গ্যাস সঙ্কটের কারণ কি? by আফরোজা হাসান খান

গ্যাস সঙ্কট নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। অন্তত ভুক্তভোগীরা এ নিয়ে ভিন্ন চিন্তা সহ্য করবে না। গত দু’মাস ধরে দেখছি ঢাকার অনেক এলাকার বাসায় গ্যাস গভীর রাতে আসে সকাল সকাল বিদায় নেয়। যেন সে নিশিকুটুম আমাদের সংসারে। নিশিকুটুম বলায় রাগ না করাই ভালো।

গ্যাস হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ, সে চোর হবে কি করে? বরং যারা গ্যাস চুরি করেও বহাল তবিয়তে আছে তারাই প্রকৃত নিশিকুটুম। এরকম বহু বাস্তব চরিত্র আছে আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে, আছে গ্যাস প্রশাসনে, আছে শিল্পপতিদের মধ্যে। এগুলো আমাদের জানা, যা জানি না, তা হলো কেন সরকার গ্যাস সঙ্কট মোকাবিলায় উত্পাদন বাড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নিচ্ছে না। সেই অনীহার কারণ আমাদের জানা নেই।
এতদিন ক্ষোভ জমছিল বাড়িতে বাড়িতে, এবার তা বাড়ির বাইরে এসে শিল্পপতিদের সমিতিতে ঢুকেছে। শিল্পপতিরাও তো মানুষ, তাদের মনেও তো ক্ষোভ জমতে পারে। তাদের সমিতির নেতারা দাবি জানিয়েছে অবিলম্বে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে। কিন্তু সরকার গ্যাস উত্পাদনে যেতে গড়িমসি করছে। উত্পাদনের কথা সরিয়ে রেখে গ্যাসের চাহিদাকে রেশনিং করে সরবরাহ করার চিন্তায় আছে।
প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কেন গ্যাসের উত্পাদন না বাড়িয়ে রেশনিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে। গ্যাস নিয়ে যাদের কারবার সেসব বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেই বাড়তি উত্পাদন সম্ভব। আর তার পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। ওইসব গ্যাস ক্ষেত্র থেকে কমপক্ষে উত্পাদন বাড়ানো যাবে ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ওই পরিমাণ গ্যাসের উত্পাদন বাড়ালেই আপাতত দেশজুড়ে গ্যাস সঙ্কট নিরসন সম্ভব। তাহলে কী হবে—সরকারের মনের মধ্যে থাকা ভিন্ন চিন্তার? সেখানে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ঘুরপাক খাচ্ছে ভারত সরকারের দেয়া পুরস্কার, সংবর্ধনা ইত্যাদি। দেশে-বিদেশে সংবর্ধনার চাপে তো বলেই দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্দিরা গান্ধী নাকি তার নেতা। শুধু তাই নয় সদ্যপ্রয়াত জ্যোতি বসুও নাকি তার নেতা ছিলেন। এসব কথা তিনি গণমাধ্যমে বলেছেন। ফলে স্বপ্নে বিভোর সরকার প্রধানের মতো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী মহোদয়রাও ঘোরের মধ্যে খোয়াব দেখছেন। তারা জাতির কাজ কী করবেন! পত্র-পত্রিকায় দেখছি ভারতপ্রেমে মশগুল সরকার। ১৯৭১ সালে সহায়তা দিয়ে সেই যে ঋণাবদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগকে এদেশের অগণিত মানুষকে তার দায় বহন করতে হচ্ছে। আমরা যতই তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলি, ভদ্র আচরণ করি, ভারত করে তার উল্টোটা। এমন একটি দেশের ঋণ পরিশোধের মওকা কী কখনও পাবে আওয়ামী লীগ। তাই এবারই যা দেয়ার বা পরিশোধ করার তা করে দিয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার।
২.
গ্যাস নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা এখনও অনেকে জানেও না, জানার/বোঝার চেষ্টাও করে না। তাই তারা এ নিয়ে দুর্ভাবনাতাড়িত নয়। এতেই সরকারের হয়েছে পোয়াবারো। তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, থাকছে। তিতাস ও হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র থেকেই বর্তমানের চাহিদা পূরণের মতো বাড়তি উত্পাদন সম্ভব। এ সঙ্কট মুহূর্তে সরকার কেন হাত গুটিয়ে বসে আছে। বলা হচ্ছে, কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এতটাই যে তাদের নিয়ে দু’চার কদম সামনে এগুনোও সম্ভব নয়। টেকনিক্যাল লোকজনও কী নেই আমোদের? গত ৪৫ বছরে কী নেচারাল গ্যাস ইঞ্জিনিয়ারদের একটি গ্রুপ তৈরি হয়নি? এটা মেনে নেয়ার মতো কথা হতে পারে না। বাপেক্সের একজন সাবেক পরিচালকের