স্থানীয় সরকার-চাই সমন্বয়, ক্ষমতার লড়াই নয় by তোফায়েল আহমেদ

আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন না করার কোনো যুক্তি নেই। এ ব্যাপারে প্রথম ভুলটি করেছে নির্বাচন কমিশন। আইন সংশোধন ছাড়া নির্বাচন করা যাবে না বলে কমিশন যে অবস্থান নিয়েছে, তা সঠিক নয়।


কমিশনের চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত সরকার পৌরসভা আইন সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিলেও ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তা হলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কি অনন্তকাল ঝুলে থাকবে?
আমরা মনে করি, বর্তমান আইনেই যথাসময়ে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করা যেত। আইনে আছে, কোনো ওয়ার্ডের জনসংখ্যা অন্য ওয়ার্ড থেকে শতকরা ১০ ভাগের বেশি বা কম হতে পারবে না। ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সব সময়ই এটি হতে পারে। আড়াই বছর আগেই ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে। সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজটি খুব জটিল বা সময়সাপেক্ষ নয়। দুই মাসেই এটি করা সম্ভব।
সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার কর্মকর্তা নিয়োগ করবে এবং তাঁরা এলাকায় গণশুনানির মাধ্যমে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজটি সম্পন্ন করবেন। সাধারণভাবে জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এ কাজটি করে থাকেন। নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে যে সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে, তার কোনো কারণ দেখি না। জাতীয় নির্বাচনের আগেও কিন্তু নির্বাচনী এলাকার আসন পুনর্নির্ধারণ নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছিলেন। নির্বাচন কমিশন সেই আপত্তি আমলে নেয়নি। তাদের সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনেও তারা তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারত। কেন থাকল না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। এ কথা সত্য, সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে আপত্তি থাকবে। কিন্তু তার নিষ্পত্তি করা কঠিন ছিল বলে মনে করি না।
ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজটি করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকায় কর্মকর্তা পাঠিয়ে গণশুনানির ব্যবস্থা করবেন। আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলেও সমস্যা নেই। এখনো হাতে চার মাসের মতো সময় আছে।
সম্প্রতি ঢাকা সিটি করপোরেশনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুই ওয়ার্ড কমিশনারের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সরকারের প্রতি রুল জারি করেছেন। এ ব্যাপারে সরকার কী জবাব দেয়, সেটিও দেখার বিষয়। সব স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন যথাসময়ে হতে হবে। কোনো অজুহাতেই কোনো সংস্থার নির্বাচন পেছানো যাবে না। নির্বাচন যথাসময়ে না হলে নানা সমস্যা দেখা দেয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণ। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করতে আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই। সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো ছোটখাটো বিষয়ে আইন পরিবর্তন করলে পরে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে চাইলে কেউ আপত্তি করতে পারেন। স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনের জন্য আইন পরিবর্তন করতে বলাটা ছিল নির্বাচন কমিশনের ভুল সিদ্ধান্ত। বরং তাদের বলা উচিত ছিল, আইন অনুসরণ করেই যাতে নির্বাচন করা যায়, সরকারকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
২.
স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর ক্ষমতা ও এখতিয়ার নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। কোনো বিষয়ে বিতর্ক বা যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দোষের কিছু নয়। কিন্তু এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মুখোমুখি অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্থানীয় সরকারের কোন সংস্থার কী কাজ, তা আইনেই লেখা আছে। অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও আইনে বেশ কিছু দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে আইনি বাধার চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক বাধা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে । বর্তমানে যে আইন আছে, তার অধীনেই স্থানীয় সরকারের কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর আছে। তাদের অবকাঠামো ও বিন্যাসও ভিন্ন। যেমন সিটি করপোরেশন এবং বেশ কিছু পৌরসভা আর্থিকভাবে অনেকটা স্বাবলম্বী। এসব প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধি নিজস্ব কর্মচারী দিয়ে কাজ করতে পারেন। সেই সামর্থ্য তাঁদের আছে। কিন্তু উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের পক্ষে সেটি সম্ভব নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও লোকবলের ওপরই তাঁদের নির্ভর করতে হয়। সরকারের উন্নয়ন ও সেবা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নেও সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব হলো সেই কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করলে প্রশাসন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে সংঘাত হওয়ার কথা নয়। সমস্যা হয় তখনই, যখন এটিকে কর্তৃত্ব হিসেবে দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
