সরকারি কলেজ-বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় by তুহিন ওয়াদুদ

বাংলাদেশের সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সরকারের অবহেলা আর উপেক্ষার শিকার হয়ে কোনোরকম তার পরিচয় নিয়ে বেঁচে আছে। সরকারি কলেজে যে শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, তার প্রতি সরকারের যত্ন নেওয়ার কোনো প্রচেষ্টাও চোখে পড়ে না।


অথচ দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থী সরকারি কলেজে পাঠ গ্রহণ করে থাকে। দেশে বিভিন্ন গ্রেডের কলেজ রয়েছে। যেমন: অনেক কলেজ রয়েছে, যেখানে সম্মান ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পাঠদান করানো হয়। কোনো কলেজে স্নাতক সম্মান শ্রেণী পর্যন্ত, আবার কোনো কলেজ রয়েছে যেখানে শুধু উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি পাস কোর্স পর্যন্ত পাঠদান করানো হয়। এই সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষকসংকট অবর্ণনীয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পদ সৃষ্টি করাও হয়নি কলেজগুলোতে। যেমন: শুধু উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক শ্রেণীর জন্য কোনো কলেজে হয়তো চারজন শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে, সেখানে পরবর্তী সময়ে সম্মান কোর্স ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করা হলেও নতুন করে কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে চারজন শিক্ষক দিয়েই চলছে উচ্চমাধ্যমিক, তিন বছরের স্নাতক, চার বছরের স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর। বড় বড় শহরে, রাজধানী ছাড়া অন্য জেলা শহর এবং উপজেলা পর্যায়ে যে কলেজগুলো রয়েছে, সেখানে আবার চারটি করে পদ থাকলেও চারজন করে শিক্ষক অধিকাংশ সময়ই পদায়ন করা থাকে না। সেখানে কখনো কখনো একজন করে শিক্ষকও থাকেন না।
বর্তমানে অনেক কলেজে কর্তৃপক্ষ নিজেদের চেষ্টায় শিক্ষকদের পদ সৃষ্টির জন্য আবেদন করছে। যতগুলো পদের জন্য আবেদন করা হচ্ছে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে ততগুলো পদের অনুমোদন হচ্ছে না। এক দশক ধরে যে কলেজগুলোতে সম্মান কোর্স চালু হয়েছে, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই বিভাগগুলোতে অধ্যাপক পদ বলে কোনো পদের অনুমোদন ছিল না। একজন করে সহযোগী অধ্যাপকের পদ ছিল, যিনি থাকতেন বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। নতুন করে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগগুলোতে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। অনেক বিভাগে বিভাগীয় প্রধানের পদটি অধ্যাপক পদে উন্নীত করা হয়েছে। যখন কলেজগুলোতে শুধু উচ্চমাধমিক ও স্নাতক পর্যায়ে পাঠদান করানো হতো, তখন অধ্যক্ষ পদে অধ্যাপক ও উপাধ্যক্ষ পদে সহযোগী অধ্যাপক সমমর্যাদায় পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। নতুন করে যখন বিভাগগুলোতে অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করা হলো তখন উচিত ছিল একই সঙ্গে উপাধ্যক্ষ পদটিকে অধ্যাপক পদে উন্নীত করা। কিন্তু তা না করে উপাধ্যক্ষ পদটিকে সহযোগী অধ্যাপকই রাখা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিকভাবে একজন অধ্যাপক সহযোগী অধ্যাপকের অধীন চাকরি করছেন। এ রকম অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’ এ প্রবাদ বাক্যের আক্ষরিক রূপ যেন এসব কলেজ। সরকারি কলেজগুলোর পরিচর্যা করার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর রয়েছে। সেখানে নিশ্চয়ই তালিকা রয়েছে, কোন কোন কলেজে কতগুলো কোর্স পড়ানো হয়, তার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করলে কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো আবেদনের প্রয়োজন হতো না এবং বিব্রতকর অবস্থায় উপাধ্যক্ষ ও বিভাগীয় অধ্যাপকদের পড়তে হতো না।
যেসব কলেজে কিংবা বিভাগে নতুন করে পদ সৃষ্টি করা হয়নি, সেই কলেজগুলোতে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করে পাঠদান করানো হয়ে থাকে। এখানেও অনেকটা বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় হয়ে ওঠে। যেখানে ন্যাশনাল সার্ভিস চালু আছে, সেখানে ন্যাশনাল সার্ভিসের কর্মীদের দিয়ে সম্মান কোর্সের পাঠদানও করানো হচ্ছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে এখন প্রায় ১১ জন ন্যাশনাল সার্ভিসের কর্মী রয়েছেন, যাঁরা পাঠদান করছেন। ন্যাশনাল সার্ভিসে তাঁরা চাকরি করেন, যাঁরা কোনো দিন কোথাও চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাঁদের দিয়ে সম্মান কোর্সে পাঠদান করানো হচ্ছে। হায়রে বাংলাদেশ! শিক্ষার প্রতি উদাসীনতার চরম প্রকাশ!
বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় হওয়ার বৃত্তান্ত এখানেই শেষ নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীর জন্য যে পাঠক্রম তৈরি করা হয়েছে, তা কলেজগুলোর শিক্ষার্থীর মেধার পক্ষে অধ্যয়ন করা কঠিন। তার পরও সেই পাঠক্রম অনুযায়ী পাঠদান চলছেই। গত বছরে ২০০৮ সালের এমএ পরীক্ষায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ফল প্রকাশিত হয়, সেখানে প্রথম শ্রেণীর অস্বাভাবিক আধিক্য লক্ষ করা যায়। সেটাও বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় অবস্থা যেন। কারণ হিসেবে বলা যায়, বাংলা বিভাগে যাঁরা প্রথম শ্রেণী অর্জন করেছিলেন, তাঁরা কেউই লিখিত কোনো কোর্সেই প্রথম শ্রেণী পাননি; বরং লিখিত পরীক্ষার মোট শতকরা হার অনেকেরই ৫১, ৫২ ও ৫৩ শতাংশ। তাঁদের ৪০০ নম্বরের লিখিত ও ৫০ নম্বরের টিউটরিয়াল এবং ৫০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় এত কম নম্বর পেয়েও তাঁরা অবশিষ্ট ১০০ নম্বরের মধ্যে ৯২, ৯৩ শতাংশ নম্বর পেয়ে প্রথম শেণীতে উত্তীর্ণ হন।
বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় হওয়ার বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানটি। দেশজুড়ে বিশাল তাদের কর্মযজ্ঞ থাকলেও তাদের বিকাশ হয়েছে অত্যন্ত স্বল্প। তার ওপর জনবল ছাঁটাইয়ের কারণে তা আরও গুটিয়ে এসেছে। তাই বলে তাদের কার্যক্রম কমেনি এতটুকু। বাঁশের বিকাশ না হলেও কঞ্চির বিকাশ হচ্ছে দ্রুতগতিতে। দেশের সরকারি কলেজের পাশাপাশি চলছে বেসরকারি কলেজগুলোতে সম্মান কোর্স চালুর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এসব কলেজের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও যে সেই প্রবাদের মতোই। কারণ, বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের আর্থিক অনুমোদন সরকার দিচ্ছে না। আর্থিক অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় যদি হয় বাঁশ, তাহলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে কঞ্চি। কঞ্চি দড় হওয়ার কারণে কোর্স অনুমোদন হচ্ছে এবং অর্থ অনুমোদন হচ্ছে না। অধ্যাপকের চেয়ে সহযোগী অধ্যাপক বড়, খণ্ডকালীন এবং ন্যাশনাল সার্ভিসের শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থী ভালো, পাঠক্রমের চেয়ে পাঠগ্রহণকারী দুর্বল, লিখিত পরীক্ষার চেয়ে মৌখিক পরীক্ষায় ভালো, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামর্থ্যের চেয়ে পরিধি বড়—সবকিছু থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তা না হলে শিক্ষার সুস্থ বিকাশ অসম্ভব।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.