চলতি পথে-মকবুল হোসেনের লজ্জা! by দীপংকর চন্দ

প্রকৃতির আচরণ আজ রহস্যময়। লাস্যময় ভ্রুকুটি হেনে মুহূর্তে সে ডেকে আনছে বাস্তব বুদ্ধিবিবর্জিত বৃষ্টিকে। পরমুহূর্তেই কপট কটাক্ষে রোদকে প্ররোচিত করছে কাছে আসতে। অবোধ রোদ গুটিগুটি পায়ে কাছে এসে দাঁড়াতেই বৃষ্টির সঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে বিরোধ। সেই বিরোধে শঙ্কিত হচ্ছে টরকি বন্দর বাজারের বাণিজ্য-ব্যস্ত মানুষের দল।


মুনাফা নামের ইহলৌকিক অর্জনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় ব্যাকুল হচ্ছে তারা। স্বরূপকাঠির মকবুল হোসেনের দুটি চোখই খোলা। পথের পাশের একটা চায়ের দোকানের নড়বড়ে বেঞ্চে বসে তিনি সবই দেখছিলেন, কিন্তু গায়ে মাখছিলেন না কিছুই। ষাটোর্ধ্ব বয়স তাঁর। সংসারের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এসেছেন তিনি। জীবনের তিক্ত-রসাল শত অভিজ্ঞতায় পূর্ণ মকবুল হোসেনের অন্তরের ঝুলি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি উপনীত হয়েছেন ভিন্ন বিশ্বাসে। তাঁর বিবেচনায় ইহলৌকিকতা অসার। মকবুল হোসেন মনে করেন, পারলৌকিকতায় মানুষের মুক্তি, আত্মার সুখ। তাই তিনি সংসারের বাঁধন ছিন্ন করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মসজিদে, মন্দিরে, দরগায়, মাজারে। খুঁজে ফিরছেন পারলৌকিকতার স্বরূপ।
‘কিন্তু সেই স্বরূপের সন্ধানে আপনার অগ্রগতি কেমন?’ বিশুদ্ধ কৌতূহল কণ্ঠে ফুটিয়ে জানতে চাই আমরা।
আমাদের প্রশ্নে বিহ্বল হন তিনি। একটু সময় নিয়ে সামলেও ওঠেন, তারপর হাসেন মিটিমিটি। এ সময় ভীষণ মায়াময় লাগে মকবুল হোসেনের শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখটা। তিনি বলেন, ‘বাবারে, অগ্রগতি কেমন তা বুঝি না আমি, তয় মাথাডা আউলা আউলা লাগে! কোনো কামেল পীরের দরবার শরিফের কাছে গেলেই মোচড় দিয়া ওঠে মনটা!’ বলতে বলতে মকবুল হোসেন উঠে দাঁড়ান হঠাৎ, চায়ের দোকানের নড়বড়ে বেঞ্চের মায়া ত্যাগ করে হেঁটে যান সামনে।
ছোট একটা সেতু পেছনে ফেলে একটু এগোলেই লাখেরাজ কসবা গ্রাম। গ্রামের প্রবেশমুখেই দেয়ালঘেরা বিশাল জায়গা। একটা তোরণ এই জায়গাটির সম্মুখভাগে। তোরণের শীর্ষদেশে বেশ বড় হরফে লেখা ‘হযরত মল্লিক দূত কুমার পীর সাহেবের মাজার’। পারলৌকিকতার স্বরূপসন্ধানী মকবুল হোসেন সেই তোরণ অতিক্রম করেন অবলীলায়। আমরা ঘোরগ্রস্ত দ্বিপদ প্রাণীর মতোই অনুসরণ করি তাঁকে। ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে এদিক-ওদিক তাকাই। বহুবর্ণে আপ্লুত গাছপালা দেখি; সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত মাঠ দেখি; মাঠের পশ্চিম প্রান্তে এক গম্বুজবিশিষ্ট যে স্থাপনাটি দেখি, সেটিই হযরত মল্লিক দূত কুমার (রা.) পীর সাহেবের মাজার।
