বস্ত্রশিল্প-ফিলিপ কটলারের স্বপ্ন সত্য করতে হবে by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

কয়েক দিন আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো ‘বিশ্ব বিপণন সম্মেলন’। বিশ্বের নানা দেশের স্বনামখ্যাত বিপণন বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত হয়েছিলেন। সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন আধুনিক বিপণনের জনক অধ্যাপক ফিলিপ কটলার। কটলার তাঁর ‘মার্কেটিং ফর শেয়ার অব শৌল’ শীর্ষক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, এখানকার তৈরি পোশাকই হতে পারে বাংলাদেশের


ব্রান্ড। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে উনবিংশ শতাব্দী ছিল যুক্তরাজ্যের, বিংশ শতাব্দী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আর একবিংশ শতাব্দী হবে এশিয়ার। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের গুরুত্ব সেই প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি বলে সম্মেলনে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্ব সংস্থার সদস্য এবং তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন দ্রব্যের (অন্যান্যের মধ্যে ওভেন গার্মেন্টস, নিট ওয়্যার প্রডাক্ট, তৈরি টাওয়েল ইত্যাদি) রপ্তানি করে উন্নত দেশ কর্তৃক প্রদত্ত সর্বাধিক সুবিধাদানের নীতি দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘জেনারেলাইজড সিস্টেম অব রেফারেন্স’-এর একটি অংশীদার এবং বস্ত্রশিল্প ও পোশাকবিষয়ক উরুগুয়ে সম্মেলন চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী বাংলাদেশ। অধিকন্তু বস্ত্রশিল্প ও পোশাকশিল্পের বাণিজ্য বিষয়ে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মাল্টিফাইবার চুক্তি সম্পাদন করেছিল। যদিও ১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে কোটাসুবিধা ভোগ করছে।
ইউরোপীয় ওই বিপণন বিশেষজ্ঞের কথায় অবশ্যই আমাদের আশান্বিত হওয়ার কারণ রয়েছে। একালে তৈরি পোশাকশিল্পের বিশ্বে কদর বাড়লেও সেকালে এ দেশের অর্থাৎ প্রাচীন বঙ্গের বস্ত্রশিল্পের কিন্তু বিরাট ঐতিহ্য ছিল আন্তর্জাতিক মহলে। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে আরেক ইউরোপীয় পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি গ্রন্থে লিখেছেন, এ দেশ থেকে বস্ত্রের চালান যেত আরব, চীন, পারস্য, মিসর, ইতালি, গ্রিস প্রভৃতি দেশে। ওই বইয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এখানকার ‘গঙ্গাজল’ শাড়ি ছিল খুবই মশহুর। ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে সেবাস্টিন ম্যানরিক লিখেছেন, তিনি জানতে পেরেছিলেন এ দেশের সবচেয়ে মূল্যবান বস্ত্র ছিল মসলিন। আরেক ইউরোপীয় টেভারনিয়ার মন্তব্য করেছেন, ‘আমি অনেক সময় চমৎকৃত হয়ে দেখেছি এখানকার “মিহি আর মোটা” এবং “সাদা আর রঙিন” বিপুল বস্ত্রসম্ভার ওলন্দাজ বণিকেরা কেবল জাপান ও ইউরোপে পাঠাত।’
আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরাও আমাদের বস্ত্রশিল্পের গুণকীর্তন কম করেননি। দক্ষিণবঙ্গের মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত মনসামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন:
মোর দেশে এক জাতি, জনকত আছে তাঁতী
বুনিতে অনেক দিন লাগে,
কেবল ধীরের কাম, বস্ত্র বড় অনুপাম
প্রাণশক্তি টানিলে না ভাঙ্গে।
কিন্তু বাংলার বস্ত্রজগতে বিপর্যয় আসে আঠারো শতকে যখন ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব ঘটে। এ দেশ থেকে বস্ত্র রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, যান্ত্রিক উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদিত এখানকার পণ্যসামগ্রী পেরে ওঠেনি। শুধু ইংল্যান্ডই নয়, সারা বিশ্বেই বাংলার বস্ত্রশিল্প বাজার হারায়।
আশার কথা, তৈরি পোশাকের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে বস্ত্রশিল্পের হারানো গৌরব ফিরে পায়। বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্পের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ১৯৮০ সাল থেকে এই শিল্প খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০২ সালে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য বস্ত্রসামগ্রী রপ্তানি করে বাংলাদেশ পাঁচ মিলিয়ন ডলার অর্জন করেছিল। ১০ বছর ধরে কোটা পদ্ধতির কারণে রপ্তানির অনুপাত আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান যখন উপলব্ধি করেছিল যে, গার্মেন্টস-জাতীয় পণ্য উৎপাদন করে অল্প সময়ের মধ্যে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করা সম্ভব। বাংলাদেশও সেই উদ্যোগে শরিক হয়। বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ খাত এই তৈরি পোশাকশিল্প। ৩০ লাখ শ্রমিক এই শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, যার শতকরা ৯০ ভাগই হলো নারীশ্রমিক।
পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি পোশাকশিল্পের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এখনো এ দেশে শ্রমিকদের মজুরির হার অনেক কম। মাসে ৪০ থেকে ৭০ ডলারেই শ্রমিক মিলছে। যেখানে হংকং, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ানে শ্রমিকের মজুরির হার অনেক বেশি। ওই সব দেশে শ্রমের হার ক্রমবর্ধমান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প খাত আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকে সরকারের পক্ষ থেকে উৎসাহিত করতে হবে। সেই সঙ্গে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাতে হবে, যাতে করে আরও বেশি বেশি তৈরি পোশাক পণ্য এ দেশ থেকে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হয়।
আমরা চাই বস্ত্র খাতে সমৃদ্ধি অর্জন করে ফিলিপ কটলারের আশাবাদ বাস্তবে রূপলাভ করুক।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক ও অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.