অভিযোগ, দক্ষ জনশক্তির অভাবেই গ্যাস সঙ্কট হচ্ছে। তিনি বলেছেন, গ্যাস রেশনিং নাকি সময়ের অপচয়। রেশনিং করে নিজেদের তারা অপদার্থ হিসেবে প্রমাণ করেছেন। অভিযোগ অনেকটাই সত্য বলে মনে হয়। আবার এটাকেও ষড়যন্ত্রের অংশ বলেই মনে হচ্ছে। বিদেশি লোক ভালো, প্রাযুক্তিক জ্ঞানী—কথা তো ঠিকই। তারা ঋণ দেয়, ঋণ ব্যবহারের টেকনিক্যাল লোকদের ট্যাগ করে দেয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য, তারা ভালো না হয়ে যায় না। আমরা তো দেখছি সেই ‘ভালোদের’ জন্য দেশের খনিজসম্পদের এলাকাগুলো ব্লক ব্লক ভাগ করে ইজারা দিয়ে দিয়েছেন। আমাদের কেবল কষ্ট হয় দেশের টেকনোলজিক্যালী জ্ঞানীরা কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। দেশের সম্পদ লুটে নিয়ে যাচ্ছে ইজারাদাররা। রাজনৈতিক সরকার এ লুটিংয়ে ভাগিদার হচ্ছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন। কীভাবে লাভবান হয় তার একটা নমুনা দেয়া যাক।
পদ্মা সেতুর নকশাসমেত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে একটি পত্রিকায়। এ সেতু ২০১৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এটি একটি শুভ সংবাদ। কেননা এ সেতু নির্মিত হলে মংলা পোর্টের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগসহ দক্ষিণবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে। এতে অর্থনীতি পোক্ত হবে অনেকটাই। এমনকি ভারতকে এই মংলা বন্দর ব্যবহারের যে অনুমতি দিয়ে এসেছে মহাজোট সরকার, তাদের জন্য এ সেতু সোহাগা হিসেবে কাজ করবে। তো, সেই সেতু নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ২০০৯ সালে মাত্র চারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। ‘সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সেতু উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে এবছর। আর শেষ হবে ২০১৩ সালে। সেতু তৈরিতে সব মিলিয়ে খরচ হবে ২৬০ কোটি ডলার বা ১৭ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা।’ [ প্রথম আলো] মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জানুয়ারি ’০৯ বলা হয়েছিল, পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ১৮০ কোটি ডলার, আগস্টে বলা হয় ২০০ কোটি ডলার, ডিসেম্বর মাসে বলা হলো ২৪০ কোটি ডলার, আর প্রধানমন্ত্রী বললেন ২৬০ কোটি ডলার। ‘জনগণের সেবার’ জন্য এভাবেই জনগণের সরকার ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। এ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ থেকে ক্ষমতাসীনরা ঠিক কত টাকা হাতাবে, সেটা ঠিক করতে পারছে না বলেই এমনটা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সেতু নির্মাতা ও দেশী প্রকৌশলদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হচ্ছে বর্তমানে প্রতি কিলোমিটার সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ১০ কোটি ডলার বা ৬৯০ কোটি টাকা। পৃথিবীর দীর্ঘতম চীনের হাংজু সেতু ৩৬ কিলোমিটার লম্বা। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৭০ কোটি টাকা। সময় লেগেছে ৩ বছর। আর পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। এটি নির্মাণে ব্যয় ২৬০ কোটি ডলার ও সময় লাগবে ৩ বছর। হাংজু সেতু নির্মাণের পর গত বছর উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। চীনাদের হাতে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে ধারণা করা যায় এটি অনেক কম টাকায় সম্পন্ন করা যাবে।
এ ধরনের প্রকল্প থেকে দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টরা টাকা লুটের সুযোগ পায়। প্রাক্কলনের সময় ব্যয় বরাদ্দ বেশি রেখে এটা করা হয়। এ কারণেই মাত্র এক বছরের মধ্যে মহাজোট সরকার চার বার পরিবর্তন করেছে এর ব্যয় বরাদ্দ।
গ্যাস সঙ্কট দিয়ে শুরু করেছি এ লেখা। শেষ করা হলো পদ্মা সেতুর ব্যয় বরাদ্দ দিয়ে। আসলে ষড়যন্ত্রটি কোথায় কেমনভাবে হচ্ছে সেটা এসব ঘটনার মধ্যেই নিহিত। দেখুন না মিলিয়ে, এ কথাগুলোর সত্যতা কেমন?

No comments

Powered by Blogger.