পানিতে সমাপ্তি নবপরিণয়

ভোরের পুকুরে ধুয়ে গেল দুই দম্পতির হাতের মেহেদি। কেটে গেল নতুন জীবনের সানাইয়ের সেই সুর। পুকুর ঘাটে হাঁটাহাঁটির সময় একজন পা পিছলে পড়ে গেলে তাঁকে বাঁচাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। সাঁতার না জানায় স্বামী-স্ত্রী দুজনই পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেন। সাহায্য করতে নেমেছিলেন আরেকজন। শেষ পর্যন্ত তিনজনই তলিয়ে যান। গতকাল শুক্রবার গাজীপুরের একটি পিকনিক স্পটের পুকুরে দুই নবদম্পতির মধ্যে তিনজনের এই মর্মস্পর্শী মৃত্যু ঘটে।
তাঁরা হলেন_সম্প্রচারের অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল 'একাত্তর'-এর নির্বাহী প্রযোজক তানভীর জাহিদনয়ন (৩২), তাঁর বন্ধু জামিল আক্তার লিপু (৩৩) ও লিপুর স্ত্রী আসমা আক্তার ইরা (২৪)।


তানভীর জাহিদ আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক নূহ উল আলম লেনিনের জামাতা। কয়েক মাস আগে তাঁর বিয়ে হয়েছে লেনিনের বড় মেয়ে সুবর্ণা সেঁজুতি টুসির সঙ্গে। তাঁর বন্ধু লিপু বিয়ে করেছেন সাত মাস হলো। লিপু রাজধানীর মণিপুর এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী আক্তারের ছেলে। ইরা একই এলাকার ইসরাইল মিয়ার মেয়ে।
গতকাল ভোরে গাজীপুরের মির্জাপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের পিকনিক স্পট শিরুনী কটেজে এ মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
কটেজের কেয়ারটেকার লিটন (২৮) সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে দুটি প্রাইভেটকারে করে দুজন পুরুষ ও দুজন মহিলা কটেজে এসে দুই নম্বর কক্ষে ওঠেন। কটেজের মালিক লিয়ার হোসেনের ছেলে রানা আহমেদ অতিথিদের আসার খবর আগেই তাঁকে দিয়েছিলেন। অতিথিদের নামিয়ে দিয়ে প্রাইভেটকার দুটি চলে যায়। রাতে সঙ্গে নিয়ে আসা খাবার খেয়ে গল্পগুজব করতে থাকেন তাঁরা।
লিটন জানান, ভোর ৫টার দিকে তিনি দুই পুরুষকে পুকুর ঘাটে বসে গল্প করতে দেখেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে ঘরে আসার আধাঘণ্টা পর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আবার পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখেন সেখানে অনেক মানুষ। পুকুরের পানিতে একজনের দেহ ভাসছে। পরে অচেতন অবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি তাৎক্ষণিক জানানো হয় কটেজ মালিকের ছেলে রানা আহমেদকে। তিনি গাড়িতে করে দ্রুত এই তিনজনকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন। প্রথমে তাঁদের উত্তরার ল্যাবএইড ও পরে জাহানারা ক্লিনিকে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী হুমায়ুন ও আবুল কাশেম জানান, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তানভীর জাহিদের স্ত্রী সুবর্ণা সেঁজুতির চিৎকারে তাঁরাসহ আশপাশের কয়েকজন পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখেন একজনের দেহ পানিতে ভাসছে। পুকুরে নেমে তাঁরা অন্য দুজনকেও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন।
এ সময় সুবর্ণা তাঁদের জানান, পুকুর ঘাটে হাঁটাহাঁটির সময় ইরা পা পিছলে পুকুরে পড়ে গেলে তাঁকে বাঁচাতে ঝাঁপ দেন স্বামী লিপু। কিন্তু সাঁতার না জানায় স্বামী-স্ত্রী দুজনই পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেন। তাঁদের বাঁচাতে তানভীরও পানিতে নামেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনজনই পানিতে তলিয়ে যান।
কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক হাসপাতাল থেকে ফিরে জানান, স্বজনরা তিনজনের লাশ নিয়ে গেছে।
জয়দেবপুর থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে জানান, এ ঘটনায় তাঁর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে।
ওসি বলেন, যেহেতু তিনজনকে ঘটনাস্থল থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে একটি হাসপাতালে তাঁদের মৃত বলে জানানো হয়, সে কারণে ওই থানায়ই মামলা হওয়ার কথা। তারপরও হোতাপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আজহারুল ইসলামকে প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য নিহতদের বাসায় পাঠানো হয়েছে। তিনি আসার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

No comments

Powered by Blogger.