১২ মার্চ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ-দুই দলেরই মাঠে থাকার প্রস্তুতি

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আড়ালে অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হলেও রাজপথের কর্মসূচি নিয়ে অস্থিরতা বাড়ছে। বিএনপির ১২ মার্চের কর্মসূচির দিনে আওয়ামী লীগের রাজপথে থাকার পরিকল্পনায় রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।


দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, ১২ মার্চ ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ সফল করার প্রস্তুতি চলছে। আর আওয়ামী লীগ ওই দিন পাড়া-মহল্লায়, ওয়ার্ডে অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। কর্মসূচি সফল করতে ওয়ার্ড ও থানার নেতাদের প্রস্তুতি নেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দাবি আদায় না হলে কর্মসূচি: নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে চায় বিএনপি। তবে দাবি আদায় না হলে রাজপথ দখলে রাখতে পর্যায়ক্রমে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
বিএনপির নেতারা বলেছেন, শিগগিরই হয়তো সরকারের পক্ষে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে না। তবে আগামী নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনেই হবে—প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এমন ঘোষণা চায় বিএনপি।
ওই নেতারা জানান, এ রকম ঘোষণা না এলে এবং ১২ মার্চের মহাসমাবেশে বাধা দিলে ওই দিনই রাজপথে অবস্থান নেওয়া হতে পারে। তবে ১২ মার্চের পর জেলা, বিভাগ ও ঢাকা মহানগরে অবস্থান কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। সর্বশেষ তিনটি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে হরতালের মতো কর্মসূচি যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছে। সরকার একক ইচ্ছায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে। বিএনপি প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করেছে। এ নিয়ে জনমত সৃষ্টির জন্য নানা কর্মসূচি পালন করেছে। এখন বেশির ভাগ দলই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনোভাবও তাই। এ জন্য দাবি আদায়ে দলটিকে কঠোর হতেই হবে। তবে মানুষের জীবনহানি ও সম্পদ ধ্বংসের মতো কর্মসূচিতে যাবে না বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ঢাকায় গণমিছিলে সরকার বাধা দিলে হরতাল দেওয়ার জন্য চাপ ছিল। কিন্তু তা না করে বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। এবার বাধা দিলে সাধারণ মানুষের পুরো সহানুভূতি বিএনপি পাবে। একে পুঁজি করেই আগামী দিনের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের জনসভায় ১২ মার্চের ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে বাধা না দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, বিএনপিকে কঠোর হতে বাধ্য করবেন না।
কর্মসূচি সফল করতে বিএনপি ব্যাপক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও শুরু করেছে। কোন্দলের কারণে কমিটি করা হয়নি এমন জেলায় নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পাবনা ও বগুড়ায় জেলা কমিটি গঠিত হয়েছে। দেশব্যাপী দলের সাংগঠনিক জেলা ও থানায় কর্মিসভা করা হচ্ছে। ৪৫টি কমিটি গঠনের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মীদের ঢাকায় আনার কাজ শুরু হয়েছে। এই কমিটিগুলো দলের তৃণমূলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড তদারকি করছে।
ঢাকা মহানগর কমিটির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা বলেন, এই মহাসমাবেশ হবে সর্বকালের বৃহৎ কর্মসূচি। এখানে জনগণ সরকারকে ‘না’ করে দেবে।
রাজপথ ছাড়বে না আওয়ামী লীগ: দলীয় নেতারা জানান, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর ব্যাপারে দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে। কিন্তু তাই বলে রাজপথ ছাড়া হবে না। নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকতে দলীয় প্রস্তুতি চলছে। এসব কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার কোনো আশঙ্কা করেন না তাঁরা।
নেতারা জানান, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও ১২ মার্চ পাড়ায়-মহল্লায় অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত আছে আওয়ামী লীগের। তার আগে ৭ মার্চ রাজধানীতে গণমিছিলে বড় রকমের সমাবেশ ঘটানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ১২ মার্চের আগে বিরোধী দলকে শক্তি দেখানোর জন্যই গণমিছিল কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। সাধারণত ওই দিন আওয়ামী লীগ আলোচনা সভা করে থাকে।
মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা ৯, ১০ ও ১১ মার্চ পরপর তিন দিন ঢাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে চান। দলীয় উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছেন তাঁরা। তবে ১২ মার্চ বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চান না দলের নীতিনির্ধারকেরা। বিরোধী দল ভাঙচুর ও জ্বালাও-পোড়াও করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই ওই দিন তাঁরা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অবস্থান নিতে চান।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরোধী দলের ১২ মার্চের কর্মসূচি নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। বিরোধী দল তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে। আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করব। এতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
সূত্র জানায়, বিরোধী দল রাজপথে সক্রিয় হওয়ায় দলীয় নেতা-কর্মীদের চাঙা করার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়। গতকাল রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হুইপ মির্জা আজম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, বৈঠকে সহযোগী সংগঠনের নেতাদের রাজপথে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি পর্যায়ক্রমে সব সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এদিকে গতকাল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ বর্ধিত সভা করেছে। সভায় ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি ও ২২ ফেব্রুয়ারির আলোচনা সভা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ৭ মার্চের গণমিছিল কর্মসূচি নিয়ে কথা হয়। সূত্র জানায়, মহানগর নেতারা কয়েক দিনের মধ্যে আবারও বর্ধিত সভা করবেন বলে জানা গেছে।

No comments

Powered by Blogger.