যে খেলায় বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা by রাহেনুর ইসলাম

মুদ্রের বালিতে ফুটবল খেলার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না বিপ্লব-এনামুলদের। তার পরও তাঁরা প্রথম দক্ষিণ এশীয় বিচ গেমসের ফুটবলে সোনা এনে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিত হলেও বিচ ফুটবল বা বিচ সকার এখন বিশ্বব্যাপী বেশ জনপ্রিয়।হয়তো তীরের কাছেই আছেন, তার পরও কখনো কখনো মাথার দুই ফুট ওপর দিয়ে যাবে সমুদ্রের ঢেউ। ভয়ংকর কিন্তু একই সঙ্গে অনিন্দ্য সুন্দরও। সমুদ্রের তুলনা আসলে সমুদ্রই। ছুটিতে সময় কাটাতে এর চেয়ে ভালো জায়গা খুব বেশি হয় না। হাজারো গল্প, কবিতা, উপন্যাস হয়েছে সমুদ্র নিয়ে। এখন হচ্ছে খেলাও।


বিচ রাগবি, বিচ ভলিবল, বিচ হ্যান্ডবল কিংবা বিচ ফুটবল_সমুদ্রতীরে খেলার তালিকাটা বড়ই হচ্ছে শুধু। সমুদ্রে স্নান কিংবা ঢেউয়ের গর্জন শোনার পাশাপাশি সমুদ্রতটে খেলার আনন্দটাও অন্য রকম। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বিচে খেলেছেন পেলে, রোনালদো, রোমারিওর মতো কিংবদন্তিরা। বিচে ফুটবল খেলেছেন আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তিরাও। তবে সেটা স্রেফ বিনোদনের জন্য। খেলাটা বিনোদন থেকে একটা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ পায় '৯০-এর দশকে। রিও ডি জেনিরো থেকে বিচ ফুটবল ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। মনের আনন্দে বিচে ফুটবল খেলা ফুটবলারদের দিকনির্দেশনা দিতে ১৯৯২-এ জন্ম বিচ সকার ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের। খেলাটার বিভিন্ন নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করে তারা '৯৫-এ রিও ডি জেনিরোর কোপা কাবানা বিচে আয়োজন করে বসে বিশ্বকাপেরই। সেই টুর্নামেন্টের ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রকে ৮-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জিকো-জুনিয়রদের ব্রাজিল।
যেভাবে খেলতে হয় বিচ সকার : তিন ভাগে হয় ম্যাচ, প্রত্যেক ভাগের ব্যাপ্তি ১২ মিনিট করে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ৩৬ মিনিটের ম্যাচ। বালুতে যেখানে জোরে হাঁটাই দায় সেখানে ফুটবল খেললে ১২ মিনিট পর বিশ্রাম পাওয়াটাই স্বাভাবিক। মাঠের আকারও ছোট। দৈর্ঘ্যে ৪০.৪ গজ আর প্রস্থে ৩০.৬ গজ। গোলরক্ষকসহ প্রতি দলে খেলোয়াড় থাকে পাঁচজন। বদলি হিসেবে নামানো যায় তিন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচজনকে। বুট বা কেডস পরে খেলতে পারবে না কেউই। তবে অ্যাংকেলেটে সমস্যা নেই। কিছু কিছু ব্যাপার বাদ দিলে খেলাটা ফুটবলের নিয়মেই হয়। এই 'কিছু'র অন্যতম ড্র বলে কোনো ব্যাপার নেই এ খেলায়। দুই দলের স্কোর সমান হলে অতিরিক্ত সময়ের খেলা হবে তিন মিনিট। তাতেও সমতা থাকলে টাইব্রেকারে নির্ধারিত হবে জয়-পরাজয়। কেউ হলুদ কার্ড দেখলে মাঠের বাইরে থাকতে হবে দুই মিনিট। সেই খেলোয়াড়ের বদলে এ সময় মাঠে নামতে পারবেন অন্য কেউ। দুই মিনিট পর আবারও মাঠে নামতে হলুদ কার্ড দেখা খেলোয়াড়। তবে কেউ লাল কার্ড দেখলে সেই ম্যাচে আর খেলার সুযোগ পাবেন না। লাল কার্ড দেখার পর সেই দলকে দুই মিনিট খেলতে হবে একজন কম নিয়ে। দুই