সময়ের প্রেক্ষিত-এশীয় শতাব্দীর অপেক্ষায় বিশ্ব ও বাংলাদেশের সাফল্য-ব্যর্থতা by মনজুরুল হক

বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশেষ কোনো অঞ্চল কিংবা দেশকে বিশেষ একটি শতকের অগ্রবর্তী দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখার প্রবণতা বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য। অগ্রবর্তী রাষ্ট্রের এ রকম অবস্থানগত সংজ্ঞা গ্রহণযোগ্য হওয়ার পর থেকে প্রায় পুরো সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন আধিপত্য বজায় থাকতে দেখা গেছে।


তবে অর্থনীতির চালিকাশক্তির বিভিন্ন সূচকের মাপকাঠিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ কিছুদিন ধরে রুগ্ণ একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রুগ্ণ যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত কে হতে পারে, তা নিয়ে অনেক দিন থেকেই অর্থনীতিবিদ ও মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা নানা রকম পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন।
আশির দশকের শেষ দিকে জাপানের কথা বলা হলেও জাপানের অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলো অচিরেই দেশটিকে আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত করায় পরবর্তী সময় প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এরপর চীনের দিকে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠা আর্থিক খাতের ত্রুটি যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হতে পারায় দুই প্রার্থীর দুর্বলতা তুলে ধরে। পরবর্তীকালে অবশ্য একক কোনো রাষ্ট্র বা জোটের বদলে বরং বৃহত্তর ভৌগোলিক অবস্থানে বিভিন্ন দেশের জোটবদ্ধ সাফল্যের ওপর বিশেষজ্ঞরা আলোকপাত করতে শুরু করেন এবং সেই বিবেচনায় এশিয়া আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী অগ্রসর দেশগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করা সর্বশেষ আর্থিক সংকটের পর থেকে এশিয়া মহাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আশাবাদী মনোভাব পোষণ করতে শুরু করেছেন। বিগত কয়েক বছরের সেই ধারা সমুন্নত রেখে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে আয়োজিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ৪৪তম বার্ষিক সম্মেলনে ব্যাংকের পক্ষ থেকে এশিয়ার আগামী চার দশকের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, চলতি শতকের মাঝামাঝি সময় এশিয়ার শতাব্দী শুরু হওয়ার সাহসী পূর্বাভাস তাতে দেওয়া হয়। ‘২০৫০ সালে এশিয়া-এশীয় শতাব্দীর বাস্তবায়ন’ শিরোনামের বিস্তারিত সেই দীর্ঘ প্রতিবেদনটি চলতি বছরের আগস্ট মাসে প্রকাশিত হওয়ার আগে এডিবি এখন এর একটি আগাম সংক্ষিপ্ত সংস্করণ হ্যানয়ে আয়োজিত বার্ষিক সম্মেলন সামনে রেখে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিতরণ করেছে। এখানে উল্লেখ করা হয়, চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বার্ষিক এক হাজার ডলার মাথাপিছু আয়ের নিচে অবস্থানকারী দরিদ্র কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এশিয়া মহাদেশে থাকবে না এবং মহাদেশের ৩০০ কোটির বেশি মানুষ সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে সক্ষম হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের করা সেই পূর্বাভাসে ২০৫০ সালে এশিয়ার মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৪০০ কোটির কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে উল্লেখ করা হয়।
কেন এশীয় শতাব্দী, এর একটি ব্যাখ্যাও প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০৫০ সালে এশিয়ার দেশগুলো বিশ্ব্ব অর্থনীতিতে তাদের অংশীদারির হার ২০১০ সালের ২৭ থেকে ৫১ শতাংশে উন্নীত করে নেবে, যে সাফল্য এশিয়াকে প্রায় আড়াই শ বছর পর আবারও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যাবে। উল্লেখ্য, প্রায় আড়াই শ বছর আগে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হওয়ার আগে এশিয়া ছিল বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী অঞ্চল, যেখানে আধিপত্য বিস্তারের বাসনা ইউরোপকে একসময় শিল্প বিপ্লবের পথে নিয়ে যায়।
এডিবির প্রতিবেদনে গত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এশিয়ার দেশগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম বিভাজনে আছে সাতটি দেশ ও ভূখণ্ড—১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেসব দেশ ধরে রাখতে পেরেছে। ব্রুনাই, হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ম্যাকাও, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান সেই বিভাজনে অন্তর্ভুক্ত, যেসব দেশের নাগরিকদের সমন্বিত গড় বার্ষিক আয় বর্তমানে ১৩ হাজার ডলারের কাছাকাছি। দ্বিতীয় বিভাজনে আছে আরও ১১টি দেশ—১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে যেসব দেশ অব্যাহত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে গেলেও এখন তাদেরকে মধ্য আয়ের ফাঁদে পড়ে যাওয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। চীন ও ভারত ছাড়াও ওই দলে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দেশ হচ্ছে—আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, জর্জিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। মধ্য আয়ের ফাঁদ দ্বিতীয় বিভাজনে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি দেশের অগ্রযাত্রাকে লাইনচ্যুত করে দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করে দেওয়া হয়।
