বিশ্বনাথে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন নিহত

বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বিএনপির ডাকা হরতালের দিন সিলেটে দুজন নিহত এবং চার পুলিশসহ অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী ও বিএনপির নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার ইলিয়াস আলীর এলাকার শত শত লোক সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় বিক্ষোভের জন্য জড়ো হলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে।


দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কয়েক দফায় এ সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ পাঁচ শতাধিক কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট এবং অন্তত ৫০টি গুলি ছোড়ে।
আহতদের মধ্যে যাঁরা ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন বিশ্বনাথ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) চান মিয়া, কনস্টেবল ফারুক, জামাল, নায়েক সাধন চাকমা, যুবলীগ নেতা আজির হোসেন (২৮), সাহেল (২৫), আবদুল হালিম (২৫), গ্রামবাসী জাকির হোসেন (৩০) ও ফয়জুল ইসলাম জালাল। অন্যদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।
বিশ্বনাথে প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও আমাদের স্থানীয় সংবাদদাতা মোহাম্মদ আলী শিপন। বিক্ষুব্ধ জনতা উপজেলা প্রশাসন ভবন, ইউএনওর গাড়িতে এবং কয়েকটি টং দোকান ও মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
রাজধানীতে দ্বিতীয় দিনের হরতালেও পুলিশ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে রাখে। নগরে হরতাল পালিত হয় ঢিলেঢালাভাবে। কোথাও বড় কোনো সহিংসতা ঘটেনি। রাজধানীতে বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে সেলিমা রহমানসহ ১০ জনকে কোর্টে হাজির করা হলে আদালত তাঁদের কেন্দ্রীয় কারগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আজ জামিনের শুনানি হবে।
রাজশাহীতে পিকেটাররা অন্তত পাঁচটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। সংঘর্ষে আহত হয় অন্তত ২০ জন। চট্টগ্রাম সংঘর্ষে ৩০ জন আহত এবং বিএনপির ৩৩ জন নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়। আহতদের মধ্যে কোতোয়ালি থানার ওসি রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। নগরীর বেশ কয়েকটি স্থানে হরতালের সমর্থনে ২০টি যানবাহন ভাঙচুর করে পিকেটাররা। গাড়ি ভাঙচুরের অপরাধে নগর মহিলা দলের দুই কর্মীকে এক দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সিলেটের কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
আমাদের স্থানীয় অফিস, নিজস্ব প্র্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সিলেট অফিস জানায়, বিশ্বনাথে নিহত দুজনের মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁর নাম মনোয়ার হোসেন (২৭)। তিনি উপজেলার রাজনগর গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে এবং বিশ্বনাথ ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি। তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। বর্তমানে ছুটি নিয়ে দেশে অবস্থান করছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। অন্য নিহত ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি। দুটি মরদেহই ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে।
ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সিলেটে তৃতীয় দিনের মতো হরতাল চলাকালে বিশ্বনাথ উপজেলা সদরে পুলিশের সঙ্গে এই সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় গোটা উপজেলা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ পাঁচ শতাধিক রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেও জনতাকে সামাল দিতে পারেনি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে বিএনপির পাশাপাশি সাধারণ মানুষও অংশ নেয়।
রণক্ষেত্র বিশ্বনাথ : গতকাল ইলিয়াস আলীর নিজ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে বিএনপি, এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ উপজেলা সদরের প্রবেশপথগুলোতে অবস্থান নেয়। দুপুর ২টার দিকে পৃথক দুটি রাস্তা দিয়ে দুটি বিশাল মিছিল উপজেলা সদরে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। রামপাশা সড়ক দিয়ে ইলিয়াস আলীর নিজ গ্রাম রামধানাসহ পাশের গ্রাম জানাইয়া ও আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মিছিলটি সেবা সেন্টারের সামনে আসামাত্র পুলিশ বাধা দেয়। মিছিলকারীদের হটাতে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে এবং নির্বিচারে লাঠিপেটা শুরু করে। মিছিলকারীরাও লাঠিসোঁটা নিয়ে পুলিশের ওপর পাল্টা হামলা চালালে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এরই মধ্যে স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অর্ধশত কর্মী পুলিশের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ইলিয়াস আলীর সমর্থকদের ওপর চড়াও হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে সংঘর্ষের মাত্রা। একপর্যায়ে শুরু হয় গুলি। