সব ছাপিয়ে স্পিন আর ছয় নম্বর উইকেট by মাসুদ পারভেজ

ম্যাচ শেষ হওয়ার ১৮ ঘণ্টা পরও একটা ব্যাপার অবিশ্বাস্যই ঠেকছিল প্রধান নির্বাচক আকরাম খানের কাছে, 'একটা বলও ঘুরল না!' যে জন্য নিজেদের ভাগ্যাহতই মনে হচ্ছে ওয়ানডে স্কোয়াডের সদস্য শাহরিয়ার নাফীসের, 'আমাদের দুর্ভাগ্য যে উইকেটে গতকাল (পরশু) বল একদমই টার্ন করেনি।' আগের রাতে ম্যাচশেষে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের উইকেটকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর বিষয়টা তো ইতিমধ্যে সবারই জানা হয়ে গেছে। আর তাঁদের এ সম্মিলিত হাহাকারে এটাও খুব স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে বাংলাদেশের মূল শক্তি স্পিনারদের সাফল্যের জন্য আসলে অনুকূল উইকেট অত্যাবশ্যকীয়।


একটু বিরূপ হলেই গোলমাল এবং সেটাকে ভাগ্যের মার বলে ধরে নেওয়া!
যে মার খেয়ে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ধারহীন স্বাগতিক দলের স্পিনাররা। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের যে উইকেটে প্রথম ম্যাচটি হয়েছে, সেটি এখন পর্যন্ত যথেষ্ট রান-প্রসবা বলেই প্রতিষ্ঠিত। এ বছরেরই ১৩ এপ্রিল এখানে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩৬১ রানের পাহাড় তুলেছিল অস্ট্রেলিয়া। বৃহস্পতিবারের আগে পর্যন্ত ওটাই ছিল ছয় নম্বর উইকেটে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সে ম্যাচে বাংলাদেশ করেছিল ২৯৫ রান। হোম অব ক্রিকেটে ওটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে নামার আগে দলসংশ্লিষ্ট কেউ খুব সম্ভবত মুশফিকদের এ বিষয়ে ধারণা দেননি। না হলে দলীয় আলোচনায় অধিনায়ক কেন জানাবেন যে এ রকম হবে জানা থাকলে টস জিতে কিছুতেই আগে ফিল্ডিং নিতেন না। বরং ক্যারিবীয়দেরই রান তাড়া করার চ্যালেঞ্জে ফেলতেন।
উল্টো নিজেরাই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। স্পিনারদের কারোরই খুব বড় টার্ন করাতে পারেন বলে সুনাম নেই। এঁদের মধ্যে যিনি একটু বেশি টার্ন করাতে পারেন, সেই সাকিব আল হাসানও আইপিএল, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও কাউন্টিতে অত্যধিক টোয়েন্টি টোয়েন্টির চাপে কিছুটা ধার হারিয়েছেন বলে মনে করেন তাঁর এক 'মেন্টর'ও। তার ওপর পরশু যখন উইকেট থেকে সামান্য টার্নও আদায় করে নেওয়া গেল না, তখন তাদের স্বাচ্ছন্দ্যেই খেললেন ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা। অবশ্য এটাকে শুধু নিজ দলের স্পিনারদের অক্ষমতা বলে মানতে অবশ্য রাজি হলেন না নাফীস, 'টার্ন করানোর জন্য উইকেট অবশ্যই একটা বড় ফ্যাক্টর। যেকোনো দেশেরই যদি বড় স্পিনারদের খেয়াল করেন, উইকেট সাহায্য করলে কিন্তু ওদের ধারটা অনেক বেড়ে যায়।'