বর্তমানে উপজেলা পরিষদের কাজকর্ম নিয়ে যে সমস্যা ও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, সে জন্য আইন নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনমানসিকতা অনেকটাই দায়ী। এ ছাড়া অনভিজ্ঞতার বিষয়টি তো রয়েছেই। আশির দশকে উপজেলা পদ্ধতি চালু হলেও গত ১৮-১৯ বছর নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ ছিল না। এত দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনওরা নিজস্ব নিয়মে কাজ করে আসছিলেন। হঠাৎ করে নির্বাচিত পরিষদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। তবে সেটি যত দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যায়, ততই মঙ্গল। আবার উপজেলা চেয়ারম্যানদেরও প্রায় সবাই নতুন। তাঁরা যদি ভেবে থাকেন, পরিষদের সবকিছু তাঁদের হুকুমে চলবে, সেটিও ঠিক নয়। এখানে ক্ষমতার ভারসাম্য যেমন জরুরি, তেমনি কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আরও কিছু ছোটখাটো সমস্যা আছে। এত দিন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কক্ষটি ইউএনও ব্যবহার করতেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসায় সেটি ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে কোথাও কোথাও দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব লক্ষ করা গেছে। কোথাও বা চেয়ারম্যান এক ভবনে এবং ইউএনও অন্য ভবনে বসেন। এতেও কাজে সমস্যা হয়।
তবে এসব সমস্যা সবখানেই প্রকট, তা বলা যাবে না। আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের ১২টি উপজেলায় জরিপ করে দেখেছি, অনেকগুলোতে ভালোভাবে কাজ হচ্ছে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনওর কাজে সমন্বয় আছে। পরস্পরকে সহায়তা করছেন। আবার কোথাও কোথাও সমন্বয়হীনতাও রয়েছে। পরিষদের চেয়ারম্যান নতুন। প্রশাসনিক কাজকর্ম সম্পর্কে তাঁদের তেমন জানাশোনা নেই। ইউএনওরা এত দিন একভাবে কাজ করতেন। নতুন ধারায় কাজ করার বিষয়টি হয়তো অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা ইতিবাচক বলেও মনে করি। মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে একটি পরিপত্র জারি করেছে, যাতে পরিষদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা আছে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে সরকার উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউএনওদের প্রশিক্ষণের কাজও চলছে। এটিও ভুল বোঝাবুঝি অনেকটা কমিয়ে আনবে। নিজ নিজ কাজের এখতিয়ার সম্পর্কে সবার স্পষ্ট ধারণা থাকলে দ্বন্দ্ব কমে আসবে। প্রশিক্ষণকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও স্থানীয় সরকারসচিব যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, তাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বলেছেন, ইউএনওদের স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচিত পরিষদের অধীনেই কাজ করতে হবে। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি নিলে সমস্যা থাকবে না আশা করি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো নির্দেশনার মধ্যেও সমন্বয় থাকতে হবে। এসব নির্দেশনা পরিষদের মাধ্যমে এলে কাজের গতি বাড়বে, জটিলতাও কমবে। উপজেলা পর্যায়ে ১৪টি স্থায়ী কমিটি আছে। বিভিন্ন ধরনের কমিটি থাকার কারণে কাজে সমন্বয় নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এর বাইরে প্রকল্পভিত্তিক কমিটি আছে। তার পরও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটি যত কম হয়, তত ভালো।
বর্তমানে সরকার স্থানীয় সরকার তথা উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে বিপুল পরিমাণ অর্থও বরাদ্দ দিচ্ছে। কোটি কোটি টাকা যাচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন, গণস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে। সেগুলোর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় সরকার সংস্থাকে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। উপজেলা পর্যায়ে কোনো কোনো দপ্তরে বেশি লোকবল আছে, অথচ তাদের বরাদ্দ কম। আবার কোনো কোনো দপ্তরে বেশি বরাদ্দ আছে, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের যথেষ্ট লোকবল নেই। এ ক্ষেত্রেও উপজেলা পরিষদ সমন্বয় করে জনসেবার মান বাড়াতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার সংস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কতজন চিকিৎসক উপস্থিত বা অনুপস্থিত আছেন, সেটি তো কেন্দ্র থেকে তদারক করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসনের কাজে জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে।
এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, স্থানীয় সরকার, বিশেষ করে উপজেলা পরিষদ নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রায়ই নেতিবাচক খবর ছাপা হলেও মাঠের চিত্র ততটা নেতিবাচক নয়। কোনো কোনো উপজেলায় সুষ্ঠু কাজ হচ্ছে। ময়মনসিংহ সদর, রংপুর, পটুয়াখালীর দুমকি, সিলেটের বিশ্বনাথসহ বেশ কিছু উপজেলায় দেখেছি খুব ভালোভাবে কাজ হচ্ছে। পাশাপাশি বিপরীত চিত্রও আমরা দেখেছি। উদাহরণ হিসেবে সাভারের কথা উল্লেখ করা যায়। সেখানে ইউএনও পরিষদকে অগ্রাহ্য করে সবকিছু করছেন। আবার পাশের উপজেলা ধামরাইয়ে দেখেছি, ইউএনওকে পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করতে।
সাংসদ ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মধ্যেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, সাংসদ হবেন পরিষদের উপদেষ্টা। তিনি উপদেশ দিলেও তো কোনো সমস্যা দেখি না। সব সময় পরিষদের সভায় তাঁর যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। আইন অনুযায়ী পরিষদের সিদ্ধান্ত তাঁকে অবহিত করাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু উপজেলা পরিষদের সভায় স্থানীয় সাংসদ যদি নিজেই সভাপতিত্ব করেন, সে ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও অন্যরা অপাঙেক্তয় হয়ে যান। এ রকম ঘটনা ফরিদপুরের একটি উপজেলায় ঘটেছে। স্থানীয় সাংসদ, উপজেলার নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা সরকারি কর্মকর্তা—কেউ কারও প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা নিজ নিজ সীমার মধ্যে থেকে কাজ করলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ।

No comments

Powered by Blogger.