মধ্য আয়ের ফাঁদ বলতে সে রকম অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, রপ্তানিমুখী মাঝারি আয়ের কোনো দেশ যখন প্রবৃদ্ধির সংক্ষিপ্ত সময়ের শেষে অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাওয়ার অবস্থায় উপনীত হয় এবং নাগরিকদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়ার মুখে উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানির প্রতিযোগিতায় নিম্ন আয়ের রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার অবস্থান হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে উচ্চ উদ্ভাবনী দক্ষতা অর্জন না করায় অগ্রসর অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়াও এদের পক্ষে সম্ভব হয় না এবং প্রবৃদ্ধির মাপকাঠিতে শেষ পর্যন্ত ক্রমশ এরা পিছিয়ে পড়তে শুরু করে।
এডিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তৃতীয় বিভাজনে আছে এশিয়ার অবশিষ্ট ৩১টি দেশ, তুলনামূলক কম ও নিম্নমাত্রার প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে যেসব দেশ অর্জন করতে পেরেছে। দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাওয়া রাষ্ট্রের তালিকায় এদের অন্তর্ভুক্তি এশিয়ার সমৃদ্ধিকে নিঃসন্দেহে আরও বেশি সংহত করে নিতে সহায়ক হবে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ হচ্ছে তৃতীয় সেই বিভাজনে অন্তর্ভুক্ত একটি দেশ। তবে তালিকার নিচের দিকে দেশের অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও সম্ভাবনার দুয়ার কিন্তু দেশটির জন্য বন্ধ হয়ে যায়নি। সমৃদ্ধ এশিয়া যে সুযোগ অন্য সবার জন্য করে দিচ্ছে, কে তা কতটা কাজে লাগাতে সক্ষম, সাফল্যের ফসল ঘরে তুলতে পারা তার ওপর অনেকটা নির্ভর করবে। এডিবির প্রতিবেদনে এ কারণেই জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণ করা বিভিন্ন কর্মসূচি ছাড়াও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এশিয়ার গত তিন দশকের অভিজ্ঞতা পরিষ্কারভাবেই আঞ্চলিক সহযোগিতার কার্যকারিতার ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরছে, যার সবচেয়ে বলিষ্ঠ দৃষ্টান্ত হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জোট আসিয়ান।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এশীয় অর্থনীতির আগামীর অগ্রযাত্রায় সাতটি দেশ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করবে। দেশগুলো হচ্ছে—চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। এই সাতটি দেশের সমন্বিত জনসংখ্যা এখন ৩১০ কোটি, অন্য হিসাবে যা এশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৭৮ শতাংশ এবং তাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমাণ ১৪ লাখ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি, যা এশিয়ার সব কটি দেশের সমন্বিত জিডিপির ৮৭ শতাংশ। ২০৫০ সালে সাত দেশের জিডিপির অংশীদারি বৃদ্ধি পেয়ে ৯০ শতাংশে দাঁড়াবে। অন্যদিকে তাদের গড় বার্ষিক আয় ২০৫০ সালে হবে ৪৫ হাজার ৮০০ ডলার, যা বিশ্বের গড় আয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।
এশীয় শতাব্দীর সে রকম প্রেক্ষাপটের আলোকে আরও ৩০০ কোটির বেশি এশীয় ২০৫০ সালে সমৃদ্ধির ফসল ভোগ করতে সক্ষম হবে, যে সমৃদ্ধি কেবল চালিকাশক্তির দেশগুলোতেই সীমিত থাকবে না। ফলে প্রথম সারির সাতটি রাষ্ট্রে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হতে না পারাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আগামী দিনে বাংলাদেশ কীভাবে সমৃদ্ধ এশিয়ার ফসল নিজের ঘরে তুলতে পারার পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সাফল্যের অনেকটাই এর ওপর নির্ভর করবে। সেদিক থেকে মধ্য আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা এখন থেকেই নীতিনির্ধারকদের শুরু করা উচিত। কেননা মধ্য আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় যে বাংলাদেশের লাগার কথা নয়, দেশের বিগত দেড় দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার গ্রহণযোগ্য প্রমাণ। তাই দুর্নীতির গোলকধাঁধা থেকে দেশের রাজনীতিকে মুক্ত করতে পারলে আরও অনেক আগেই যে সেখানে আমরা ঠিকই পৌঁছে যেতে পারব, সে রকম প্রত্যাশা মনে হয় মাত্রাতিরিক্ত আশাবাদী শোনাবে না।
হ্যানয়, ৬ মার্চ ২০১১
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.