সমুদ্রে পৃথক সমাজ by মাহ্ফুজ রাহমান

রকারের শাসন ও প্রতাপে অতিষ্ঠ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা একটু নতুন স্থান খুঁজছেন। তারা একটি নতুন সমাজ গড়ে তুলবেন। কিছু স্বাধীনতাপন্থি জনগণ এ উদ্যোগ নিয়েছেন। এদের মধ্যে একজন পেপলের প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল। বিলিয়নিয়ার পিটার থিয়েল দাতা হিসেবে প্রশংসিত এবং পরিচিত। তিনি তৈরি করছেন ভাসমান শহর। মূল উদ্দেশ্য, বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলো থেকে মুক্ত থেকে সঠিক পথনির্দেশ করা।


তবে এটি হবে সমুদ্রে ভাসমান স্থায়ী শহর। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এ শহর। থিয়েলের আশা, ২০১৫ সালের মধ্যেই এ ধরনের প্রথম শহর তৈরি হবে। সেখানে অন্তত ৫০ জন স্থায়ী বাসিন্দা থাকার ব্যবস্থা রাখা হবে।
এটি নির্মাণে কাজ করছে সি-স্টিডিং ইনস্টিটিউট। ২০০৮ সালে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর খরচের বেশির ভাগ বহন করেন পিটার। তাদের বক্তব্য, বিশ্বের এবং মানবতার ভালোর জন্য এটা নতুন দিক সূচনা করবে।
পিটার এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে শুধু সমমনা মানুষজনের স্থান হবে। কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার মালিকানা কোনো দেশের সরকার দাবি করেন না। কিন্তু এসব স্বাধীনতাপন্থি এমন কোনো জায়গায় যেতে চান না যার মালিকানা কোনো সরকার দাবি করতে পারবে। এ কারণে তারা সমুদ্রপৃষ্ঠে একটি আলাদা সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখছেন, যা সি- স্টেটস নামে পরিচিত।
অনেকে এ ধারণাকে পাগলামি বলতে পারেন। তবে এটা কোনো পাগলামি নয়। ইতিমধ্যে বড় বড় জাহাজে বিলাসবহুল আবাসন ব্যবস্থা সম্ভব হয়েছে। বিশাল বিশাল জাহাজে বিলাসবহুল আবাসন ব্যবস্থায় সমুদ্রে দিনের পর দিন ভ্রমণ করছে মানুষ। বিরূপ আবহাওয়া ও উত্তাল ঝড়ের মধ্যে সমুদ্রতীর থেকে দূরবর্তী স্থানে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এগুলো হচ্ছে উদাহরণ। তবে এসব স্বাধীনতাকামীর ইচ্ছা হচ্ছে একটি স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থায় নিজেদের ইচ্ছামতো স্বাধীন-সার্বভৌম সমুদ্রের ওপর সমাজ গড়া। তবে তাদের এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে তাদের বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি ও আইনগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। সবার প্রথমে যে সমস্যাটির মুখোমুখি হতে হবে তা হলো_ কীভাবে সমুদ্রের ওপর স্থাপনাটি নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া কীভাবে তারা একটি সার্বভৌম সমাজ গড়ে তুলবেন, এর আইনগত দিকও ভাবতে হবে। ওই স্থাপনায় বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই বা থাকবে কীভাবে। পিটার থিয়েলসহ অন্য ব্যক্তিদের অর্থায়নে ইতিমধ্যেই সি-স্টিডিং ইনস্টিটিউট (টিএসআই) নামের একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক টিম গঠন করা হয়েছে, যারা সমুদ্রভিত্তিক এ স্থাপনাটি তৈরির বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করছে। এ ছাড়া স্থাপনায় বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গবেষণা করছে টিএসআই।
