শ্রদ্ধাঞ্জলি-তাঁকে মনে পড়ে by জাহীদ রেজা নূর

সুঠাম দেহের মানুষটিকে মনে পড়ে। সাদামাটা পাজামা আর ঢোলা পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষটি হাতে একগাদা কাগজপত্র নিয়ে ঢুকছেন ১৯ নম্বর নিউ ইস্কাটনের বাড়িতে, সেই দৃশ্যটি ভুলতে পারি না। তাঁর ভরাট কণ্ঠস্বরকে ভয় পেতাম আমরা। বিশেষ করে সেই বয়সে, যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছি।


পড়ছি মানে মাঝেমধ্যে ক্লাসে যাচ্ছি, বেশির ভাগ দিনই ‘আজ বৃষ্টি হবে’—এই ভবিষ্যদ্বাণী করে স্কুলের সময় পার হয়ে যাওয়ার পর দিব্যি খেলার মাঠে চলে যাওয়াটা অভ্যাসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই আমাকে স্কুলমুখী করা প্রায় অসম্ভবই ছিল।
কিন্তু তিনি, মানে বড় মামা শামসুদ্দীন মোল্লা, যদি কোনো কারণে এমপি হোস্টেলে না থেকে আমাদের বাড়িতে থাকতেন রাতটা, তাহলে বুঝতাম, ভোরেই তার জলদগম্ভীর কণ্ঠ শোনা যাবে, অগত্যা স্কুলযাত্রা ললাটলিখন।
বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হলো, তখন চেনা ঢাকা শহরটি অচেনা হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের পর এ রকম থমথমে অবস্থা আর দেখিনি আমরা। বিমর্ষ শামসুদ্দীন মোল্লাকে তখন চেনা যেত না। তখন ওই ১৯ নম্বর নিউ ইস্কাটনেই (যে বাড়িটি বঙ্গবন্ধু আমাদের থাকার জন্য দিয়েছিলেন, এরশাদ সরকার এসে সেই বাড়ি থেকে আমাদের পরিবারকে উচ্ছেদ করেছিল) যশোর থেকে নির্বাচিত সাংসদ রওশন আলী, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আনোয়ার চৌধুরী, সাজেদা চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগের ৫০-৬০ জন সাংসদ আসতেন। ভাবতেন, এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়। খন্দকার মোশতাক একটি বৈঠক ডেকেছিলেন, সে বৈঠকে তাঁরা যাবেন না বলেই ঠিক করেছিলেন। বৈঠকের দিন দেখা গেল, সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে অনেকেই যোগ দিলেন। শামসুদ্দীন মোল্লা, রওশন আলী, আনোয়ার চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন নেতা সে বৈঠকে না যাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকেন। এতে তাঁদের জীবনের ওপর ঝুঁকি নেমে এসেছিল।
এরপর ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর ‘সংগ্রামী ছাত্র সমাজ’ আহূত ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবস’ পালন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় যে জমায়েত হয়, সেটি মৌন মিছিল হয়ে মিরপুর সড়ক দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যায়। সে মিছিলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, পুষ্পস্তবক ছিল, যা ৩২ নম্বরের বাড়ির গেটে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সে মিছিলে ছিলেন শামসুদ্দীন মোল্লা। ছিলেন মহীউদ্দীন আহমদ, রাশেদ মোশাররফ, মতিয়া চৌধুরী, সাইফউদ্দিন মানিক, মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ। পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন তাঁকে থাকতে হয়েছে আত্মগোপনে।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে কেন এত বিচলিত হয়ে উঠলেন শামসুদ্দীন মোল্লা? কেন তিনি ভেসে গেলেন না গড্ডলিকা প্রবাহে? আসলে, সে সময় হয়তো শামসুদ্দীন মোল্লার মনে ভেসে উঠত পুরোনো দিনের কথা। ইসলামিয়া কলেজে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী। সহপাঠীদের মধ্যে আরও ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন, আসফউদ্দৌলা রেজা, কাজী গোলাম মাহবুব, খন্দকার মোহাম্মাদ ইলিয়াস প্রমুখ। তাঁরা সবাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ।
বর্ণাঢ্য জীবন ছিল শামসুদ্দীন মোল্লার। আমরা তাঁর কাছ থেকে পেতাম নির্ভরতা। এ কথা বলা অতিরঞ্জিত হবে না যে, বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় তিনি রেখেছিলেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি অনেক বিষয়েই তাঁর মতামত জানিয়েছেন। নিজে আইনজীবী ছিলেন বলে সংসদে দাঁড়িয়ে নেতার প্রশস্তির চেয়ে কাজের কথা বলতেন বেশি।
আজ শামসুদ্দীন মোল্লার মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯১ সালের এই দিনে তিনি মারা যান। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন নিয়ে অনেক কিছুই লেখা যায়। তবে তাঁরই লেখা অসমাপ্ত ডায়েরির পাতা থেকে কয়েকটি চরণ লিখে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। শামসুদ্দীন মোল্লা লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী।...এমন অনেক ঘটনা আছে যা আমি এবং তিনি জানতেন এবং তার একমাত্র সাক্ষী আমিই। ১৯৩৯ সনে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনের ছাত্র এবং আমি ভাঙ্গা স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। উক্ত সনে ভাঙ্গা স্কুলের পণ্ডিতমশাই সাধারণ জ্ঞানের বই জেনে রাখা ভালো পড়াতে পড়াতে এক স্থানে শেরেবাংলা ফজলুল হকের জন্য বরিশালের চাখার গ্রাম প্রসিদ্ধ লেখা ছিল। পণ্ডিতমশাই ক্রুদ্ধ হয়ে ঘৃণাভরে বইখানি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, তখন এ কে ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী। ইহাতে আমরা মুষ্টিমেয় মুসলিম ছাত্র ক্ষুব্ধ হলাম এবং আমাদের হেড মৌলবী আবদুল হামিদ সাহেবের নিকট বললাম। ইহা নিয়া ভাঙ্গা স্কুলে ছাত্র ও অভিভাবকদের মধ্যে বিশেষ উত্তেজনা সৃষ্টি হলো এবং সরকারি মহল ইহার সত্যতা যাচাই করে ভাঙ্গা স্কুলের এইড বন্ধ করে দিলেন। এই অবস্থা যখন চলছিল তখন আমি শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ বরে তাকে ভাঙ্গা আসার আমন্ত্রণ জানালাম এবং ছাত্রদের একটা সভা আহ্বান করলাম। তিনি যথারীতি ভাঙ্গা গমন করে নোমানী হলে একটা ছাত্রসভায় বক্তব্য রাখলেন এবং মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আহ্বান জানালেন। কিশোর বয়স থেকেই শেখ সাহেব ছিলেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। অন্যায়কে রুখতে ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অসম সাহসিকতা ও আন্তরিকতায় বন্ধুমহলে তিনি ছিলেন এক কিংবদন্তি পুরুষ।’
নিজে বড় ছিলেন বলেই বন্ধুর বড়ত্বকে তিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্বীকার করে নিতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রতি রইল অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।
জাহীদ রেজা নূর

No comments

Powered by Blogger.