অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য হবে না by রাশেদ খান মেনন

বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ঐতিহ্য অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাওয়া। কোনো নেতা অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার লিপ্সা, তাকে ধ্বংস করবে এটা জনগণ মেনে নেবে না। তারপরও আমি আশা করব,


আজ ১২ মার্চ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক অবস্থানকে পরিষ্কার করবে এবং সংসদে ফিরে এসে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন রূপরেখা কী হবে তা নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরবে

১২ মার্চ বিএনপি এবং চারদলীয় জোটের দলগুলো ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে। সারাদেশ থেকে তাদের কর্মী-সমর্থকদের সমবেত করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। সম্ভবত এ কর্মসূচি দলকে চাঙ্গা করার একটি কৌশল। বাংলাদেশে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নতুন নয়। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর তিন জোট ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। এদিন সচিবালয়ের সামনে নূর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করেছিল পুলিশ। বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের কর্মসূচি যদি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয় তাহলে কারোরই কোনো আপত্তি থাকবে না। এ কর্মসূচির ব্যাপারে সরকার অথবা ক্ষমতাসীন মহাজোটের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি করা হয়নি। কিন্তু সাম্প্র্রতিক যে অভিজ্ঞতা সেটি হচ্ছে_ এ ধরনের সমাবেশকে ঘিরে নাশকতা এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার আশঙ্কা রয়েছে এবং সেটাই জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এমন আশঙ্কা এ কারণেই সামনে চলে আসে যে, গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জামায়াতে ইসলামী যেভাবে মিছিলের নামে পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছে, বোমা-গ্রেনেড ব্যবহার করেছে, এসব অপতৎপরতার জন্যই সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। আমার মনে হয়, ওই দিন জামায়াতে ইসলামীর মূল উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া এবং সেটা করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবেই। ঠিক একইভাবে ১৮ ডিসেম্বর বিকেলে ছিল বিএনপির কর্মসূচি। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম, তারা (বিএনপি) ফজরের নামাজের পরপরই ঢাকা নগরীতে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিন সকালে বিএনপির পূর্বনির্ধারিত কোনো কর্মসূচি ছিল না। বিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। কিন্তু ফজরের নামাজের সময় বিএনপি কর্মীরা ঢাকার রাস্তায় পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায় এবং বোমা ফাটিয়ে তাণ্ডব সৃষ্টি করে। এ সময় একজনের মৃত্যু ঘটে। একই সময় চট্টগ্রাম ও সিলেটে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। আকস্মিক হিংসাত্মক এসব তৎপরতার কারণে স্বাভাবিকভাবে শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে এ সন্দেহের সৃষ্টি করে যে, বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধভাবে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, যাতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ব্যাহত হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তার সাম্প্রতিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে মিসরের তাহরির স্কয়ারের কথা বলছেন। আমরা সবাই জানি, হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে মিসরের জনগণ তাহরির স্কয়ারে দিনের পর দিন অবস্থান নেয় এবং শেষ পর্যন্ত মিসরের সামরিক বাহিনী সেখানে হস্তক্ষেপ করে। যদিও সেখানে এখন নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু তারপরও মিসরের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, উদারনৈতিক রাজনৈতিক ভাবনা, অসাম্প্রদায়িকতা এখনও বিপদের মুখে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যদি সেই তাহরির স্কয়ারের উদাহরণ ঢাকায় সৃষ্টি করতে চান তবে তার পরিণতিও শুভকর হবে না। ইতিমধ্যে বিএনপি কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে, তারা কমপক্ষে ৪ দিন ঢাকায় অবস্থান করবেন। এ সময়ের মধ্যেই বিএনপি সরকারকে অচল করে দেবে। দেশবাসী শুনেছে খালেদা জিয়া জনসভায় তার বক্তৃতায় বলেছেন, সরকারকে 'ল্যাংড়া লুলা' করে দেবে। এসব হিংস্র উচ্চারণ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে যেমন আতঙ্কের সৃষ্টি করে তেমনি সরকারের তরফ থেকেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তারপরও এটাই বলতে হয় যে, সরকার এখন পর্যন্ত ওই সমাবেশ অনুষ্ঠানে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। কেবল নিরাপত্তামূলক কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে এবং একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক রেখেছে। এটা খুবই স্বাভাবিক এবং সঙ্গত। কোনো নির্বাচিত সরকার অথবা কোনো রাজনৈতিক দল তাদের বিরুদ্ধে করা পরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র সহজভাবে নিতে পারে না। সুতরাং জামায়াত-বিএনপির কোনো ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে যদি ক্ষমতাসীন দলের তরফ থেকে তাদের রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি বজায় রাখা হয় তাতে দোষের কিছু নেই বলে মনে করি। যদিও বিরোধী দল বারবার তাদের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার যে অভিযোগ তুলছে শনিবার পর্যন্ত সরকারি অথবা মহাজোটের রাজনৈতিক পদক্ষেপে ওইসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না।
একটা কথা স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশে বর্তমানে গণতন্ত্র, সংবিধান এবং সাবিধানিক প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে ঐতিহ্য স্থাপন করেছি তাকে যে কোনো মূল্যে হোক রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ঐতিহ্য অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাওয়া। কোনো নেতা অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার লিপ্সা, তাকে ধ্বংস করবে এটা জনগণ মেনে নেবে না। তারপরও আমি আশা করব, আজ ১২ মার্চ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক অবস্থানকে পরিষ্কার করবে এবং সংসদে ফিরে এসে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন রূপরেখা কী হবে তা নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরবে। আলোচনার মধ্য দিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রশ্নের একটি ঐকমত্যে উপনীত হয়ে দেশে নির্বাচন, গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করতে হবে।

রাশেদ খান মেনন :রাজনীতিক, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান

No comments

Powered by Blogger.