকে জনতার প্রাপ্তির চেয়ে উঁচুতে স্থান দেন, এর চেয়ে বেদনাদায়ক গণতন্ত্র তো তখন অন্য আর কোনো পরিস্থিতিতে দেখা যায় না। আমি অবশ্যই মেকি গণতন্ত্রের কথা এখানে বলছি না, যে রকম গণতন্ত্রের চর্চা আমাদের দেশে অতীতে করে গেছেন সামরিক উর্দিধারী অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা। কলঙ্কিত সেই অতীত থেকে বের হয়ে এসে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথে আমরা এখন অগ্রসরমান। তবে তার পরও বলতে হয়, গণতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্রে সাংসদদের এ ধরনের লজ্জাজনক আচরণের প্রমাণ ইন্টারনেটে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলেও সহজে চোখে পড়ে না। বিষয়টিকে লজ্জাজনক এ কারণেই আমি বলছি, এই যে আড়াই কোটি টাকার বাড়তি সুযোগ পদাধিকার বলে নিজেদের জন্য নিজেরা তাঁরা করে নিলেন, এতে লাভটা হলো কার এবং ক্ষতির বোঝাই বা বহন করতে হচ্ছে কাকে? আসুন, সেই দিকটায় আমরা একটু চোখ বুলিয়ে নিই।
যে গাড়ি কিনতে হলে বাংলাদেশের আমজনতাকে শুল্ক বাবদ পরিশোধ করতে হয় তিন কোটি টাকা, সেই গাড়ি এখন আমাদের সম্মানিত সাংসদেরা জনতার পরিশোধ করতে হওয়া মূল্যের মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ পরিশোধ করে ঘরে তুলতে সক্ষম। লাভবান এতে যে সাংসদেরা হচ্ছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর ক্ষতিটা অন্যদিকে হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের, যে কোষাগারে অর্থের টানাটানিতে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ গণ্য অনেক প্রকল্পকেই মাঝপথে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়। তিন শতাধিক সাংসদের প্রত্যেকের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বঞ্চিত সেই আড়াই কোটি টাকার সামষ্টিক হিসাব কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এই অর্থে বেশ বড়সড় কোনো প্রকল্পের কাজও যে সহজেই সেরে নেওয়া সম্ভব, সেই প্রশ্নে মনে হয় দ্বিমত পোষণের সুযোগ খুব একটা নেই। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি, সাংসদদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে নেওয়ার জন্য ক্ষতি যাদের হচ্ছে, তারা হলো গিয়ে আবারও সেই বাংলাদেশের আমজনতা, নিজের মূল্যবান ভোট দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যারা সংসদে পাঠিয়েছে, তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের কথা সেখানে তুলে ধরে সেই কষ্ট লাঘবের আইন তৈরি করার জন্য। আইন যেহেতু হচ্ছে বায়বীয় কোনো কিছু, যা কিনা খোলা চোখে দৃষ্টিগোচর হয় না, ফলে আইনের বর্মে সজ্জিত হয়ে ভোটারদের সামনে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে বরং খেতখামার ডিঙিয়ে বিশাল বড় গাড়ি নিয়ে জনতার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই তাঁরা বুঝতে সক্ষম হবেন, যাঁদের তারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, সত্যিকার অর্থে তাঁরা বাহাদুরই বটে। রাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি এতে কী পরিমাণ হচ্ছে, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়?
এ তো হচ্ছে গিয়ে দৃশ্যমান ক্ষতির খতিয়ান, অঙ্কের হিসাব কষে সহজেই যা কিনা দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব। এর বাইরে সাংসদদের বিশাল সেই গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়ার অদৃশ্য যে ক্ষতি, তাও কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়। আমি নিশ্চিত, সাংসদ নির্বাচিত হওয়ায় মানব পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার নানা রকম হিতোপদেশ তাঁদের নিয়মিত দিয়ে যেতে হয়, যেখানে তাঁরা পরিবেশপ্রেমী হিসেবে নিজেদের এবং দলীয় আদর্শকে তুলে ধরায় কোনোরকম কার্পণ্য মোটেও করেন না। তবে বিশালদেহী তেলখেকো যেসব গাড়ি তাঁরা রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে করবঞ্চিত করে হস্তগত করছেন, কী পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছেড়ে দিয়ে পরিবেশের কতটা ক্ষতি তাঁরা নিয়মিত করে চলেছেন, সেই হিসাব জনতার সামনে তুলে ধরার সময় মনে হয় এখন উপস্থিত। জলবায়ুর পরিবর্তনে ভবিষ্যতে সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতির শিকার যেসব দেশকে হতে হবে, সেই তালিকার প্রথম সারিতে কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণে অন্যদের চেয়ে বেশি সচেতন হয়ে ওঠা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যে সচেতনতা আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে আশা করা খুবই স্বাভাবিক। এখানেও তাই আমরা পাচ্ছি সম্পূর্ণ উল্টো এক ছবি—তেলখেকো ল্যান্ড ক্রুজার আর প্রাডোতে চেপে সাংসদ চলেছেন মফস্বলের জনগণকে পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের করণীয় সম্পর্কে হিতোপদেশ দিতে!
