ঈদের উৎসবে আশিকের পাশে by অজয় দাশগুপ্ত

১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০_২০ মে, ১৯৯৩! তিন বছর, তিন মাস, তিন দিন! একটি শিশুর আয়ুষ্কাল। ওই সময়টি ছিল পিতা-মাতা ও স্বজনদের জন্য বড় কষ্টের। মরণব্যাধি ক্যান্সারে অতি শৈশবেই সে আক্রান্ত হয়। তাকে বাঁচানোর প্রাণান্ত চেষ্টা চলে।


দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আশিক নামের শিশুটি সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আকাশের তারার ভিড়ে মিলিয়ে গেল।
কয়েকদিন আগে গুলশানে সড়কপথে চলতে গিয়ে মুখোমুখি হলাম স্কুল-কলেজে পড়া কয়েকটি ছেলেমেয়ের_ ওরা আশিক ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবী। তারা অর্থ সংগ্রহ করছিল। আশিকের মা সালমা চৌধুরী নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি, এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে যে কারোরই বাঁচার সম্ভাবনা এখনও তেমন নেই। অনেক চিকিৎসক প্রথমেই শুরু করে এ কথা বলে_ ক্যান্সার, নো অ্যান্সার, তারপরও চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। সালমা চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, যেন এ ব্যাধিতে আক্রান্তদের জন্য কিছু একটা করা যায়। পাশে পেলেন অনেককে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে। ঝিকাতলার কাছে ধানমণ্ডি ৩/এ সড়কের ৫২ নম্বর বাড়িতে গেলে দেখবেন আশিক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় একদল শিশু চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা নিচ্ছে। চিকিৎসকরা জানেন, এমনকি অভিভাবক ও স্বজনরাও জানেন_ শিশুরা ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে অপেক্ষা করতে হয় নিষ্ঠুর এক সত্যের জন্য। তারপরও মন মানে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতেই হয়। চিকিৎসা ছাড়াও আক্রান্তদের যতটা সম্ভব হাসি-আনন্দে রাখার জন্য করতে হয় আয়োজন। আশিক ফাউন্ডেশন সে কাজটিই করছে। ঝিকাতলা কেন্দ্রে গেলে দেখা যাবে শিশুরা কেউ খেলছে, কেউ ছবি আঁকছে। সঙ্গে রয়েছে মা কিংবা বোনদের কেউ। তাদের সঙ্গে কথা বললে আপনারও কষ্ট হবে। কী সান্ত্বনা দেবেন তাদের? আপনিও যে চোখের জলে ভেসে যাবেন। তবে আপনার-আমার-সবার কিন্তু কিছু করার আছে তাদের জন্য। ঈদ উৎসব কিংবা শারদীয় দুর্গাপূজা অথবা পরিবারের আনন্দের যে কোনো দিনে আমরা কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আশিক ফাউন্ডেশনের জন্য আপনি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। ঢাকায় তাদের কয়েকটি কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো পরিচালনায় অর্থ দরকার, শিশুদের আনন্দ দেওয়ার জন্য খেলনা ও অন্যান্য উপকরণ দরকার। চিকিৎসক ও নার্সের সেবা দরকার। দেখা যায়, আক্রান্তদের অনেকে বাসার চেয়ে এসব কেন্দ্রে অপেক্ষাকৃত ভালো থাকে। আমরা তো সবাই ওদের জন্য কিছু করতে পারি। শুধু আশিক ফাউন্ডেশন নয়, আরও প্রতিষ্ঠান এ ধরনের সেবামূলক কাজ করছে। আপনি তাদের সহায়তা দিতে পারেন, নিজেও কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন। কেউ গান জানলে তাদের শুনিয়ে আসতে পারেন, ছবি এঁকে বা গল্প বলে ওদের আনন্দ দিতে পারেন। নতুন একটি পোশাক কাউকে পরিয়ে দিতে পারেন। ওদের জীবন হয়তোবা অচিরে ঝরে যাবে, যে জামাটা দেওয়া হলো সেটা হয়তো দ্বিতীয়বার পরাও হবে না; কিন্তু আপনার-আমার জীবনজুড়ে লেগে থাকবে একটু ভালো লাগার পরশ। আশিক ফাউন্ডেশনে সজীব ও সালাহউদ্দিনের এখন কেমোথেরাপি চলছে। মুন্নার দিকে তাকানো যায় না। ওরা কেউ জানে না চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিনব আবিষ্কার কেমোথেরাপির কথা। এর প্রয়োগে অনেক ক্যান্সার রোগীর নিরাময় হয়। আমার এক আত্মীয়া ভারতের মুম্বাইয়ে টাটা ক্যান্সার হাসপাতালে ব্রেস্ট ক্যান্সারের জন্য অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। তারপর নিতে হয়েছে কেমোথেরাপি। এরপর বছরচারেক চলে গেছে। তিনি ভালো আছেন। কিন্তু আরেক আত্মীয়কে বাঁচানো যায়নি। প্রাণবন্ত মানুষটির হঠাৎ করেই ধরা পড়ে ক্যান্সার। সে যে কী যন্ত্রণা! প্রথম কেমোটি দেওয়া হয়, কিন্তু দ্বিতীয়টি তার শরীর গ্রহণ করতে পারেনি। অনেককে কাঁদিয়ে সে বিদায় নেয় অকালে। চিকিৎসকরা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তাকে আনন্দে রাখতে হবে। এ কাজ খুব কঠিন, কিন্তু আমরা তা অবশ্যই করতে পারি।
আশিক ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ক্যান্সার আক্রান্ত সহস্রাধিক শিশুর পাশে দাঁড়িয়েছে_ এ তথ্য আনন্দের। কিন্তু নিষ্ঠুর সত্য কি জানেন, এদের বেশিরভাগের জীবনই ছিল ক্ষণস্থায়ী। অনেকের আন্তরিক চেষ্টাও তাদের জীবন দীর্ঘায়িত করতে পারেনি। তারপরও আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হয়_ মানবতা যে এ শিক্ষাই দেয়। আমাদের কাঁদানোর জন্য নতুন নতুন আশিকরা আসবে, যতদিন না চিকিৎসা বিজ্ঞান এ মরণব্যাধি জয় করতে পারে। ঈদের উৎসবের সময়ে আসুন ওদের জন্য একটু বেশি কিছুই করার চেষ্টা করি। এ সময়ে এসব শিশু এবং তাদের পরিবারের কঠিন সময়ের কথা বলে কারও কষ্ট বাড়ানোর জন্য এ লেখা নয়, তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি যে ওদের জন্য কিছু করলে মনে প্রশান্তি আসবেই।
ajoydg@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.