বইমেলার অপেক্ষায় by রেজোয়ান সিদ্দিকী

এই নগরীর মানুষেরা পাঠাভ্যাসে যে খুব প্রবল এমন দাবি করা যায় না। কারণ, বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে কোনো যাত্রীর হাতেই বই তেমন একটা দেখা যায় না। অথচ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমি দেখেছি এসব যানবাহনে দীর্ঘ পথযাত্রায় বহু মানুষ নিবিষ্টচিত্তে অবিরাম বই পড়ে।

বাড়িতে আমরা যতক্ষণ টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসে ভিনদেশি, আগ্রাসী, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আবদ্ধ থাকি সে তুলনায় বই পড়ার জন্য সামান্য সময় ব্যয় করতে চাই না। বইয়ের বদলে ইন্টারনেটের সামনে যারা বসি তাদেরও প্রধান লক্ষ্য ছবি কিংবা গেম। জ্ঞান আহরণ নয়।
ফলে প্রযুক্তির বিকাশ এই সমাজে যতটা ঘটছে, সে তুলনায় জ্ঞান বা চিত্তবৃত্তির প্রসার চর্চা একেবারেই নেই। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারে সারাদিনই টেলিভিশন খোলা থাকে। যার যার পছন্দের অনুষ্ঠান সে সে দেখতে থাকে, ফলে টেলিভিশন বন্ধই হয় না। কিন্তু এসব পরিবারে, বছরের পর বছর মনে হয় না একটি বই আধখোলা পড়ে থাকতে দেখেছি। বিরক্ত হই। কখনও কখনও দু’চার-পাঁচটা বই নিয়ে ধরিয়ে দিয়ে এসেছি। জ্ঞানের বই। চিত্ত, বৃত্তি, বিকাশের বই। দু’মাস পরে জিজ্ঞাসা করেছি ওই পরিবারের পুরো একটি বই কেউ পড়েছে কিনা। কেউ কেউ ধরেও দেখেনি। কেউ কেউ শুরু করেছিল, শেষ করার সময় হয়নি। অথচ দু’মাস গড়িয়ে গেছে।
এর কিছুটা প্রমাণ মিলল মাসখানেক আগে সমাপ্ত ঢাকা বইমেলায়। ভিড় নেই, ভাট্টা নেই। ক্রেতা নেই, বিক্রি নেই, বইয়ের পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বসেছিলেন। তাই নিয়ে আফসোস করে পত্রিকায় রিপোর্টও দেখলাম। কিন্তু আমি বিস্মিত হইনি। বইমেলা একটি আন্দোলন। সে আন্দোলনের সূচনা সরকারকেই করে দিতে হয়। এর শুভ সূচনা ঘটলে নাগরিকরা আপনা-আপনিই সে আন্দোলনের শরিক হয়ে পড়বে। জোট সরকারের আমলে বই নিয়ে তেমন সাড়া আমরা লক্ষ্য করেছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশে দু’বছরের সেনাশাসন এবং গত এক বছরের মামলা শাসনে সে অভ্যাসের জবনিকাপাত ঘটেছে।
কিন্তু একুশে বইমেলার চিত্র ও ঐতিহ্য ভিন্ন, এই বইমেলা নিয়ে লেখক-প্রকাশক মহলে একটা সাজ সাজ রব পড়ে যায়, শত-সহস্র নতুন বই প্রকাশিত হয়। কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। একুশের বইমেলাকে ঘিরে কত নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে। একুশের বইমেলা এক বিশাল মিলনমেলা। সৃষ্টির মেলা। বই বাণিজ্যের মেলা, আর দু’দিন পরেই সে মেলার উদ্বোধন। অন্তত একুশের বইমেলা সফল হোক, আমরা যেন বই কিনি। বই পড়ি। বইমনস্ক হই।
শোক কিংবা আনন্দ
নাগরিক মানুষের অভিন্ন শোক নেই। অভিন্ন আনন্দও নেই। যদিও এখানে সমাজ আছে, সে সমাজের অস্তিত্ব খুব বেশি টের পাওয়া যায় না। ঈদ কিংবা পূজা-পার্বণ, নিদেনপক্ষে জুমার নামাজ—এই নিয়ে অনেক মানুষ একত্রিত হয় বটে কিন্তু পরস্পরের কাছে অচেনাই থেকে যায় তারা। ঈদের দিনেও চেনাজানা মানুষেরাই পরস্পরের সঙ্গে আলিঙ্গন করে। অচেনা মানুষটিকে চেনার জন্য চোখাচোখিও হয় না। জুমার নামাজেও তাই দেখি। পাশাপাশি নামাজে দাঁড়ানো। যথারীতি নামাজ আদায়। তারপর বসে খুত্বা শোনা। মোনাজাত পর্যন্ত অপেক্ষা, তারপর যে যার কাজে ছুট। অনেকে আবার এত ব্যস্ত যে, সালাম ফিরিয়ে খুত্বা কিংবা মোনাজাতের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন না। তার আগেই যার যার কাজে চলে যান। শুধু খুব প্রবীণ মানুষ যারা কর্ম থেকে অবসর নিয়েছেন তারাই নামাজের আগে মসজিদে যান। পরস্পরের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। শরীর-স্বাস্থ্যের কথা। সন্তান-সন্ততির কথা। সাফল্য-ব্যর্থতার কথা। এইসব নিয়ে আলোচনা খানিকটা জমে ওঠে। তারপর তারাও যে যার গন্তব্যে চলে যান।
