ভূমিকম্প-১২ জুন এবং ভবন নিয়ে ভাবনা by মো. আলী আকবর মল্লিক

বাংলাদেশের উত্তর সীমানার অনতিদূরে, তথা ঢাকা থেকে মাত্র ২৫২ কিলোমিটার উত্তরে, ভারতের আসাম বেসিনে ১৮৯৭ সালের ১২ জুন রিখটার স্কেলে ৮-এর অধিক মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটেছিল, যা ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এটি পৃথিবীতে এ পর্যন্ত ঘটা মহাপ্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের একটি।


উৎপত্তি হয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩২ কিলোমিটার গভীরে, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল প্রায় চার লাখ বর্গকিলোমিটারে। আসাম, ত্রিপুরা, ধুবড়ি, শিলং, পূর্ববঙ্গে ইটের তৈরি মসজিদ-মন্দির, রাজবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল। ঢাকার আহসান মঞ্জিল, দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত এবং নাটোরের রাজবাড়ির একাংশ বিধ্বস্ত হয়েছিল। লোক মারা যায় ১,৫৪২ জন।
যেখানে একবার ভূমিকম্প ঘটে সেখানে কোনো এক রিটার্ন পিরিয়ডে আবারও ওই একই মাত্রার ভূমিকম্প ঘটতে পারে। কারণ ভূতত্ত্বের বৈশিষ্ট্য, টেকটনিকের ইতিহাস এবং ভূমিকম্প ঘটা—এই তিনের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের মতো। ভূগর্ভের যে ফাটল বা চ্যুতিতে ভূমিকম্প ঘটে সেই চ্যুতিতে পুনর্বার শক্তি সঞ্চয়ের প্রবণতা এর জন্য দায়ী। তাই একটি চ্যুতিতে ঘটা ভূমিকম্পের বয়স বাড়ার সঙ্গে ওই চ্যুতিতে পুনর্বার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে থাকে। এ বছর দি গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েকের বয়স হলো ১১৫ বছর। ১৮৯৭ সালে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে স্থাপনা বলতে ইটের তৈরি কিছু বাড়ি, রাজবাড়ি আর মসজিদ-মন্দির ছাড়া কিছু ছিল না। তাই ব্যাপক আকারে স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার সুযোগ ছিল না। আজকে বাংলাদেশে আছে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা লাখো স্থাপনা।
বাংলাদেশে নির্মিত হয়ে চলা ভবনগুলোর ত্রুটি নিয়ে এর আগেও বহুবার বিভিন্ন মাধ্যমে বলে আসছি। কিছুটা সচেতনতা বাড়লেও তা মোটেও সন্তোষজনক নয়।
ভূমিকম্পের বিষয়কে মোটা দাগে ভূতত্ত্ব, সিসমোলজি, কাঠামোর ওপর ভূমিকম্পের প্রভাব ও পোস্ট-ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট—এই চার ভাগে ভাগ করা যায়। ভূগর্ভের কোথায় চ্যুতি আছে তা ভূতত্ত্ব দ্বারা নির্ণয় করা সম্ভব হলেও ওই চ্যুতিতে ভূমিকম্প ঠেকানোর কৌশল মানুষের সাধ্যের বাইরে। সুতরাং একটি চ্যুতিতে ভূমিকম্প ঘটলে স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি কম হয়ে কম লোক যাতে মারা যায় এবং পোস্ট-ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের কাজের পরিমাণ যাতে কম হয় এমন করে ভাবতে হবে। সে জন্য ভূমিকম্প সহনশীল স্থাপনা বিশেষ করে ভবন নির্মাণে সদিচ্ছা থাকতে হবে এবং সঠিক পদ্ধতি মেনে চলতে হবে।
ভূমিকম্প সহনশীল স্থাপনা নির্মাণে অতিব গুরুত্বের বিষয় হচ্ছে মাটির পরীক্ষা, স্থাপনার সঠিক নকশা প্রণয়ন, কাঠামোর ডিজাইন এবং সঠিক মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার। নকশা প্রণয়ন এবং কাঠামো ডিজাইনের সময় গুরুত্ব দিতে হবে স্থাপনার সমতল ও উল্লম্ব উভয় দিকের সমবিন্যাসের ওপর।
