সিসিসি নির্বাচন-মাঠের অবস্থা ভালো, এখন ফাইনাল দেখার অপেক্ষা by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যে ব্যাপারটি এবার বিশেষ করে চোখে পড়ছে তা হলো, প্রার্থীরা প্রচারের আড়ম্বরের চেয়েও সরাসরি ভোটারদের দুয়ারে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বেশি। পোস্টারে ছেয়ে যায়নি নগর, মাইকের অত্যাচারও অনেক কম। ফলে নগরবাসী আছেন তুলনামূলক স্বস্তিতে।


সবচেয়ে আশা জাগানোর বিষয় হলো, প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন না। প্রধান দুই মেয়র পদপ্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থিত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বিএনপি-সমর্থিত মঞ্জুর আলম এ পর্যন্ত পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো বিরূপ মন্তব্য তো করেনইনি, বরং পত্রপত্রিকার সাক্ষাৎকারে তাঁদের মন্তব্য অনেকটা সমীহপূর্ণ। যেমন বিপক্ষ প্রার্থী তাঁর তুলনায় দুর্বল কি না, এ প্রশ্নের জবাবে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ‘কাউকেই আমি দুর্বল মনে করি না, সবল-দুর্বল নির্ধারণ করবেন জনগণ।’ একইভাবে মঞ্জুর আলম তাঁর একসময়কার নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাঁকে আমি শ্রদ্ধার চোখে দেখি, তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ।’
মঞ্জুর আলমের মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে গেছেন মহিউদ্দিন, তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। দুই প্রার্থীর আলিঙ্গনের ছবি ছাপা হয়েছে পত্রপত্রিকায়। এতে দুই দলের যুদ্ধংদেহী সমর্থকদের কাছে এ বার্তা নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে, এবারের লড়াইটি আর যা-ই হোক বাহুবলের লড়াই হচ্ছে না।
প্রার্থীরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে সমালোচনা করছেন না, তা নয়। তবে, এ ব্যাপারে তাঁরা এবার অনেকটা কৌশলী থাকছেন। যেমন মহিউদ্দিন বলছেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ টাকা।’ অর্থাৎ শিল্পপতি মঞ্জুর নির্বাচনে টাকা-পয়সা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন—এমন একটি ইঙ্গিত তাঁর কথায় আছে। আবার মঞ্জুর বারবার ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তাঁর সমর্থকদের। অর্থাৎ মহিউদ্দিন ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন—এমন একটি ইঙ্গিত তিনি দিয়ে রাখছেন তাঁর কর্মী-সমর্থকদের। এভাবে লাঠি না ভেঙে সাপ মারার চেষ্টাটি মন্দ নয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। আশঙ্কার কথাও জানিয়ে রাখা হলো, আবার কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে বিরতও থাকলেন তাঁরা।
দুই মেয়র পদপ্রার্থীর এ কৌশল প্রভাবিত করছে ৪১টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদেরও। তাঁরাও এযাবৎ পরস্পরের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেননি বলে নির্বাচনের পরিবেশকে এক কথায় বলা চলে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক। হালিশহরে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের বিক্ষিপ্ত ঘটনাটি ছাড়া নগরে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শোনা যায়নি। তবে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এ সংযম কতটা রক্ষা করা যায়, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যাপারে দুই মেয়র পদপ্রার্থী সংযত হলেও নির্বাচন নিয়ে দুই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিন্তু দেখা গেছে শুরু থেকেই। দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী নাগরিক কমিটি ও উন্নয়ন আন্দোলনের ব্যানার নিয়ে নির্বাচনে এলেও এ কথা সবারই জানা, লড়াই মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির।
বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা এবার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। এসব হেভিওয়েট প্রার্থীকে ‘না’ করে দিয়ে দলীয় হাইকমান্ড যখন মহিউদ্দিন চৌধুরীর এককালের আস্থাভাজন ও আওয়ামী ঘরানার বলে পরিচিত মঞ্জুর আলমকে প্রার্থী ঘোষণা করে, তখন দলের মধ্যে সৃষ্টি হয় তুমুল অসন্তোষ। এমনকি সংবাদ সম্মেলন করে এ প্রার্থিতাকে ‘দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন এখানকার নেতারা। মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিপক্ষে তাঁকে ‘দুর্বল’ বা ‘ডামি’ প্রার্থী, এতে দলের কোনো কোনো অংশের নেতাদের কারসাজি আছে বলে উল্লেখ করেছেন তাঁরা। মঞ্জুর আলম যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র ছিলেন, তাঁকে এক-এগারোর সুবিধাভোগী বলে চিহ্নিত করতেও দ্বিধা করেননি বিএনপিরই কোনো কোনো নেতা। তাঁদের আপাতত নিবৃত্ত করেছেন দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া।