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এর কিছুক্ষণ পর মনোয়ারের লাশ উপজেলা সদরের বাসিয়া ব্রিজের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। আর অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশটি পড়ে ছিল স্থানীয় মাদ্রাসার সামনে। সেখান থেকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এর পরপরই উপজেলা পরিষদের সামনে পুলিশের সঙ্গে ইলিয়াস আলীর সমর্থক আরেকটি গ্রুপের সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে গোটা উপজেলা সদরে বিক্ষিপ্তভাবে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। থেমে থেমে এই সংঘর্ষ চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এ সময় গোটা বিশ্বনাথ বাজার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, একপর্যায়ে পুলিশের রাবার বুলেট শেষ হয়ে গেলে তারা দৌড়ে থানার ভেতরে চলে যায়।
ইলিয়াস আলীর সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পুলিশ সদস্যরা থানায় ঢুকে গেলে জনতা থানা ঘেরাও করে এবং সামনের রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় আতঙ্কিত এক পুলিশ সদস্য প্রাণভয়ে বাসিয়া নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কচুরিপানায় ঠাসা নদীতে ওই পুলিশ সদস্য যখন হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, ছুটে যান উপস্থিত ফটোসাংবাদিকরা। উদ্ধার করেন ওই পুলিশ সদস্যকে। সাধন চাকমা নামের ওই পুলিশ সদস্যকে পরে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বিক্ষুব্ধ জনতা উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ি, দুটি মোটরসাইকেল, ভবনের সমবায় কর্মকর্তা ও মৎস্য কর্মকর্তার কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে গাড়ি ভস্মীভূত হয় এবং দুটি কক্ষের আসবাবপত্র পুড়ে যায়। আগুনে মৎস্য কর্মকর্তা নির্মল চন্দ্র বণিক ও সমবায় কর্মকর্তা আবুল কাশেম ভুঁইয়া আহত হন। তাঁদের উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সংঘর্ষের পর খবর পেয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেইনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিশ্বনাথে যান। সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গোটা উপজেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উপজেলা সদর জনশূন্য ছিল। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা পুলিশি গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছেন।
সিলেটের পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেইন কালের কণ্ঠকে বলেন, একদল থানা আক্রমণ করার চেষ্টা চালালে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এর পরই সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ পাঁচ শতাধিক টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট এবং ৫০টি গুলি ছোড়ে বলে তিনি তথ্য দেন। তবে এখন সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে তিনি জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ছোড়া শুরু করার পরই একপর্যায়ে দুজন গুলিবিদ্ধ হন বলে ঘটনাক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়। তবে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের গুলিতে নিহত হওয়ার বিষয়টি কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকার করেননি। এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী লোকজন দাবি করছে, পুলিশের পাশাপাশি হরতালবিরোধী কিছু যুবকও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তাদের কারো কারো হাতে দেশি অস্ত্র দেখা গেছে।
ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী এলাকায় যাচ্ছেন না। নিখোঁজ হওয়ার ছয় ঘণ্টার মাথায় ইলিয়াস আলীর বিরুদ্ধে থানায় আওয়ামী লীগের এক নেতার দায়ের করা দুটি মামলার ঘটনায় এলাকাবাসী তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ রয়েছেন। এ অবস্থায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ রবিবার রাতে সভা করে হরতালের সময় হরতালবিরোধী সমাবেশ আহ্বান করে এবং যেকোনো মূল্যে সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরীকে নিয়ে সমাবেশ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। গতকাল এই সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। শফিকুর রহমান বিশ্বনাথে আসছেন এবং হরতালবিরোধী সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন- এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির পাশাপাশি সাধারণ মানুষও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরই জের ধরে সাধারণ মানুষ গতকাল রাস্তায় নেমে পড়ে বলে জানা যায়।
