গোধূলির ছায়াপথে-যখন ফুল ফুটবে by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

কখন ফুল ফুটবে কেউ জানে না। পরিচিত পৃথিবীর অপরিচিতজনেরা সারা দিন অন্বেষণে। দেখলেই জিজ্ঞেস করেন, দেখা পেয়েছেন? উত্তর না পেয়ে বলেন, আর কত দিন ধরে গুরু খুঁজব? দিনই তো শেষ। তরুণ বয়স থেকে মেলায় মেলায় ঘুরে বেড়াই। কিছু অভিজ্ঞতার কথা আজ বলব, বলার সুযোগও আর বেশি দিন নেই।


খানিকটা বলেছি ‘সুরেশ্বরে সুরের মেলায়’, ৪০ বছর আগে, ফরিদপুরে পদ্মা নদীর পারে সুরেশ্বরে গানের আসরের শেষে একজন ধূলিধূসরিত ব্যক্তি আমাকে জড়িয়ে ধরেন, তারপর ছেড়ে দিয়ে হাওয়া। নিমকরলী বাবার সঙ্গেও আমার কোনো দিন দেখা হবে ভাবিনি। রামকৃষ্ণের একটি কথা উদিত হচ্ছিল সেদিন: ‘যখন ফুল ফোটে, মৌমাছিরা আসবেই, কেউ বাধা দিতে পারে না।’
ভাবছিলাম, ভালোবাসার ফুল ফুটলে আপনা থেকেই বাবা এসে দেখা দেবেন। ঠিক তাই। গাইছিলাম গুনগুন করে, ‘তাই কি তারার মৌমাছিরা, গুনগুনিয়ে আসে...’। কাঠমান্ডুর বড় বইয়ের দোকানে প্রবেশ করতেই আমার দিকে তাকিয়ে, নিমকরলী বাবা। দেহগত মৃত্যু হয়েছে, মহাপ্রাণের মৃত্যু নেই; যার সঙ্গে দেখা হওয়ার ঠিক তার সময়ে এসে আবির্ভূত। সাদা খোঁচা দাড়ি, সামনের দাঁত একটাও নেই; সব সময় খালি গায়ে, হাঁটু পর্যন্ত ওঠানো একটি সাদা ধুতি, লম্বা দেহখানি শীতে ভারী কম্বল দিয়ে জড়ানো। জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। ওইটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট। বুঝলাম, এমন একজনকে জড়িয়ে ধরেছি, যিনি আমাকে ভালোবাসেন, সমস্ত মানবমণ্ডলীকে ভালোবাসেন, যে ভালোবাসে তাকে অন্বেষণ করেন, আমি তাঁকে ভালোবাসি বলেই আমাকে আলিঙ্গন করেছেন।
করলীবাবা একজন সিদ্ধ পুরুষ। উত্তর ভারতে সবাই তাঁকে চেনেন। কোনো জীবনীগ্রন্থ নেই। তাঁর সম্বন্ধে জানা যায় সামান্যই, গল্প অনেক। নানা নামে পরিচিত তিনি। যেমন অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর আবির্ভাব, তেমনি তাঁর মিলিয়ে যাওয়া। পাশ্চাত্যে শত গবেষক তাঁদের মতো মহাত্মাদের পেছনে, কেউ গেরুয়া ধরেছেন, কেউ খড়ম, কেউ লোটা, কেউ খাতা-পেনসিল নিয়ে ঘুরে ফিরছেন তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি খবর সংগ্রহ করতে। কিন্তু মহারাজারা এত ছদ্মবেশে যে এঁদের খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ভাঁড়ের চা খাচ্ছেন, ছোট ছোট কথায় হা-হু করছেন, রসিকতা করছেন, সবই করছেন। এর মধ্যেই এমন কিছু করছেন যা এ পৃথিবী ছাড়িয়ে, তাই মর্ত্যবাসীরা সুযোগ পেলেই তাঁদের আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। তাঁকে নিয়ে বই লিখেছেন রামদাস ৪০০ পৃষ্ঠার, যার প্রতি পৃষ্ঠায় বিস্ময়; আর আমাকে তাঁর বইটি হাতে দিয়েই করলীবাবার অন্তর্ধান। যখন বইটি পড়া শেষ, অনেক দূর থেকে মুচকি মুচকি হেসে বলছেন, যেহেতু বইটি তুমি পড়েছ, আমাকে কোনো দিন ভুলতে পারবে না।
তাঁর সম্বন্ধে কিছু জানি, যা ছোট পাতায় ভরবে না। গ্রন্থ রচনা হলে পাঠক পাওয়া যাবে না; পাঠক পাওয়া গেলেও বিশ্বাস হবে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘যে আমাকে বিশ্বাস করে না, সে আমার গান শুনে মজা পাবে না, আমার সুরে তার চোখে পানি আসবে না, আমার গ্রন্থ তার জন্যে নয়।’ ঠিক তাই। করলীবাবা শুধু কয়েকজন পাগলের জন্য, যারা তাঁকে বিশ্বাস করে ভক্তি করে। লিখছি তাঁর সম্পর্কে সংক্ষেপে দু-একটি বাক্য।
মহারাজাকে জিজ্ঞেস করা হলো, সাধনা কী? তিনি বললেন, মানবের উপকারই আনতে পারবে সত্যিকারের নির্বাণ। ধ্যানেরও প্রয়োজন নেই, নেই পূজারও। কর্মই ঈশ্বরোপাসনা। মন সব সময় ব্যস্ত থাকবে কর্মে? তাহলে ঈশ্বর পাব কোথায়? উত্তর: মানবসেবায়।
মহারাজজি, আমার অন্তর কীভাবে আলোকিত হবে?