হযরত মল্লিক দূত কুমার (রা.) ছিলেন ইয়ামেনের বাদশার দ্বিতীয় ছেলে। বাদশার সাত ছেলে ইসলাম প্রচার করতে বাংলায় আসেন। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল তখন। হযরত মল্লিক দূত কুমার (রা.) ধর্ম প্রচারকাজের জন্য বেছে নেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কসবা গ্রামটিকে। তারপর শুরু হয় ধর্ম প্রচার। ধর্ম প্রচারে হযরত মল্লিক দূত কুমার (রা.) পীর সাহেবের খ্যাতির খবর দেশের নানা স্থানে তো বটেই, বিদ্যুৎগতিতে তা পৌঁছে যায় মোগল সম্রাটের দরবারেও। সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রতিনিধি পাঠান কসবায়। দূত কুমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সম্রাটের প্রতিনিধি। তিনি পীর সাহেবকে সম্রাটের শুভেচ্ছার কথা জানান, সেই সঙ্গে সম্রাটের নির্দেশে ১৬ দরুন ১৩ কানি লাখেরাজ সম্পত্তি প্রদান করেন হযরত মল্লিক দূত কুমারের মাজারের জন্য। সেই থেকে কসবা গ্রামের মাজারসংলগ্ন অঞ্চলটি সাধারণ্যে পরিচিত হয় লাখেরাজ কসবা নামে। ‘সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রদত্ত লাখেরাজের তাম্রলিপি এখনো রয়েছে কসবার কাজিদের কাছে’—জানালেন মাজারের ছায়াচ্ছন্ন বারান্দায় বসে থাকা মো. বাদশা কাদির।
সে যা-ই হোক, মাজারের ভেতর প্রবেশ করি আমরা। সুবৃহৎ এক কক্ষবিশিষ্ট মাজারটির কেন্দ্রস্থলে হযরত মল্লিক দূত কুমার (রা.) পীর সাহেবের কবর। কমলা রঙের গিলাফে আবৃত কবরটির চারপাশ গ্রিলে ঘেরা। বরিশালের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে মাজার জিয়ারতে এসেছেন। অনাগত সন্তানের মঙ্গল কামনায় মাথা নত করে মোমবাতি প্রজ্বালিত করলেন তিনি, পরম বিশ্বাসে বুক বেঁধে জ্বালালেন আগরবাতি। মাজারের বাতাস ভরে উঠল আগরবাতির গন্ধে। চারপাশ ঘুরে দেখে বাইরে এলাম আমরা।
স্বরূপকাঠির মকবুল হোসেনের সঙ্গে দেখা হলো পুনরায়। কথা হলো আরও কিছু। তাঁর ভাষ্যে, হযরত মল্লিক দূত কুমার (রা.) পীর সাহেবের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি জনহিতকর নানা কাজেও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি দিঘি খনন করেন হযরত মল্লিক দূত কুমার (রা.)। পদ্মবুনিয়া, গোয়ালিয়া, মালী, মাঝোর আন্ধি নামের এসব দিঘির জলে এখনো ছায়া ফেলে সোনালি দিনের স্মৃতি।
‘কিন্তু এসবই তো ইহলৌকিক কাজ। আপনার বিবেচনায় ইহলৌকিক সব কাজই তো মূল্যহীন, অসার।’
একরাশ সংশয় নিয়ে কথাগুলো বলতেই লজ্জায় আরক্ত হয় মকবুল হোসেনের মুখ। তিনি মাথা নত করেন, তারপর ধীরে ধীরে বলেন, ‘ভুল কইছি, বাবারা। বয়স বাড়লে কত ভুল কথা যে কয় মানুষ! আসলে বাবা ইহলৌকিকতা আর পারলৌকিকতায় কোনো
বিরোধ নাই।’

No comments

Powered by Blogger.