অন্যদিকে, মহিউদ্দিন চৌধুরী তিন দফায় প্রায় সাড়ে ১৬ বছর মেয়র পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বলে তাঁর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-অভিমানের সুযোগ আরও বেশি। এখানকার ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা তাঁকে প্রার্থী না করার আবেদন জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন হাইকমান্ডের কাছে। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলরদের অনেকে সরাসরি তাঁদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলেন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রার্থিতা নিশ্চিত করলেও ঢাকায় ডেকেছিলেন চট্টগ্রামের নেতাদের। গণভবনে দলীয় নেত্রীর সামনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর উপস্থিতিতেই তাঁদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন নেতারা। আগেরবারের মেয়র নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে নির্বাচিত করার জন্য অক্লান্ত শ্রম দেওয়ার পরও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁকে পাশে তো পানইনি ক্ষেত্রবিশেষে তাঁর বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন তাঁরা, এ কথা স্পষ্ট করে বলেছেন এ অঞ্চলের কোনো কোনো দলীয় সাংসদ। নগর কমিটিকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা, ইচ্ছানুযায়ী কাউকে অন্তর্ভুক্ত বা বহিষ্কার করা ইত্যাদি অভিযোগও এসেছে বৈঠকে। এ ছাড়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতা-কর্মীদের অবজ্ঞা-উপেক্ষা-দুর্ব্যবহার এবং নগর পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের উদাহরণ তুলে ধরে এর জন্য নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথাও বলেছেন কেউ কেউ। তবে, শেষ পর্যন্ত মহিউদ্দিন চৌধুরী পরিস্থিতি ভালোই সামাল দিয়েছেন বলে মনে হয়। অতীতের ভুল-ত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে চট্টগ্রামের নেতাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
মঞ্জুরকে প্রার্থী করে বিএনপির হাইকমান্ড আসলে দলীয় কোন্দলকে আপাতত চাপা দিতে চেয়েছে। দলের সঙ্গে কম সম্পর্কিত একজনকে মনোনয়ন দিলে বিভক্তি কমবে—এ ধারণাই সম্ভবত কাজ করেছে এখানে। তা ছাড়া মঞ্জুর দীর্ঘদিন মহিউদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন, ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কাজটিও সহজ হবে বলে মনে করেছেন তাঁরা। অন্যদিকে, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে গতানুগতিক পথটিই অনুসরণ করেছে আওয়ামী লীগ। দীর্ঘকাল মেয়র ছিলেন, নির্বাচনের হিসাব-নিকাশও তাঁর ভালো জানা। সুতরাং ঝুঁকি এড়াতে আপাতত তিনিই সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করেছেন নীতি-নির্ধারকেরা।
দুই প্রধান দলের কাছেই এই নির্বাচন এখন মর্যাদার বিষয়। স্থানীয় নির্বাচন হলেও সরকারের দেড় বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার কিছুটা হিসাব-নিকাশও এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হবে বলে অনেকের ধারণা। ফলে দুই দলের শীর্ষ নেতাই স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মিলেমিশে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। প্রকাশ্যে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করার সুযোগ এখন আর থাকল না। তবে, মেনে নেওয়া আর মনে নেওয়ার মধ্যে যে ব্যবধান তা কতটুকু ঘোচে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করার চেয়েও ঘর সামলানোর কাজটা কঠিন হয়ে পড়ছে দুই প্রার্থীর।
নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী অধিকাংশের আছে দলীয় পরিচয়। প্রতিটি ওয়ার্ডেই প্রায় একই দলের একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারে আছে বলে দলে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি। ওয়ার্ডভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসল চিত্র বোঝা যাবে দু-একদিন পর।
শুরুতেই বলেছি, এখনো পর্যন্ত পরিবেশ খুবই ভালো। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মাঠ প্রস্তুত। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু না ঘটলে চমৎকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি ফাইনাল দেখা যাবে ১৭ জুন।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি ও সাংবাদিক।
bishwa_chy@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.