মিনিট পর অবশ্য তারা পাঁচজন নিয়েই খেলার সুযোগ পাবে। বিশ্বকাপ : ১৯৯৫ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর কোপা কাবানা বিচে আট দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্বকাপ। সেই আসরে অংশ নিয়েছিল ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। ব্রাজিলের জিকো, জুনিয়র, রোমারিওরা খেলছিলেন বলে আগ্রহ ছিল বিশ্বব্যাপীই। ফাইনালে তাঁদের দল ৮-১ গোলে হারায় যুক্তরাষ্ট্রকে। ১৯৯৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত প্রতি বছরই কোপা কাবানায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকাপ। আর এই ছয়বারেরই চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ২০০১-এ বাহিয়া আর ২০০২-এ সাও পাওলোর পর ২০০৩ সালে আবারও রিও ডি জেনিরোতে ফেরে বিশ্বকাপ। ব্রাজিলিয়ান তারকাদের সঙ্গে ফ্রান্সের এরিক ক্যান্টোনা, স্পেনের মিশেল, হুলিও সালিনাসরা অংশ নেওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টটা। তাই ২০০৫ সালে ফিফাও একে স্বীকৃতি দেয়। এরপর টানা তিনটি আসর হয়েছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে। তবে বিশ্বকাপ বলে ফিফা সিদ্ধান্ত নেয় টুর্নামেন্টটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার। এ কারণে ২০০৮-এ ফ্রান্সে আর ২০০৯ সালে বিশ্বকাপ হয় আরব আমিরাতে। ২০০৯-এ সিদ্ধান্ত হয় প্রতি দুই বছর পর বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। সেই নিয়মে এ বছর বিশ্বকাপ হয়েছে ইতালিতে আর ২০১৩-তে হবে তাহিতিতে। প্রথম তিনটি আসর আট দলের হলেও ১৯৯৮-এ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১০ দল নিয়ে। এরপর বাড়তে বাড়তে ২০০৬ থেকে বিশ্বকাপ হচ্ছে ১৬ দল নিয়ে। ব্রাজিলের জয়জয়কার : ফুটবল বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। বিচ ফুটবলেও তাদেরই জয়জয়কার। ১৬টি আসরের মধ্যে ১৩ বারেরই চ্যাম্পিয়ন তারা। এ ছাড়া একবার করে শিরোপা জিতেছে পর্তুগাল, ফ্রান্স ও রাশিয়া। এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে রাশিয়া প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে ব্রাজিলকে হারিয়ে। সর্বোচ্চ চারবারের টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও ব্রাজিলের জুনিয়রের। ১৯৯৫-এ জিকোর সঙ্গে যৌথভাবে সেরা হওয়ার পর ১৯৯৭, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালের টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড় হন তিনি। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯২_এ সময়ে খেলা ৭০ ম্যাচ খেলা এই তারকা বিচ ফুটবল বিশ্বকাপের সেরা গোলদাতাও হয়েছেন ১৯৯৭ (১১), ১৯৯৮ (১৪), ১৯৯৯ (১০) ও ২০০০ সালের (১৪) আসরে। তবে জুনিয়রের চেয়েও একবার বেশি সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তি পর্তুগালের ভিক্তর সারাইভা মাদজের। তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন ২০০২ (৯), ২০০৪ (১২), ২০০৫ (১২), ২০০৬ (২১) ও ২০০৮-এ (১৩)। তবে এই পাঁচবারের মধ্যে কোনো আসরেই দলকে শিরোপা এনে দিতে পারেননি তিনি। এমনকি ২০০৬-এ এক আসরে সর্বোচ্চ ২১ গোল করলেও সেবার চতুর্থ হয়েছিল তাঁর দেশ পর্তুগাল!