বিএনপি কার্যালয় ফের অবরুদ্ধ : দ্বিতীয় দিনের হরতালেও রাজধানীতে বড় কোনো ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় আগের দিনের মতোই পুলিশ অবরুদ্ধ করে রাখে। ফলে কার্যালয়ে ঢোকার পর আর কেউ বেরোতে পারেননি।
সকাল ৯টার দিকে মহাখালী, বনানী ও গুলশান এলাকায় হরতালের সমর্থনে নেতা-কর্মীরা রাস্তায় নামলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় মহাখালী থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সুলতানা আহমদসহ ১২ জনকে আটক করে পুলিশ। সকাল ১১টায় টিভি গেট এলাকায় যুবদল উত্তরের ব্যানারে একটি ছোট মিছিল বের হওয়ার চেষ্টাকালে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় হরতাল সমর্থনকারীরা একটি গলিতে ঢুকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। তবে হরতালের বিপক্ষে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, প্রজন্ম লীগ, হকার্স লীগ, ওয়ার্ড আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মী মহাখালী, বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ী ও তিতুমীর কলেজের সামনে থেকে টিভিগেট গাউছুল আজম মসজিদ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এদিকে মোহাম্মদপুরে রিং রোডে যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নেতৃত্বে মিছিল বের হলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় তিনজনকে আটক করা হয় বলে বিএনপি থেকে অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মিছিল করার চেষ্টা করে বিএনপি ও ছাত্রদলের ১৫ নেতা-কর্মী আটক হন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে হরতালের সমর্থনে মিছিল করেন বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, হেলাল উদ্দিন মোল্লা প্রমুখ। তাঁরা ১২ ঘণ্টার মধ্যে ইলিয়াস আলীকে ফেরত দেওয়ার দাবি করেন।
জজকোর্ট এলাকায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা মিছিল বের করলে পুলিশ বাধা দেয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা দুই দফা মিছিল করেন। দুপুর ১২টার দিকে জেলা পরিষদের কার্যালয়ের সামনে দুটি ককটেল ও দুপুর পৌনে ২টার দিকে নবাবপুর রোডের রায়সাহেব বাজার মসজিদের কাছে আরো একটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটলে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওয়ারী থানা পুলিশ জানায়, সকাল ১১টার দিকে টিপু সুলতান রোড এলাকায় হরতাল সমর্থকরা একটি সিএনজি অটোরিকশা পুড়িয়ে দেয়।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে সিএমএম কোর্টের সামনে থেকে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাসারের ছেলে মাহবুব হোসেন রিঙ্কু, তাঁর বন্ধু সুজন, এনামুলসহ অন্য আরেকজনকে আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
রবিবারের ধরপাকড়ের পর গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হরতাল সমর্থক নেতা-কর্মীদের তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রায়সাহেব বাজার, সদরঘাট ও আদালতপাড়া এলাকায় হরতালবিরোধী মিছিল করেন।
সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী থেকে দূরপাল্লার বাস না ছাড়লেও রাজধানীতে যাত্রীবাহী বাস, টেম্পো, সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা বেশি ছিল। তবে ট্রেন, বিমান ও লঞ্চ চলাচলে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি বলে জানা যায়।
রাজশাহী অফিস জানায়, সকালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুর নেতৃত্বে একটি মিছিল জেলা মৎস্য ভবনের সামনে এসে পৌঁছালে পুলিশ হঠাৎ লাঠিপেটা শুরু করে। চলে পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সহিংসতা চলাকালে যুবদলের আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, পুলিশ কনস্টেবল আতাউর রহমানসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
এ ছাড়া সকাল ১০টার দিকে জেলা বিএনপির সভাপতি নাদিম মোস্তফার নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি মিছিল রাজশাহী কলেজের দিকে যাওয়ার পথে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হয়। এতে নাফিস নামের এক ছাত্রদলকর্মীসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন।
দুপুর ১২টার দিকে নগরীর সবজিপাড়া এলাকায় পিকেটাররা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালালে সংঘর্ষ বাধে- যা প্রায় ২০ মিনিট চলে। পরে পুলিশ কয়েকটি টিয়ার শেল ও শটগানের গুলি নিক্ষেপ করে পিকেটারদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এখানে ছাত্রদলের অন্তত পাঁচজন আহত হন এবং পুলিশ তিনজনকে আটক করে।
