জাতির উদ্দেশে ভাষণে বিরোধী দলের প্রতি প্রধানমন্ত্রী-সংঘাতের পথ পরিহার করুন আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংঘাতের রাজনীতির পথ পরিহার করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা আনতে পারে, সে জাতির উন্নয়ন কেউ রুখতে পারবে না। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমাদের বিজয় হবেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিরোধীদলীয় নেতা জ্বালাও-পোড়াও,


হরতাল ও মানুষ হত্যার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি বলেন, যত বাধাই আসুক, বাংলার মাটিতে এদের বিচার হবেই। অনেক চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুু হত্যাকারীদের বিচার কেউ বন্ধ করতে পারেনি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের তিন বছর পূর্তির প্রাক্কালে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় মহাজোট সরকারের তিন বছরের সাফল্যের বিবরণ তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসীর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার নিরলসভাবে
চেষ্টা করছে। সর্বক্ষেত্রে শতভাগ সফলতার দাবি আমরা করব না। এ কথা বলতে পারি, জনগণের সরকার অর্পিত দায়িত্ব পালনে কখনোই গাফিলতি করেনি; ভবিষ্যতেও করবে না।
বিরোধী দলের অব্যাহত সংসদ বর্জনের কথা ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা মাত্র ছয় দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। সংসদ নেতা প্রশ্ন তোলেন, বাধাহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তব্য দেওয়ার পরও কেন সংসদ বর্জন? প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশ পরিচালনায় তিন বছর বিরোধী দল কোনো সহযোগিতা করেনি। বরং সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা অনেক সময় দেশ ও জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির আলোচনার উদ্যোগকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির দেশের বদনাম এবং নেতিবাচক পরিচয় ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ মানবাধিকার রক্ষাকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। এ দেশ এখন একটি অগ্রসরমান, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্র্রদায়িক দেশ হিসেবে পরিচিত।
প্রধানমন্ত্রীর এ ভাষণ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার একযোগে সম্প্রচার করে। দেশের বেসরকারি রেডিও-টেলিভিশন ভাষণটি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের সৌজন্যে সম্প্রচার করে। ৪২ মিনিটের ভাষণে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়ে বিজয়ী করায় ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এক অন্ধকারময় সময়ে দায়িত্ব নিয়ে সরকার আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছিল। সাহস, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ_ দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার। দেশের মানুষ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোটাররাও এ বিচারের পক্ষে গণরায় দিয়েছে। সরকার যখন মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার কাজ শুরু করেছে, তখনই বিরোধীদলীয় নেতা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করছেন। জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল ও মানুষ হত্যার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছেন। তার (বিরোধীদলীয় নেতা) প্রতি অনুরোধ, জ্বালাও-পোড়াও করে এ মানবতাবিরোধী রাজাকার-আলবদরদের রক্ষার চেষ্টা করবেন না।
শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার চলি্লশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বিজয়ের সাড়ে তিন বছরের মাথায় আমরা হারিয়েছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। এরপর ২১ বছর চলেছে স্বৈরশাসন। জনসেবা নয়, দুর্নীতিই ছিল ক্ষমতাসীনদের একমাত্র নীতি। ১৯৯৬ সালে দেশে আবার ফিরে আসে শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সুবাতাস। ২০০১ সালে দেশ আবারও চলে যায় এক অন্ধকার সময়ে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা, দমনপীড়ন, নির্যাতন, জঙ্গিবাদের উত্থান, বোমা-গ্রেনেড হামলা আর লাগামহীন দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে তার মর্যাদা হারায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আমরা আবার ফিরিয়ে এনেছি শান্তি, উন্নয়ন আর প্রগতির ধারায়। দারিদ্র্য বিমোচন, পল্লী উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে একটি অনুকরণীয় মডেল, যা জাতিসংঘের মহাসচিবসহ বিশ্বনেতারা স্বীকারও করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের আমলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সার-গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসন, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-শিল্প-পরিবেশ-ক্রীড়া-মৎস্য উন্নয়ন; জনগণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা, চাকরির বয়সসীমা ও গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সড়ক-রেল-বিমান ও তথ্য যোগাযোগ উন্নয়ন, যানজট নিরসন এবং নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিসহ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, রফতানি এবং জনশক্তি রফতানি বেড়েছে। গত অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এ বছর ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে।
বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সেতু প্রকল্পের মূল সেতু, নদীশাসন, সেতুর উভয় প্রান্তের সংযোগ সড়ক এবং বিস্তারিত নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ অবস্থানে প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদগুলোয় প্রশাসক নিয়োগের উল্লেখ করে শিগগিরই জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণের জানমালের হেফাজত করা। দেশে এখন বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট আমলের মতো একই সময়ে ৫০০ স্থানে বোমা হামলা, বিরোধী দলের এমপিদের নিহত হওয়া এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো পৈশাচিক ঘটনার সৃষ্টি হয় না। তিনি ভাষণে উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি গঠিত হয়েছে। 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়'_ এই পররাষ্ট্রনীতির আলোকে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও জোরদার হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদকে আমরা দেশ পরিচালনার মূল কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেছি। নবম জাতীয় সংসদে ১৫৩টি আইন পাস হয়েছে। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সব সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সভাপতি হিসেবে সরকারি দলের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল থেকে দু'জন ও মহাজোটের শরিকসহ অন্য দলের পাঁচজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। 'সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন' চালু করা হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.