এই স্থাপনাটি নির্মাণে তিনটি নকশার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে বিলাসবহুল জাহাজের আকৃতিতে তৈরি হবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রমোদতরীর মতো ভাসমান খেয়া নৌকা এবং আরেকটি হচ্ছে সাগরে পিলার ও কলামের সাহায্যে ভাসমান স্থাপনা, অনেকটা তেল শোধনাগারের মতো। এর মধ্যে প্রথম নকশাটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে ভাসমান থাকবে। তবে এক্ষেত্রে অ্যাপার্টমেন্ট এবং বিভিন্ন অফিস থাকায় এটি নির্মাণে খরচ অনেক বেশি পড়বে। অন্যদিকে খেয়া নৌকার মতো প্রমোদতরী নকশাটি অন্য দুটি নকশার চেয়ে উত্তাল সমুদ্রে বেশ অনিরাপদ বলেই মনে করা হচ্ছে। তৃতীয় নকশাটি বাস্তবায়ন করতে খরচ পড়বে আরও বেশি। তবে এটি অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ও নিরাপদ।
জাহাজ নির্মাণকারী মিৎসুবিশি ইতিমধ্যেই এ স্থাপনার জন্য বেশ কয়েকটি নকশা পরিকল্পনা পেশ করেছে। তাদের নকশার মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের শক্তিশালী খেয়া নৌকা আকৃতির স্থাপনা, যা অট্টালিকার মতো হবে।
জর্জ পেটরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েব ইনস্টিটিউটের আরেকজন নেভি আর্কিটেকচার, যিনি টিএসআইর গবেষণায় কাজ করছেন। তিনি হিসাব করেছেন হাওয়াই জলসীমার ওপর এটা করলেই বেশি ফলপ্রসূ হবে। তিনি জানান, তেল কোম্পানিগুলো যেভাবে ড্রিল করে গভীর সমুদ্রে কলাম স্থাপন করছে, এ প্রক্রিয়ার কথাও চিন্তা করা যেতে পারে; তবে তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে। এ ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করার অভিজ্ঞতা জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই। তবে এ পদ্ধতি স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হতো। তিনি বলেন, তেল কোম্পানিগুলোর অনুকরণে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হলে এখানকার অধিবাসীরা এখানে ব্যবসা করতে এবং ইচ্ছেমতো ঘুরতেও পারত_ এটাই হতো সবচেয়ে বেশি আরমদায়ক ব্যবস্থা।
প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়া এবং সমমনা লোকদের নিয়ে একটি শান্তিকামী এবং স্বনিয়ন্ত্রিত সরকার গড়া কি সম্ভব? যেখানে জাহাজটি কোনো দেশের সমুদ্রসীমা হতে ১২ নটিক্যাল মাইলের বেশি কাছে আসতে পারবে না। এ ছাড়া ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠে বসবাস করা কি সম্ভব? এ ছাড়া আইন অনুযায়ী প্রতিটি দেশের সমুদ্রসীমার ২৪ নটিক্যাল মাইলের গভীরে যে কোনো প্রকার শক্তি প্রদর্শন করে এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল কোনো দেশের অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়। বিশেষত কিছু রাষ্ট্র (যেমন যুক্তরাষ্ট্র) তাদের নাগরিকদের ওপর কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে_ এ রকম আশঙ্কা থাকলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের যে কোনো ব্যক্তিকে বিচারের অধিকার রাখে বলে মনে করে। যদি আমেরিকা সমুদ্রের ওপর এ রকম কোনো রাষ্ট্রের সমর্থন না করে, তবে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে এটাকে স্বীকৃতি দেওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এ রকম উদাহরণও আছে। ১৯৬০ সালে ব্রিটেনে তাদের পাইরেট রেডিও জাহাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল ব্রিটিশ পাচারকারীদের চাপে, যারা দস্যুদের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে লিপ্ত ছিল। সমস্যা রয়েছে আরও। সমুদ্রে রাষ্ট্র নির্মাণকারীদের সিদ্ধান্ত_ তাদের রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো প্রকার মাদক, পর্নোগ্রাফি, অর্থ পাচার করা যাবে না। কিন্তু ওই জাহাজে অবস্থানকারী কোনো নাগরিক যদি আমেরিকান হয়, তবে আমেরিকার আইনমতে বিদেশি রাষ্ট্রে বসবাসকারীদের রাষ্ট্রের কাছে কর দিতে বাধ্য থাকবে। যে কারণে আমেরিকা তাদের কাছে কর দাবি করবে।
