গদ্যকার্টুন-ভারী পর্বতের হালকা দিকগুলো by আনিসুল হক

ও ভাই, সরেন তো ২৩ মে ২০১০ মুসা ইব্রাহীম এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছেন। ভোরবেলা। চূড়াটা দৈর্ঘ্যে আনুমানিক ৩০ ফুট, চওড়ায় ছয় ফুট। সব মিলিয়ে প্রায় ১৮০ বর্গফুট। ওই জায়গাটাও সমতল নয়। অনেকটা উটের পিঠের মতো উত্তল বা কনভেক্স। ওই দিন আবহাওয়া ভালো ছিল। ৫০-৬০ জন পর্বতারোহী ওই সময় চূড়ায় উঠে পড়েছেন।


অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ মাত্র তিন বর্গফুট এলাকা। ঢাকার মিনিবাসের মতো গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি অবস্থা। ভাগ্যিস, ৬০ জনই একসঙ্গে ওঠেননি। উঠলে পকেট মারও হয়ে যেত কারও কারও। তবে আমাদের মুসাকে নিয়ে চিন্তা নেই। উনি বিস্তর মিনিবাসে উঠেছেন। কীভাবে কনুইয়ের ধাক্কায় লোক সরিয়ে আগে বাড়তে হয়, তাঁর ঢের জানা আছে।
শুধু এভারেস্টচূড়ায় উঠলেই হবে না, মুসাকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি উঠেছেন। কাজেই ছবি তুলতে হবে। ২০০৯ সালে এভারেস্টের চূড়ায় চার ফুট উঁচু এক বুদ্ধমূর্তি স্থাপিত হয়েছে। ওই মূর্তিকে পেছনে রেখে দূরে অন্য সব শৃঙ্গ-পাহাড়কে সাক্ষী রেখে ছবি তো তুলতেই হবে। তা না হলে বাঙালি বলবে, আরে সব ভুয়া, ও ওঠেইনি। এর মধ্যে ঘটল একটা বিশাল ভজঘট। মুসার ক্যামেরাটা ছিল তাঁর জ্যাকেটের ভেতরে। কিন্তু জ্যাকেটের জিপার কিছুতেই খুলছে না। মুসা তাঁর মিনিবাসে ওঠার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মূর্তির সামনে অবস্থান নিতে পেরেছেন। কিন্তু কিছুতেই ক্যামেরা বের করতে পারছেন না। মিনিট পাঁচেক লেগে গেল তাঁর ক্যামেরাটাই বের করতে! যাক, তবু বেরোল। ভাগ্যিস, বেরিয়েছিল। তা না হলে কী হতো ভাবুন! এবার মুসা ছবি তোলা শুরু করলেন। প্রথমে বাংলাদেশের পতাকা ধরে ছবি তুললেন। তারপর প্রথম আলোর প্রতীক... এরপর একে একে স্পন্সরদের... ততক্ষণে অন্য পর্বতারোহীরা মহাবিরক্ত। তাঁরা বলতে লাগলেন, ও ভাই, সরেন তো! মুসা কী আর সরেন! প্রমাণ বলে কথা! তিনি সবগুলো ছবি তুললেন। তারপর সরলেন। ততক্ষণে অপেক্ষমাণ লাইনটা প্রায় অধৈর্য হয়ে উঠেছে।

তুমি কি বিশ্বাস করো, মুসা এভারেস্টে উঠিয়াছে?
ফেসবুকে স্ট্যাটাসে চমৎকার একটা লেখা বেরিয়েছিল। আমি একটু সম্পাদনা-পরিমার্জনা করে সেটা এখানে উদ্ধৃত করছি।
‘বৎস, তুমি কি বিশ্বাস করো, মুসা এভারেস্টে উঠিয়াছে?’
‘গুরু, মুসা কি একা উঠিয়াছে?’
‘হ্যাঁ বৎস, সে একাই উঠিয়াছে।’
‘তাহা হইলে গুরু, আমি বিশ্বাস করি যে মুসা এভারেস্টে উঠিয়াছে। ওইখানে তো দ্বিতীয় কোনো বাঙালি ছিল না যে তাহার পা ধরিয়া তাহাকে টানিয়া নামাইবে।’
‘সত্য। বাঙালি যদি একা একা চেষ্টা করে তাহা হইলে সে চাঁদেও যাইতে পারিবে।’