সাংসদদের এই গাড়িসুবিধা আদায় করে নেওয়ার পুরো ব্যাপারটাই তাই যেন হচ্ছে এমন এক ঢাল, যার পেছনে আশ্রয় নিয়ে দল-মতনির্বিশেষে সব কটি দলের প্রতিনিধিত্বকারী সাংসদেরা নানাভাবে দেশের ক্ষতি করে চলেছেন। জাপানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এ রকম কোনো বাড়তি সুবিধা নিজেদের জন্য আদায় করে নেওয়াকে অনেকটা হারাম হিসেবেই দেখা হয়। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ তাঁদের রয়েছে, তবে এর বাইরে এমনকি নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত ব্যক্তিগত সফরে যেতে হলেও নিজের পরিবহনব্যবস্থা তাঁদের নিজেদেরই করে নিতে হয়। এ ছাড়া আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত দাখিল করা সাংসদদের জন্য বাধ্যতামূলক, যে হিসাবের প্যাঁচে আটকে গিয়ে সাংসদদের নিয়মিত বিচার বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি হওয়া জাপানে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ক্ষমতাসীন সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী এক নেতাকে এখন সে রকম এক কেলেঙ্কারি সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আর সরকারের দেওয়া আর্থিক সুবিধাসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের বেলায় সেই সুবিধা যেন জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকে, সে দিকটায় সজাগ দৃষ্টি সাংসদেরা রেখে যাচ্ছেন। অনেকটা আমাদের বাংলাদেশের মতোই গাড়ি কেনায় সরকারি তহবিল থেকে ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা রেখে যে আইন গত বছর জাপানে কার্যকর হয়েছে, তার ঢালাও সুবিধা ভোগ করছে জাপানের আমজনতা। চলতি মাসের শেষ দিকে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে যাওয়া সেই আইনের আওতায় পরিবেশবান্ধব হিসেবে গণ্য হাইব্রিড গাড়ি কেনার বেলায় জাপানের নাগরিকেরা এখন সরকারি তহবিল থেকে আড়াই লাখ ইয়েন ভর্তুকি পাচ্ছেন। বলা বাহুল্য, সেই সুবিধা সাংসদেরা শুধু নিজেদের মধ্যে সীমিত রাখেননি। ফলে বাংলাদেশেও আমাদের সম্মানিত গণপ্রতিনিধিরা যদি পরিবেশের অনুকূল গাড়ি কেনায় উদ্যোগী হয়ে সে রকম গাড়ির জন্য কর ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতেন, তাহলে বরং প্রশংসাই তাঁদের কপালে জুটত।
জাপানের কাছ থেকে তাই অনেক কিছু শেখার আমাদের এখনো রয়ে গেছে।
সাদাকাজু তানিগাকি হচ্ছেন জাপানের সংসদে বিরোধী দলের নেতা। উদার গণতন্ত্রী দল ক্ষমতাসীন থাকার সময় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। গত বছরের শেষ দিকে এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কিছুদিন তাঁকে হাসপাতালে কাটাতে হয়। সে রকম কোনো বড় দুর্ঘটনা সেটা ছিল না। সাইকেল চালিয়ে দোকানে যাওয়ার সময় এক বৃদ্ধাকে পাশ কাটাতে গিয়ে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে গায়ে তিনি আঘাত পেয়েছিলেন। ঘটনা হিসেবে এটা খুবই সামান্য। তবে এর থেকে মনে হয় শেখার অনেক কিছু আমাদের সাংসদদের রয়েছে। জাপানের সংসদের নিম্নকক্ষের বিরোধীদলীয় নেতা এবং সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রী ব্যক্তিগত কাজে বাইরে যেতে সাইকেল ব্যবহার করছেন, ঢাউস কোনো তেলখেকো গাড়ি নয়। ফলে পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর সচেতন থাকার বার্তাও এর মধ্য দিয়ে আমরা পাচ্ছি, যা কিনা জনতার চোখে তাঁর ভাবমূর্তিকে করে তুলেছে অনেক বেশি উন্নত। ঠিক উল্টোটাই হতে পারত দূষণ ছড়িয়ে দেওয়া তেলখেকো কোনো গাড়িতে দুর্ঘটনার শিকার তিনি হলে।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.