বোয়ালিয়া থানার ওসি খান মোহাম্মদ শাহরিয়ার জানান, রবিবার সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বোয়ালিয়া থানায় পৃথক দুটি মামলা করেছে। মামলায় মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলসহ ১৮৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সিলেট অফিস জানায়, গতকাল পুলিশ বিএনপি নেতা-কর্মীদের রাস্তায় জড়ো হতে দেয়নি। বিএনপির অভিযোগ- কোর্ট পয়েন্ট, শহীদ মিনার, রংমহল পয়েন্ট; কোথাও তাদের দাঁড়াতে দেয়নি পুলিশ। হরতাল চলাকালে নগরের কুমারপাড়া, মালনীছড়া, উপশহর ও বালুচরে চারটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয় বলে জানা গেছে।
কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিরা সিলেট অফিসকে জানান, জেলার জকিগঞ্জ উপজেলা সদরে সকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ২২ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আওয়ামী লীগ হরতালের বিরুদ্ধে মিছিল বের করলে উপজেলা ফটকের সামনে দুই পক্ষে সংঘর্ষ হয়।
এ ছাড়া কানাইঘাটে বিএনপির মিছিল থেকে স্থানীয় বাসস্ট্যান্ডে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করলে আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগ পাল্টা মিছিল বের করে। এরপর সংঘর্ষ বাধলে ১০ জন আহত হয়।
চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, লালখান বাজার এলাকায় বিএনপিকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। এখান থেকে পুলিশ সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও নগর মহিলা দলের সভানেত্রী মনোয়ারা বেগম মনি, যুগ্ম সম্পাদিকা জেসমিন খানমসহ ১০ কর্মীকে আটক করে। দুপুর ১২টার দিকে নগর বিএনপি কার্যালয়ের সামনে মিছিলে বাধা দেওয়া নিয়ে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে পুলিশসহ ১০ জন আহত হয়। এখান থেকে ১০ কর্মীকে আটক করা হয়। এ ছাড়া নগরের বাকলিয়া থানার কালামিয়া বাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলে বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ২১ বিএনপি নেতা-কর্মীকে আটক করে পুলিশ।
বিকেলে কাজীর দেউড়ী এলাকায় নগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। আরো বক্তব্য দেন সাবেক হুইপ ওহিদুল আলম, নগর বিএনপি নেতা এ এম নাজিম উদ্দিন, আবু সুফিয়ান, শামসুল আলম, ডা. শাহাদাৎ হোসেন প্রমুখ।
উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, উখিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া কঙ্লাইন সার্ভিসের একটি মিনিবাস গতকাল বিকেলে হাসপাতাল সড়কে পিকেটারদের হামলার শিকার হয়। এতে রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ও আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল গফুর (৪৫), হাছন আলী (৪০), চালক নূর মোহাম্মদ বাদশাসহ (৩৫) চারজন আহত হন। ইউপি সদস্য ও হাছন আলীর জখম বেশি হওয়ায় এলাকাবাসী তাঁদের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করে। আবদুল গফুরের অভিযোগ, উখিয়া বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার জাহান চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী, ছাত্রদল নেতা ফয়সাল সিকদারের নেতৃত্বে ১০-১৫ জন সশস্ত্র ক্যাডার গাড়িতে হামলা চালায়।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে কোটবাজার এলাকায় কক্সবাজারমুখী একটি মাইক্রোবাসে পিকেটাররা ভাঙচুর চালায়। এতে দুজন আহত হয়। উখিয়া থানার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় যুবদল ক্যাডার পশ্চিম রত্না গ্রামের আবদুল গফুর (২৫), মোহাম্মদ শাহজাহান (২৮), সাহাব উদ্দিন (৩০) ও মোহাম্মদ গফুরের (৩৫) নেতৃত্বে সাত-আট যুবক এ হামলা চালায়। এ ঘটনায় পশ্চিম রত্না গ্রামের মৃত এজাহার মিয়ার ছেলে আবদুল গফুরকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে হরতাল চলাকালে গতকাল সকাল ১১টার দিকে বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্সের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। কিন্তু পুলিশের বাধায় মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। তখন প্রিন্সকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের ধস্তাধস্তি হয়। এ ছাড়া গতকাল সকালে সংসদ ভবনের দক্ষিণ পাশে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। পুলিশ বাধা দিয়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
৪১ জন গ্রেপ্তার : গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে মতিঝিল থেকে দুজন, কোতোয়ালি থেকে ১০ জন, পল্টন থেকে ১২ জন, উত্তরা থেকে দুজন, শাহবাগ থেকে একজন, ডেমরা থেকে দুজন এবং বনানী থেকে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গোয়েন্দা পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে সাতটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়।
এদিকে হরতালকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফকিরাপুলে পুলিশের ভ্যানে এবং রাত ৯টায় উত্তরায় সি-শেল রেস্টুরেন্টের সামনে কণক পরিবহনের একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানায়।

No comments

Powered by Blogger.