মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সীমান্তবাসীর চাওয়া-পাওয়া by ফখরে আলম

মমতাকে আমি চিনতেই পারিনি। আমার সঙ্গে একজন ফটোসাংবাদিক ছিলেন। তিনিও ভুল করেছেন। আর এ কারণে তিনি মমতার কোনো ছবি তুলতে পারেননি। ২০০১ সালের ২১ জানুয়ারি তৃণমূল নেত্রী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অল্প সময়ের জন্য বেনাপোলে এসেছিলেন।


জনকণ্ঠ পত্রিকা থেকে আমাকে স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে। বেনাপোল রেলস্টেশনে অনেক ভিড়। ট্রেন থেকে মমতা নামলেন। চিকন পাড়ের সাদা ইস্ত্রিবিহীন শাড়ি। তাও আবার আটপৌরে করে পরা। শাড়িতে কোনো কুঁচি নেই। পায়ে খুবই সাধারণ দুই ফিতার চটি স্যান্ডেল। টিপও নেই, লিপস্টিকও নেই। জীবনে এমন মন্ত্রী দেখিনি। মন্ত্রী দেখার ভুল হওয়ায় আমি নার্ভাস হয়ে পড়ি। এদিন তিনি পেট্রাপোল-বেনাপোল রুটে প্রথম পণ্যবাহী ট্রেন 'সোনার বাংলা' উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সীমান্তের ওপারে বনগাঁওয়ের পাগলাগারদের মাঠে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে আমি বিনা পাসপোর্টেই ভ্যানে চেপে পাগলাগারদের মাঠে ছুটি। পণ্যবাহী রেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মমতা বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কথাই বলেন। তিনি বলেন, 'ভারত আমার মা। বাংলাদেশ আমার পবিত্র মাটি। পণ্যবাহী ট্রেন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আজ যে সেতু নির্মিত হলো, একদিন এই সেতু কংক্রিটের সেতুতে রূপান্তরিত হবে।' সীমান্তবাসী মমতার সেই কথা মনে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার দখল করার পর এখন অনেকেই দুই দেশের সীমান্ত সমস্যা ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং কলকাতার শিয়ালদহের সঙ্গে বেনাপোলের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের বিষয়টি নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। বেনাপোলের ওপারে বনগাঁও মহকুমার চারটি আসন_বনগাঁও, গাইঘাটা, বাগদা ও গোপালনগর। এ আসনগুলো থেকে মমতার নেতৃত্বাধীন প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন। মমতার নিরঙ্কুশ জয়ের আনন্দধ্বনি এ দেশের সীমান্তেও আছড়ে পড়েছে। জয়ের পরপরই ভারতের পেট্রাপোলের ব্যবসায়ীরা সবুজ আবিরে রাঙিয়ে দিয়েছেন সীমান্তবাসীকে। ব্যবসায়ী শিবু ঘোষ, মিন্টু ঘোষ, প্রদীপ ঘোষসহ অনেকেই পটকা-বাজি ফুটিয়েছেন। রং খেলে আনন্দ উৎসবে সীমান্ত মাতিয়েছেন। শিবু ঘোষ আমাকে বলেছেন, 'মানুষ তাদের অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে। আমরা দরজা খুলে ঘুমাতে পারব। মমতা যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি দুই দেশের যাত্রীদের সুবিধার্থে শিয়ালদহ-বেনাপোল যাত্রীবাহী ট্রেন নিয়ে কথা বলেছেন। প্রতিদিন দুই হাজার পাসপোর্টধারী যাত্রী এ পথে যাতায়াত করে। তাদের নির্বিঘ্ন যাত্রার বিষয়টি দিদির মাথায় আছে।' অন্যদিকে ইন্দো-বাংলাদেশ চেম্বারের সদস্য মতিয়ার রহমান মমতার জয়ের সময় কলকাতায় ছিলেন। তিনি তাঁর জয়ে অংশ নেওয়ার জন্য কর্মী-সমর্থকদের যশোরের ক্ষীরের সন্দেশ খাইয়েছেন। বেনাপোল বন্দর নিয়ে তাঁরও স্বপ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, 'বন্দরে গতিশীলতা ফিরে আসবে। পণ্যবাহী ট্রেন তো চলছেই। এবার যাত্রীবাহী ট্রেনও চলবে।' সীমান্তে মানুষ হত্যা অন্যতম সমস্যা। সীমান্তবাসী মনে করে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এ সমস্যার সমাধান হবে। মাদকপাচার কমবে। পেট্রাপোল-বেনাপোল বন্দরে গতি ফিরে আসবে। দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। বন্দরের উন্নয়নে নিশ্চয় মমতা পদক্ষেপ নেবেন।
গত সেপ্টেম্বর মাসে আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম। তখন নির্বাচনের ঢোল কেবল বেজে উঠেছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক রাহুল গান্ধী ১৪ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মাঠঘাট চষেছেন। তখন অনেকেই বলেছেন, জমি আন্দোলনে সাধারণ মানুষ সিপিএমের সঙ্গে নেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কৃষকের ফসলের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কৃষক নায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না। শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য নন্দীগ্রামে ১৭-১৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এবার সিপিএমের খবর আছে। এ সময় রাহুল গান্ধী এক সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রাজ্যে এখন দুটি বাংলা। একটি হচ্ছে সিপিএমের খুন, সন্ত্রাস, রাহাজানির বাংলা আর অন্যটি হচ্ছে বাঙালির বাংলা। আমরা বাঙালির বাংলাকে ফেরত দিতে চাই। এ জন্য প্রয়োজনে মমতার সঙ্গে জোট করব। পরবর্তী সময়ে তিনি মমতার সঙ্গে জোট বেঁধেছেন এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। জয়ের পর মমতা বলেছেন, এটি মা মাটি মানুষের জয়। দমন-পীড়নের অবসান হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এখন স্বাধীন। মমতা গত শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তাঁর এই শপথের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সীমান্তবাসী ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছে। মমতা যেমন বলেছেন, 'ভারত আমার মা। বাংলাদেশ আমার পবিত্র মাটি', তেমনি সীমান্তবাসীও মনে করে, দুই বাংলা একই। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সীমান্ত ভাগ করা হলেও সীমান্তবাসীর ভাষা, সংস্কৃতি, স্বপ্ন অভিন্ন। আর এ কারণেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী মমতার কাছে সীমান্তবাসীর প্রত্যাশাও অনেক। সেই প্রত্যাশা নিকটতম প্রতিবেশী দুই দেশের মানুষের প্রেম-ভালোবাসা, শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের।
লেখক : কবি, সাংবাদিক
alam_jess61@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.