এই নগরীর সমাজ বলতে গেলে এটুকুই। এছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠান, জন্মদিনের অনুষ্ঠান কিংবা কুলখানিতেও নাগরিকরা একত্রিত হন। সেখানে আমন্ত্রণকারীকে দেখা দেয়াই মুখ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। আমন্ত্রিতরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান কমই। নগরীর সমাজ নেই। পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য বিরোধ, সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা—এই নিয়ে নগরীতে বিচার-সালিশের রেওয়াজ নেই। কেউ কারও খায়ও না পরেও না। ফলে তাকে ফপর-দালালি করতে কে বলেছে? ফলে কেউ যেঁচে সহজে কারও সাতে-পাঁচে নাক গলায় না। এভাবেই নগরীর বৃত্তাবদ্ধ গৃহবন্দি নাগরিকেরা জীবন পার করে দেন।
অথচ নগরীর নাগরিকেরা গ্রাম থেকে এসে শহরে আস্তানা গাড়েন। কিন্তু গ্রাম সমাজের নিয়মগুলো নগরে এসে ধরে রাখতে পারেন না। নগর তাকে ঠেলে ঠেলে চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি করে দেয়।
তবে কি নগরীতে সঙ্গ, সংঘ বলতে কিছুই নেই? একেবারে নেই বলা ভুল হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ-তরুণীরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হয়। সখ্য, বন্ধুত্ব, প্রেম গড়ে ওঠে। চেনা, জানা, আসা, যাওয়া বিস্তর হয়। লেখাপড়া শেষে যে যার মতো কর্মস্থলে চলে যায়। তারপর প্রত্যেকে আবার নিজস্ব বৃত্তের ভেতরে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। হয়তো একই নগরে। কিংবা ভিন্ন কোনো জনপদে—এভাবেই নগরীতে দিন আসে। রাত্রি নামে।
পল্লী জীবনের চিত্র অবশ্য ভিন্ন। সেখানে সমাজ এখনও সুসংবদ্ধ। সে সমাজ নিবিড় এবং অনুপেক্ষণীয়। যে কোনো মানুষের শোকে পুরো গ্রাম ছুটে যায়। নতুন মানুষের সঙ্গে পুরাতন মানুষেরা সেধে পরিচিত হন। কোথা থেকে এলেন? কোথায় যাবেন? সে পথ কোনোদিকে, কতদূর—তাও দেখিয়ে দিয়ে আসেন। কোথায় ভয় আছে। কোথায় পা ফেলতে সাবধান তার সবকিছুই গ্রামবাসীরা নবাগতকে আগাম জানিয়ে দেয়। ছোটখাটো বিরোধ-নিষ্পত্তিতে এখনও গ্রামীণ সালিশ বসে। সে সালিশের রায় উভয় পক্ষকে মেনে নিতে হয়। হাটে-বাজারে, মসজিদেই নবাগতের পরিচয় থেকে কুশল—সবই বিনিময় হয়। একজনের আনন্দে অপরে শরিক হয়। শোকেও পাশে দাঁড়ায়।
নগরীর চিত্র ভিন্ন। এক পরিবারে যখন শোকের ছায়া, অন্য পরিবারে তখন মাইক লাগিয়ে, সামিয়ানা টানিয়ে উত্সবের হররা। যে দুটো ঘটনারই খবর রাখে সেও নিরূপায়। উত্সবীদের বলতে পারে না, ও বাড়িতে শোক, হররা থামাও। শোকগ্রস্তদেরও বলা যায় না যে, তাদের উত্সব চলছে। শোকের মাতম কমাও। এ এই নগর। আশ্চর্য এক বৈপরীত্বের ভেতর দিয়ে দিপের মতো নাগরিক পরিবারের জীবন প্রবহমান। এখানে আপন আপন বৃত্তের ভেতরে সবাই বন্দি। তার বাইরে প্রতি পার্শ্বে নাগরিক যেন কিছুই দেখতে চায় না। যারা এই বৃত্ত তৈরি করেছে তারাও শেষ পর্যন্ত নগরীতে হাঁপিয়ে ওঠে। দু’দণ্ডের জন্য হলেও নগরীর বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সে প্রয়াসও ক্ষণিকের, তারপর নগরী আবারও তাদের ডাক দিয়ে নিয়ে আসে নগর- কারার ভেতরে, প্যারলে মুক্ত বন্দির মতো। নাগরিকের বোধ করি এ থেকে নিস্তার নেই।