: কিছু লোককে খাওয়াও।
মহারাজজি, আমার ‘কুণ্ডলিনী’কে কীভাবে উত্থিত করব?
: মানুষের সেবা করো। মানুষকে খাওয়াও।
মহারাজজি বললেন, একা থাকো। লোকালয় অপছন্দ করা শেখো।
কী মন্ত্র পাঠ করব?
: মন ঘুরে বেড়ায়, মনটাকে বসাতে পারো না। যেকোনো মন্ত্র ব্যবহার করো, তাতেই চলবে।
যখন তোমার সঙ্গে দেখা হয়, তুমি বলো ‘যাও’, ‘যাও’, ‘চলে যাও’। এ রকমটি কেন করো?
: এর কারণ হচ্ছে, যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে তার প্রতিও আমি আকৃষ্ট, তাই তাকেও তাড়াতাড়ি বিদায় করি। অথচ যে আমার দৃষ্টিতে এসেছে, সে কোনো দিন আমার দৃষ্টির বাইরে নয়।
যিনি গুরু হবেন, তিনি তোমার সব জানবেন। কিছুই বাদ নয়। যিনি মহারাজজিকে মাত্র এক ঝলক দেখেছেন, আর যিনি ২৫ বছর ধরে দেখছেন, এঁদের মধ্যে কোনো তফাত ছিল না।
বিবাহিতদের জন্য ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করা কষ্টসাপেক্ষ। কারণ, বিবাহ মানুষের অনেকখানি অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সে কারণেই তাদের জন্য প্রয়োজন আরও অনেক বেশি ঐকান্তিকতা ও নিয়মানুবর্তিতা। একজন ভক্ত সারা দিন বিড়াল নিয়ে খেলছেন। মহারাজজি বললেন, বিড়ালের সঙ্গে এতখানি সংলগ্নতা কমিয়ে দাও।
মোহ পথের সবচেয়ে বড় বাধা। মৃত্যুর আগে যখন আম খেতে ইচ্ছে করে, তখন আমই পাবে। তোমার পুনর্জন্ম হবে পতঙ্গ হিসেবে। শেষনিঃশ্বাসেও যদি মনুষ্যজন্ম চাও, তা-ই পাবে। মাটির বাসন পোড়ানো না হলে আবার ব্যবহার করা যায়। আর পোড়ানো হলে একটুতেই ভেঙে যায়, আর ব্যবহার করা যায় না, ফেলে দিতে হয়। কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ তোমার হূদয়টা পুড়িয়ে ফেলল। এখন এটি হবে অব্যবহারযোগ্য, নরকের উপযোগী। ঈশ্বরকে দেখতে হলে কামনাকে ঝেড়ে ফেলো মন থেকে। কোনো কিছু পেতে ইচ্ছা কোরো, তখন তার দিকে ধাবিত না হলে সে ইচ্ছা নির্বাপিত হবে। ধরো, চা পান করতে চাইছ, যদি তা না খোঁজ, ইচ্ছাটা মরে যাবে। সাধু ও পাখি যেন একই বৃন্তের দুই পত্র। কোনো কিছু সঞ্চয় করে না তারা, যা কিছু সামনে বিলিয়ে দেয়। পৃথিবীটাই মোহ। সর্বদাই আশঙ্কার মধ্যে, কারণ তুমি পৃথিবীর মোহে আচ্ছন্ন।
পথে পথে ফিরছি। সুরেশ্বরে যে পাগল আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল, আমার এখন সন্দেহ হচ্ছে উনি নিমকরলী বাবা। নৈনিতালের কৈঞ্চিতে আমার মন ঘুরে বেড়ায়, শ্রীকৈঞ্চির মন্দির ও আশ্রম। হনুমান ফাউন্ডেশন গল্পগুলো একীভূত করেছে। গল্পগুলো সংগ্রহ করার অপেক্ষায়।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সাহিত্য-সংগীত পথিক।
mabbasi@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.