বিচ সকারের অন্যান্য টুর্নামেন্ট : বিশ্বকাপ ছাড়া ১৯৯৪ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মুনদিয়ালিতো। এর আয়োজক বিচ সকার ওয়ার্ল্ড ওয়াইড। প্রতি বছরের এই আয়োজনে ১৬ বারের মধ্যে ১২ বারেরই চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এ ছাড়া পর্তুগাল ৩ আর যুক্তরাষ্ট্র চ্যাম্পিয়ন হয়েছে একবার। সর্বোচ্চ ৯ বার রানার্সআপ হয়েছে পর্তুগাল। স্পেন ২ আর একবার করে দ্বিতীয় সেরা হয়েছে ইতালি ও পেরু। কেবল ইউরোপ ছাড়া আর কোনো মহাদেশেই এখনো বিচ ফুটবলের মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট হয়নি। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বটাই এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিনদের বড় আয়োজন। ইউরোপে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুটি টুর্নামেন্ট বিচ সকার কাপ ও বিচ সকার লিগ। ১৯৯৮ থেকে শুরু হওয়া বিচ সকার কাপের ১২ শিরোপার মধ্যে সর্বোচ্চ ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পর্তুগাল। স্পেন তিন আর সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া ও ইউক্রেন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে একবার করে। ১৯৯৮ থেকে শুরু হওয়া বিচ সকার লিগের ১৪টি আসরের মধ্যে স্পেন পাঁচ, পর্তুগাল চার, রাশিয়া দুই আর একবার করে শিরোপা জিতেছে ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানি।
এশিয়ায় বিচ ফুটবল : ফিফা স্বীকৃতি দেওয়ার আগে থেকেই বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলত জাপান ও থাইল্যান্ড। ২০০৫ সালে ফিফা এই বিশ্বকাপে যোগ হওয়ার পর ২০০৬ থেকে নিয়মিতই হচ্ছে বাছাই পর্ব। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচটি বাছাই পর্বের মধ্যে জাপান (২০০৯, ২০১১) ও আরব আমিরাত (২০০৭, ২০০৮) দুবার করে আর একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাহরাইন (২০০৬)। এশিয়া থেকে প্রতিবারই বিশ্বকাপে সুযোগ পায় তিনটি দেশ। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশেই। তবে বিচ ফুটবলটা এই দেশের মানুষ ও ফুটবলারদের জন্য একেবারে নতুন একটা খেলা। কোনো অভিজ্ঞতা না নিয়েই কদিন আগে শেষ হওয়া প্রথম দক্ষিণ এশীয় বিচ গেমসের ফুটবলে অংশ নিয়েছিলেন বিপ্লব ভট্টাচার্য, এনামুল হকরা। তারাই আবার ফাইনালে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে শিরোপা এনে দিয়েছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের হয়ে চার ম্যাচে সর্বোচ্চ ৮ গোল করেছিলেন এনামুল হক। এই সাফল্যের পর খেলাটা নিয়ে নতুন করে ভাবতেই পারে বাফুফে। বিচের অন্যান্য খেলা : ফুটবল ছাড়াও বিচ রাগবি, বিচ ভলিবল, বিচ হ্যান্ডবল জনপ্রিয়তা পেয়েছে যথেষ্ট। এখন তো বিচে হচ্ছে ক্রিকেটও! বিচের খেলাগুলোর মধ্যে অলিম্পিকে জায়গা করে নিয়েছে ভলিবল। দুজন করে খেলোয়াড়ের অংশ নেওয়া বিচ ভলিবলে। ১৯৯৬ সালে খেলাটি অন্তর্ভুক্ত হয় অলিম্পিকে। ছেলেদের বিভাগে যুক্তরাষ্ট্র তিন আর ব্রাজিল সোনা জিতেছে একবার। আর মেয়েদের বিভাগে যুক্তরাষ্ট্র ২, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়া একবার করে পরেছে সেরার মুকুট। ২০০৪ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিচ হ্যান্ডবল বিশ্বকাপ। চার আসরের মধ্যে ব্রাজিল দুই আর একবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মিসর ও ক্রোয়েশিয়া।

No comments

Powered by Blogger.