মাঘও যে পেরিয়ে যায়
এবার বাংলাদেশে হাড় কাঁপানো শীতের মধ্য দিয়ে মাঘের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শীতের এত তীব্রতা নাগরিকেরা বহু বছর অনুভব করেননি। প্রচণ্ড শীতের সঙ্গে উত্তরে হাওয়া শীত বাড়িয়ে দিয়েছিল আরও বহুগুণে। শীতের সঙ্গে লড়াই করে শতাধিক মানুষ পরাভূত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। দিনের পর দিন রোদের দেখা মেলেনি। ফলে শীত যেন ঘন হয়ে স্থায়ী আবাস গেড়েছিল এখানে।
শীত ঋতুতে নাগরিকরা শীত চায়। কিন্তু শীত চাই সহনশীল মাত্রায়। শীত ঠিক ততটুকু চাই, যতটুকু আমরা সহ্য করতে পারি। কিন্তু প্রকৃতি স্কুলের শিশু নয় যে, সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। কান ধরে উঠ-বস করবে। কিংবা একই পাঠ অনর্গল আউড়ে যাবে ২০ বার। প্রকৃতি মানুষের অনুশাসন মানে না। অনুশাসন পছন্দও করে না। মানুষ বেশি জোর খাটালে সে রুদ্র মূর্তি ধারণ করে। রাগে, ক্ষোভে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যায়। সুতরাং শীতের নিয়মে শীত পড়ে। আমাদের আকাঙ্ক্ষার মতো স্নিগ্ধ হয়ে সে কখনও উঠে না।
মাঘের অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। কুয়াশাও কেটে গেছে। এখন দিনের বেলায় ঝকঝকে রোদ। নির্মল আকাশে রাতেরবেলা শুক্লপক্ষের চাঁদ দেখা যায়। প্রতিদিন অল্প অল্প করে বেড়ে পূর্ণিমার পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শীত কমে যাওয়ায় এখন এসব দৃশ্য নিয়ে কবিদের কাব্য রচনার পথ অবারিত হয়েছে। খুব বেশি আশঙ্কা নেই যে, এই মাসে আবারও তেমন করে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়ে যাবে। ফলে এখন বসন্তের দিকে কেবলই এগিয়ে যাওয়া।
বসন্তের আলামতগুলো এখনই আস্তে আস্তে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। গত ১৫ দিনে আমগাছের ডালে ডালে ছেয়ে গেছে মুকুল। কাঁঠাল গাছে কাঁঠালের মোচা। সজনের ফুলগুলো আরও বেশি সাদা হয়ে ফুটতে শুরু করেছে। আমের মুকুলের সঙ্গে কোথা থেকে যেন মৌমাছিরা ঝাঁকবেধে আসছে। মধুর সঞ্চয় চাই। দুই-একটি পাখি বাসা বাঁধবার জন্য খড়কুটো নিয়ে কোথায় উড়াল দিচ্ছে। বসন্তের প্রস্তুতি। নাগরিকদের শরীর থেকে গরম কাপড়ের বোঝা নামতে শুরু করেছে। তরুণীদের কেউ কেউ বাড়তি চাদরও কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলেছে। তরুণদের অনেকেরই পরনে এখনই দেখছি শুধুই শার্ট। সোয়েটারও উধাও। এটা অবশ্য জানা কথাই যে, শীত এলে বসন্ত আসবেই। রাত এলে দিন। তেমনি আবার আমাদের ‘আশা না মিটিতে’ই গ্রীষ্ম শুরু হয়ে যাবে। রসালো ফলের জন্য গ্রীষ্ম চাই। কিন্তু গা চিটচিটে কিংবা কপাল পোড়া রৌদ্র চাই না। তেমনও কখনও হয় না। তবুও এখন নাগরিকেরা বসন্তের আশায় উন্মুখ। সে বসন্তের আর খুব বেশি দেরি নেই।
ফুটনোট
বই পড়া নিয়ে নানান রসিকতা নানা সমাজে চালু আছে। এ নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর এক চমত্কার গল্প আছে। হুবহু উদ্ধৃত করছি না। সারাংশ মাত্র। এক আধুনিক নারী তার স্বামীর জন্মদিনে দোকানে এসে এটাওটা পছন্দ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনোটিই তার পছন্দ হয় না। তার মনে হয়েছে ওই জিনিসটি বোধ করি তার স্বামীর আছে। শেষ পর্যন্ত দোকানদার মহিলাকে বললেন, তবে কি আপনার স্বামীর জন্য উপহার হিসেবে একটি বই নেবেন? মহিলা চমকে উঠে বললেন, ‘ও বই, সেও তো ওর একটি আছে।’
লেখক : কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.