ইসরায়েলের বলপ্রয়োগ-যুক্তরাষ্ট্রের দেখেও না দেখার ভান by রবার্ট ফিস্ক

‘ফিলিস্তিনে’র অস্তিত্ব আর নেই। ‘শান্তিপ্রক্রিয়া’ বা ‘রোডম্যাপ’ যে নামই দেওয়া হোক; বারাক ওবামার দুর্বলতার ওপর দায় চাপানো হোক, কোনোমতেই ‘ফিলিস্তিন’-এর খোঁজ মিলবে না। ওবামা করুণ শিশুসুলভ স্বীকারোক্তি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অর্জন তাঁর কল্পনার চেয়ে ‘অনেক কঠিন’।


তাঁর অবস্থা এক আশাবাদী চিকিত্সকের মতো, যে অসুস্থ শিশুর সেরে ওঠার আশাহীন অবস্থায় বাবা-মার কাছে তাকে ফেরত দেয়।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ‘দুই রাষ্ট্র’ গঠনের মাধ্যমে সমাধানের যে স্বপ্ন, যেখানে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের কয়েক দশকের যুদ্ধাবস্থার একটি মহত্ নিষ্পত্তি ঘটবে বলে আশা জেগেছিল, তা আজ প্রায় মৃত।
ইসরায়েলের সরকার এখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সামান্যতম আশাও কার্যকরভাবে ধ্বংস করার সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয়ই নীরব দর্শকের ভূমিকায়। পাঠক যখন এই লেখা পড়ছেন সেই সময়ও ইসরায়েলের বুলডোজার আর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ শান্তির শেষ সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে। এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল প্রতীকী তাত্পর্যের জেরুজালেম নগরেই ঘটছে না, বরং কৌশলগত কারণে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অধিকৃত পশ্চিম তীরের বাইবেলে বর্ণিত বিস্তৃত ভূমির ৬০ শতাংশ এলাকায়ও চলছে। সেই বিস্তৃত জায়গায় ইহুদিদের সংখ্যা এখন মুসলমানদের প্রায় দ্বিগুণ।
পশ্চিম তীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী যাদের আবাসস্থল বিলুপ্ত অসলো চুক্তিতে বর্ণিত ‘এরিয়া সি’তে পড়ে, তাদের এখন এমন একটি ইসরায়েলি শাসন মেনে চলতে হয়, যা বর্ণবাদের সমার্থক। এক গুচ্ছ ইসরায়েলি আইন সেখানে কার্যকর আছে, যা প্রায় সব নতুন ফিলিস্তিনি দালান তৈরি বা গ্রামের উন্নয়নকে নিষিদ্ধ করেছে। যেসব বাড়ির অনুমতি লাভ করা অসম্ভব ফিলিস্তিনিদের সেসব বাড়ি নির্লজ্জভাবে ভেঙে ফেলা, এমনকি পুনর্নির্মিত ফিলিস্তিনি পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থা ধ্বংস করার নির্দেশও দেয় এই ব্যবস্থা। সেখানকার ইসরায়েলি ঔপনিবেশিকদের এমন সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় না। এই কারণে এখন সেখানে প্রায় তিন লাখ ইসরায়েলি বাস করে আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ ঘোষিত ২২০টি বসতিতে। এসব বসতি অধিকৃত ভূখণ্ডের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও উর্বর ভূমিতে অবস্থিত।
সম্প্রতি ওবামার বয়োবৃদ্ধ দূত জর্জ মিচেল নিজ দেশের উদ্দেশে যাত্রা করলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এই প্রস্থান উদযাপন করেন বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে। জেরুজালেমের কাছে ইসরায়েলের তিনটি বৃহত্তম কলোনির দুটিতে গাছগুলো রোপণ করা হয়। গাশ এতজায়ন ও মা’আলেহ আদুমিমে এসব গাছ লাগানো হয়। নেতানিয়াহু বলেন, তাঁরা যে এখানে আছেন তার স্পষ্ট বার্তা পাঠাচ্ছেন তিনি। ‘আমরা এখানে থাকব। আমরা পরিকল্পনা প্রণয়ন করছি, আমরা নির্মাণকাজ চালাচ্ছি।’ জেরুজালেমের উত্তরের এরিয়েল বসতির পাশাপাশি এ দুটি বিশাল বসতি ‘সব সময়ের জন্য ইসরায়েলের তর্কাতীত অংশ’ বলে তিনি দাবি করেন।
নেতানিয়াহুর বিজয় উদযাপন আসলে আমেরিকার ‘ভুঁইফোড়’ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ওপর বিজয়ের উদযাপন। ওবামা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, আমেরিকার ভেতরেও ইসরায়েলের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখিয়েছিলেন।
আর সম্প্রতি বিশ্ববাসী যখন দেখল ৬০ লাখ ইহুদি গণহত্যার স্মরণ অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে ইরানকে নতুন নািসবাদী জার্মানি আর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে অ্যাডলফ হিটলারের মতো খারাপ বলে গালি দিলেন, তখন ভবিষ্যত্ ‘ফিলিস্তিনের’ আশাও নিঃশেষিত হতে থাকে। মাহমুদ আহমাদিনেজাদ যতটা অ্যাডলফ হিটলারের মতো, ইসরায়েলিরা তার চেয়ে বেশি নািসদের মতো। কিন্তু ইরানের ‘হুমকি’র কথা বলার উদ্দেশ্য বিশ্ববাসীর মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। কয়েক দিন আগে টনি ব্লেয়ারও এমন করেছেন, ইরাকের বিপর্যয়ের দায়ভার এড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। অবশ্য সত্যিকার বিপর্যয় চলছে জেরুজালেমের ঠিক বাইরে, পশ্চিম তীরের বেশির ভাগ ভূখণ্ডে; মাঠে, প্রস্তরবহুল পাহাড়ে, প্রাচীন গুহায়।
দি ইন্ডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
রবার্ট ফিস্ক: ব্রিটিশ সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.