ভবনের উল্লম্ব দিকের দুটি ত্রুটি নিয়ে বলব। ভূমিকম্পের ফলে একটি ভবনের প্রতিটি তলায় বক্রনীয় এবং কর্তনীয় পীড়ন কাজ করে। উভয় পীড়ন সবচেয়ে বেশি কাজ করে ভবনের নিচতলায়। গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে নিচতলায় শুধু কলাম থাকলেও আবাসিক তলাগুলোতে কলামের সঙ্গে থাকছে ইটের তৈরি অনেকগুলো ১০ ইঞ্চি, ৫ ইঞ্চি দেয়াল। তাই আবাসিক তলাগুলো বক্রনীয় পীড়ন সামান্য কিছুটা বেশিমাত্রায় এবং কর্তনীয় পীড়ন অনেকটা বেশিমাত্রায় সহনশীল। পক্ষান্তরে কার পার্কিং তলাতে দেয়াল না থাকাতে এই তলার কর্তনীয় পীড়ন সহনশীল শক্তি অনেক কম। তাই ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট পীড়ন সহনশীলতায় কার পার্কিং তলাটি আবাসিক তলার থেকে দুর্বল, যাকে প্রকৌশলের ভাষায় ‘সফট-স্টোরি’ বলে। পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া বড় মাত্রার ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভবনের বড় অংশ বিধ্বস্ত হয়েছে সফট-স্টোরি ত্রুটির কারণে। তাই গাড়ি পার্কিংয়ের উদ্দেশ্যে খোলা রাখা তলাগুলো আবাসিক তলার মতো মজবুত করে নির্মাণ করা জরুরি। বহির্ভাগের কলামগুলোর সঙ্গে আরসিসির শিয়ার দেয়াল বা আরসিসির ব্রেসিং বা উভয়ই নির্মাণ করে গাড়ি পার্কিং তলাটিকে মজবুত করা যায়। এ ছাড়া সিঁড়ির ঘর-বরাবর আড়াআড়িভাবে থাকা কলামগুলোর সঙ্গে আরসিসি শিয়ার দেয়াল বা ব্রেসিং নির্মাণ করা যায়। এসব কী পরিমাণ এবং কতটা মজবুত করে নির্মাণ করতে হবে তা কাঠামো ডিজাইনার হিসাব করে বের করবেন। যেসব ভবন দুর্বল তলা নিয়ে নির্মিত হয়ে আছে সেগুলোকে রেট্রোফিটিং করে ঠিকঠাক করা যায়।
বহুতল কার পার্কিং, রেল বা বাসস্টেশনের প্লাটফর্ম ইত্যাদি স্থাপনা নির্মাণে সাধারণত ফ্লাট-প্লেট পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এসব স্থাপনা নির্মাণে ফ্লাট-প্লেটগুলো যেমন পুরু করে নির্মাণ করা হয়, তেমনি কলামগুলোও অধিক বড় আকারে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ঢাকার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সাধারণ ভবনও এই ফ্লাট-প্লেট দ্বারা নির্মিত হতে। ফ্লাট-প্লেটের বক্রনীয় শক্তি কলামের বক্রনীয় শক্তির তুলনায় অনেক বেশি বলে এসব ভবন ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ। তার কারণ হলো ভবনের উচ্চতা যত বাড়ে কলামের মাপ তত বাড়লেও ফ্লাট-প্লেটের পুরুত্ব একই থাকে। প্রায় দ্বিগুণ পুরু করে তৈরির ফলে স্লাবের ভরও দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং এই অতিরিক্ত ভরের কারণে ভূমিকম্পের মুহূর্তে ভবনের প্রতিটি তলায় বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের পার্শ্বশক্তি কাজ করে এবং ভবনকে ধরাশায়ী করতে সাহায্য করে। তাই ফ্লাট-প্লেট নয়, সাধারণ বিম-স্লাব দ্বারা ভবন নির্মাণ করতে হবে।
দি গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক ঘটলে আমাদের অবস্থা যেন হাইতির মতো না হয়ে চিলির মতো হয় তা ভাবা দরকার। উল্লেখ্য, ১২ জানুয়ারি ২০১০ ক্যারাবিয়ান দ্বীপদেশ হাইতিতে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটে তিন লাখ ১৬ হাজার লোক প্রাণ হারায়। পক্ষান্তরে চিলিতে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০ রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটে মাত্র এক হাজার লোক প্রাণ হারায়। অথচ চিলির ভূমিকম্পটি হাইতির থেকে ৫০১ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। ক্ষয়ক্ষতির আকাশ-পাতাল তফাতের অন্যতম কারণ ভূমিকম্পের জন্য চিলির প্রস্তুতি ছিল তথা চিলি কড়াভাবে বিল্ডিং কোড মেনে চলেছে এবং হাইতি ছিল অপ্রস্তুতি, তথা হাইতির বিল্ডিং কোডই ছিল না।
ড. মো. আলী আকবর মল্লিক: কাঠামো প্রকৌশলী, ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাবেক মহাসচিব।

No comments

Powered by Blogger.