২০১০ সালে মেরিন প্রকৌশলীদের একটি দল একটি ক্লাবস্টিডির নকশা প্রণয়ন করেছিল। যেটি ছিল মূলত একটি ভাসমান রিসোর্ট। ৭০ স্টাফ এবং ২০০ অতিথি থাকতে পারবেন এমনভাবে এটিকে ক্যালিফোর্নিয়া সমুদ্র উপকূলের ১০০ নটিক্যাল মাইল গভীরে নির্মাণ করার কথা ভাবা হয়েছিল। এটি মূলত তেল উৎপাদনকারী প্লাটফর্মের মতো বানানোর পরিকল্পনা করা হয়। এ স্থাপনার ছাদে নিজস্ব সোলার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্তু এ ক্লাবস্টিডি ডিজেল শক্তির ওপর নির্ভর করার কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া এটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিশুদ্ধ পানি উৎপাদনে সক্ষম করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ বিষয়ে স্কটল্যান্ডের নৌবিদ্যা বিশেষজ্ঞ নিগেল বার্লট্রপ বলেন, এ ধরনের চিন্তা-ভাবনাকে কর্মে প্রতিফলিত করার বিষয়ে একটু সন্দেহ থাকে। বিশেষত এটিকে বিভিন্নভাবে উপযোগী করে তোলা দরকার। ধরা যাক কোনো সময় কোনো কাঁপুনির ফলে এর প্রতিটি মেটাল জয়েন্ট যদি কাঁপতে থাকে, তাহলে ১৯৮০ সালে আলেকজান্ডার আইল্যান্ডে যে ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছিল, একই ধরনের অবস্থা তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে দক্ষিণ সাগরে একটি তেলের ভাসমান ব্লকে এ ধরনের সমস্যায় এটি ভেঙে পড়েছিল, যার ফলে ওই স্থানে অবস্থারত ১২৩ কর্মী নিহত হন।
টিএসআইর একটি দল এ প্রজেক্টটি আরও স্বল্প ব্যয়ে বাস্তবায়ন করতে কাজ করছে, যাকে বলা হয় ব্লুশেড। এ কার্যক্রমের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া সমুদ্র উপকূল থেকে কিছু দূরে একটি ত্রুক্রজ লাইনার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। যাতে এখানে এসে বিদেশি ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করতে পারেন। এটি করা হয়েছিল শুধু ভিসার ঝামেলা ছাড়াই যাতে প্রকৌশলীরা এখানে এসে কাজ করতে পারেন। এ বিষয়ে নৌবিশেষজ্ঞ দারিও মুতাবদিজা বলেন, এ ধরনের একটি ব্লুশেড তৈরি করতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ পড়বে। তবে এটা নির্ভর করবে এর আকৃতির ওপর। এতে মার্কিন সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটা একটি বড় সমস্যা। তবে তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, আমাদের একাকী ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা করা হবে আসলে কী হতে যাচ্ছে।
তবে অনেকেই বলছেন, সমুদ্রে এ ধরনের বসতি স্থাপনের চিন্তা-ভাবনা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। যদিও উদ্যোক্তাদের দাবি, কেউই এক সময় চিন্তা করতে পারেনি ইন্টারনেট আমাদের পৃথিবীকে এতটা ক্ষুদ্র করে আনবে। একটি ভার্চুয়াল পৃথিবী তৈরি করবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের তত্ত্ব বাস্তবায়িত হবে যেখানে সমুদ্রে ভাসমান স্থায়ী বসতি স্থাপন করবে মানুষ। এ বিষয়ে পিটার থিয়েল বলেন, পৃথিবীতে এমন একদিন আসবে; যেদিন জলের ওপর বসতি স্থাপন করে পৃথিবীর মানুষকে আহ্বান জানাব, এসো এবং দেখ জলের ওপর পৃথিবী আসলে কতটা সুন্দর। হ

No comments

Powered by Blogger.