এভারেস্টের চেয়েও উঁচুতে ওঠার উপায়
ফেসবুকেই নানা মজার মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। বাঙালির রসবোধ অনিঃশেষ, ওই মন্তব্যগুলো হলো তার সামান্য প্রমাণ। মুসার চেয়েও উঁচু পাহাড়ে ওঠার উপায় কী? একজন লিখেছেন, এরপর যিনি যাবেন তিনি দুটো থান ইট বগলে করে নিয়ে যাবেন। এভারেস্টের চূড়ায় উঠে ওই থান ইট দুটো বিছিয়ে তার ওপরে উঠে তিনি ছবি তুলবেন। তাহলেই ২৯ হাজার ৩৯ ফুট উঁচুতে উঠে তিনি রেকর্ড স্থাপন করতে পারবেন।
এটা কিন্তু রসিকতা নয়। এই নিয়ে একটা ছবি ও বই আছে। দি ইংলিশম্যান হু ওয়েন্ট আপ এ হিল বাট কেম ডাউন এ মাউন্টেইন (১৯৯৫)। ইংরেজ ভদ্রলোক যিনি পাহাড়ে উঠেছিলেন, কিন্তু পর্বত থেকে নেমে এসেছিলেন। ১৯১৭ সালের দিকে ইংল্যান্ডের ওয়েলসের একটা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ভূমি জরিপকারীরা আসছেন। তাঁদের গ্রামের পাহাড়টা যদি এক হাজার ফুট হয় তাহলে তাকে তাঁরা পর্বত হিসেবে গণ্য করবেন। কিন্তু পাহাড়টা এক হাজার ফুটের চেয়ে খানিকটা ছোট। তখন গ্রামবাসী মিলে মাটি কেটে ডালায় ভরে মাথায় করে নিয়ে চললেন পাহাড়ের ওপরে। সবার চেষ্টায় ওটা এক হাজার ফুটের চেয়ে উঁচু হলো। পাহাড় থেকে ওটা পর্বত হয়ে গেল।
আমাদের দ্বিতীয় বাঙালি যিনি যাবেন, তিনি যদি সঙ্গে করে দুটো থান ইট কিংবা একটা টুল নিয়ে যান, তাহলে তিনি কিন্তু সর্বকালের বিশ্বরেকর্ড ভঙ্গ করবেন।

মুসা কেন পারলেন?
মুসা ইব্রাহীমের নাকি উচ্চতাভীতি ছিল। আশ্চর্য তো। তিনি খাড়া পাহাড়গুলো শেষ দিনে বাইতে তেমন ভয় পাননি, কারণ তখন ছিল রাত। ঘন অন্ধকার। মাথার সঙ্গে বাঁধা টর্চের আলোয় বেশি দূর দেখা যায়নি। যতটুকুন দেখা গেছে, তাতে তিনি তেমন ভয় না পেয়েই উঠে গেছেন। তারপর যখন ভোর হলো, নিচে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, সর্বনাশ। এই ভয়াবহ উঁচুতে তিনি কীভাবে উঠলেন। এখন নামবেন কী করে?
এর মধ্যে তাঁর শরীরের শক্তি নিঃশেষিত। কারণ শেষের দিনগুলোয় খাবার তেমন জোটেনি। এখন পানিও জুটছে না। তার মনে হচ্ছে, তিনি পারবেন না। তখনই তাঁর মনে হলো, নিচে নামতে না পারলে তাঁর বোনের কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকা আর কোনো দিনও ফেরত দেওয়া হবে না। এই টাকা ফেরত দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো, সুস্থ দেহে নিরাপদে নিচে নামতে থাকা। তিনি নামতে লাগলেন। দড়ি বেয়ে খাড়া পাহাড় থেকে নামছেন। এ সময় তাঁর শরীর এলিয়ে পড়তে লাগল। তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। দুই ঘণ্টার পথ তিনি নামলেন পাঁচ ঘণ্টায়। এখানে একটা রেকর্ড হলো। এত উঁচুতে দড়ির সঙ্গে ঝুলে এর আগে কেউ এতক্ষণ ধরে ঘুম দিয়েছেন কি না, জানা যায়নি। হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তাঁর মনে পড়ল, বোনের টাকা শোধ করতে হবে। তিনি তরতরিয়ে নিচের দিকে নামতে লাগলেন।
সত্যজিৎ রায় যখন পথের পাঁচালী নির্মাণ করেন, তাঁরও খুব টাকার টানাটানি ছিল। মুসা ইব্রাহীমেরও টাকার সংকট ছিল। ছিল বলেই তিনি পেরেছেন। নইলে যে কী হতো? কী হতো, সেটা আর ভাবার দরকার কী! তিনি তো পেরেছেনই।
উপদেশ: টাকা বা স্পন্সরের পেছনে না ছুটে তোমার লক্ষ্যের দিকে স্থিরচিত্তে অগ্রসর হও।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.