যে আঁধার আলোর অধিক by সানাউল হক খান

এখন আমার নিজের কথাগুলোই উচ্চারিত হচ্ছে অবচেতন মনে, ঘুরেফিরে, বারবার:
‘ঘৃণা বলছে চিৎকার করে—ভালোবাসা, ও হে ভালোবাসা,
আমার বিজয় এই একবিংশেই
তুমি কার মুখপানে চেয়ে থাকবে অনন্তকাল?
‘...সত্যের কারাগারে তুমি এমনই একাকী বন্দী
বুঝতে হবে (তোমাকে) অসত্যের দুরভিসন্ধি!

‘...কিছু কিছু সময় কথা কেড়ে নেয়
কোনো কালে যা বলতে চাইনি
কিছু কিছু সময় কাছে ডেকেছিল
‘অসময়’ ভেবে শুনতে যাইনি:

এবং...
আরও কত কথা!
ক্রিকেট নিয়ে সন্দেহের চোরকাঁটা অনেক বিঁধিয়েছি। বিনিময়ে পেয়েছি আহ্লাদের আবদার-মেশানো বিবাদপ্রতীম বন্ধুদের অভিমানী আক্রোশ! আরও কত কিছুই-না। সম্ভবত ক্রিকেটের কানামাছি কিংবা অনিশ্চয়তার গৌরব-কৌতুক কম বুঝি বলেই আমাকে অনেকেই নেক নজরে দেখেন না। আমার এই আত্মদহনের মধ্যে কিছু মিথ্যে লেগে আছে। কারণ, আমার অবলোকন আর ক্রীড়া-বিবেকের পৃথক একটা ময়দানি ব্যাকরণ আমি সব সময় বয়ে বেড়াই।

দুই
‘কল্লোল যুগ’-এর অন্যতম এক কবি তাঁর এক কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করেছিলেন যে আঁধার আলোর অধিক। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ক্রিকেটে এ দেশীয় সন্তানদের প্রদর্শনী তথা চূড়ান্ত খেলায় ওদের পরাজয়টা বহু অর্থেই বিজয়ের অধিক। ফাইনালের ফলাফলে যে দুজন দর্শক অভিমানে আত্মাহুতি দিল, তাদের উদ্দেশে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ব্যতিরেকে আমাদের করার তো কিছুই নেই। ওরা বুঝল না, বঙ্গশার্দুলেরা তুলেছিল ভয়ংকর থাবা, যা দেখে বিশ্ব ক্রিকেটের তাবৎ দর্শকপ্রেমী একযোগে জঁপেছিল নীরব মন্ত্র: মারহাবা! মারহাবা!!
স্বয়ং পাকিস্তান অধিনায়ক করাচি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের দিকে নির্ভীক দৃষ্টিতে চোখ রেখে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ভেতরে ভেতরে এতটাই এগিয়েছে, জানতাম না; জানলেও কিছু করার ছিল না।’ সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি নাকি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন: ‘...এ তো বাংলাদেশ নয়, যেন ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই খেলছি। ভাবতে আনন্দ পাই—আমি যেন ওদেরই একজন।’
এটা হাড়ে হাড়ে সত্য যে ড্রেসিংরুমে হোয়াটমোরের (পাকিস্তানের কোচ) গোঁফসুদ্ধ বিশাল চেহারাটা ষাটের দশকের ফুটবলের মতো লেবু আর চর্বিহীন মনে হচ্ছিল। ম্যাচের লেজের দিকে এসে ওদের অনেককেই দেখতে খুব ফ্যাকাশে লাগছিল। কেউ কেউ দাঁত দিয়ে নখ তো বটেই, আঙুলগুলোই কামড়াচ্ছিলেন: পরাজয়ের তসবিহ গুনতে গুনতে রুমালে গলা ও কপাল মোছার এই দৃশ্য দেখে আমি ভাবছিলাম, এই বুঝি বিদ্যুৎ চলে যায়। আর পঙিক্ত কাটছিলাম:
‘জবা’র মুকুট-পরা ঝোপঝাড়ে জোনাকি-ঝরোকা
ফুল-মুকুলের দশদিগন্তে বিহঙ্গ সারিবদ্ধ বাংলাদেশ
মাটি ধবতেই ভেসে আসে প্রিয় মহিলার রত্নগর্ভ-হাসি

‘...আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’

তিন
আহ্, যদি শাহাদাত শেষ উনিশটি রান না দিত
যদি সাকিব আর একটি ওভার...
যদি তামিম আর একটি-দুটি শট খেলত
যদি মুশফিক আর নাসির একটি করে শট মারত
তাহলে কি ঘুচত না দুটি রানের ব্যবধান!

—আমার সাফ জবাব,
না। ‘যদি’ নামের মায়াবী শব্দটি মুছে ফেলে মাঠে নামুন।
দেখবেন, সব ‘যদি’র গদিতে, আগুন লাগে একসাথে;
বাংরেজরা যতই বলুন:

ইট শুড হ্যাভ বিন...
ইট মাইট হ্যাভ বিন...
ইট কুড হ্যাভ বিন...
ইট উড হ্যাভ বিন...

পরিসংখ্যানের পক্ষেই শুধু পাকিস্তান
ম্যাচের গল্পসুদ্ধ বাদবাকি সবকিছুতেই বাংলাদেশ!

No comments

Powered by Blogger.