প্রথম ওয়ানডের উইকেট বাংলাদেশের স্পিনারদের ভোঁতা করে দেওয়ায় কিছুটা মনোক্ষুণ্নও মনে হলো তাঁকে, 'আমরা যে দেশেই খেলতে যাই, ওরা কিন্তু নিজেদের শক্তি অনুযায়ীই উইকেট তৈরি করে।' এবার তেমন না হওয়ার পেছনে একটা ব্যাখ্যাই পাওয়া যাচ্ছে। উইকেটে ঘাস ছেঁটে দেওয়া হয়েছিল ঠিকই তবে গোড়া রয়ে গিয়েছিল। সে জন্য উইকেট বেশ শক্ত ছিল আর ভাঙেওনি। দুয়ে মিলে বেশ ব্যাটিংবান্ধব হয়ে যায় উইকেট। সাজঘরে বসে ক্যারিবীয়দের ইনিংসজুড়ে এর কুফল দেখেছেন নাফীস, 'টার্ন করলেই খেলাটা হতো অন্য রকম। প্র্যাকটিস ম্যাচের পর টোয়েন্টি টোয়েন্টিতেও সেটা দেখা গেছে। টার্ন করায় ওরা ঠিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল না। অথচ গতকাল (পরশু) বল খুব সুন্দর ব্যাটে আসছিল। আমাদের স্পিনাররা উইকেট থেকে সুবিধা না পাওয়াতে ওরা কিন্তু আরামেই ব্যাটিং করেছে।'
এ আরামকে হারাম করার জন্য কিনা সেই উইকেটের আনুকূল্যের দিকেই চেয়ে থাকছেন এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান, 'উইকেটে যদি স্পিন থাকে এবং বল যদি টার্ন করে, তাহলে ওরা ভুগবে। প্র্যাকটিস ম্যাচেও কিন্তু ওরা স্পিনের বিপক্ষে ধুঁকেছে। আশা করছি পরের ম্যাচে উইকেট থেকে আমরা কিছুটা সুবিধা পাব।' সে আশায় থাকতে পারছেন এ জন্য যে আজ দ্বিতীয় ওয়ানডের জন্য তৈরি করা হয়েছে তিন নম্বর উইকেট, যে বাইশ গজে টোয়েন্টি টোয়েন্টি জিতে সিরিজ শুরু করেছিল বাংলাদেশ। নাফীস একরকম ঘোষণার সুরে বলেও দিলেন, 'উইকেটে যদি মিনিমাম টার্নও থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই ওদের বেশ সমস্যায় ফেলতে সক্ষম হব।' মিরপুরের অতীতও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে, 'মিরপুরে যত খেলা হয়েছে, যেকোনো দলকে কিন্তু বেশ ভোগানো গেছে। আর আমাদের স্পিনাররাও তো ওয়ার্ল্ড ক্লাস।'
বিশ্বমানের স্পিনার হতে হলে বড় বড় টার্ন করাতে হবে, এ ধারণায়ও ঠিক বিশ্বাসী নন নাফীস, 'আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, বড় টার্ন বা বড় সুইং কিন্তু কখনোই খুব একটা ক্ষতিকর নয়। যে উইকেটে বেশি টার্ন করে, সেখানে কিন্তু ব্যাটসম্যান বড় টার্নের জন্য প্রস্তুতই থাকে। অল্প ও ছোট্ট টার্নই কিন্তু সব সময় ব্যাটসম্যানকে সমস্যায় ফেলে। আমাদের স্পিনারদের মূল শক্তি অল্প টার্ন এবং বলটা অব দ্য পিচ স্কিড করে। আমরা যদি ছোট্ট টার্নও পাই এবং ওখান থেকে যদি বলটা ভেতরে আসে, তাহলে কিন্তু প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের সমস্যায় ফেলা যায়।' ফেলা যায় যদি উইকেট বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে রাখে। আর মুখ ফিরিয়ে নিলে?
স্পিনারদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নটা এখানেই। প্রশ্ন আরেকটি আছে। নিজেদের উঠোনেই বা কেন ষোলআনা হোম অ্যাডভান্টেজ পাবে না বাংলাদেশ? যে সুবিধাটা বিশ্বের আর সব দলই নিয়ে থাকে।

No comments

Powered by Blogger.