কালের পুরাণ-সাংবাদিকেরা সত্য-মিথ্যা বলছেন, লিখছেন? by সোহরাব হাসান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি অন্তত স্বীকার করেছেন সাংবাদিকেরা মিথ্যার সঙ্গে কিছু সত্যও বলছেন, লিখছেন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছেন, ‘পত্রিকা ও টেলিভিশনগুলো এখন সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে যা ইচ্ছা বলছে (এবং লিখছেও) আমরা তো কিচ্ছু বলছি না।


বিএনপির সময় আপনারা তো এটা পারতেন না। আমরা জানি, আমার সাংবাদিক বন্ধুরা তা ভুলে যাননি।’ (প্রথম আলো, ৩০ মার্চ ২০১২)।
আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের বদ্ধমূল ধারণা, সাংবাদিকেরা শুধু সরকারের পেছনে লাগেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালান, সাংবাদিকেরা কখনোই সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেন না এবং সরকারের ছোট্ট ভুলকে বড্ড বড় করে দেখেন এবং মাঝেমধ্যে বিরোধী দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত হন।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিকদের সম্পর্কে জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখতে চাই। তিনি অন্তত স্বীকার করছেন, সাংবাদিকেরা কেবল মিছা কথা লেখেন না, মিছা কথার পাশাপাশি কিছু কিছু হাছা কথাও লেখেন।
একই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুনে বা পত্রিকায় পড়ে কিছুটা খটকাও লাগে। প্রধানমন্ত্রী যে মাপকাঠিতে সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করছেন, তা কি সব সময় অপরিবর্তিত থাকে? রাজনীতিকদের অবস্থানের কারণে কি তা বদলে যায় না? তিনি আজ যে দৃষ্টিভঙ্গিতে সত্যকে দেখছেন, বিরোধী দলে গেলেও কি সেটি দেখবেন?
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধীদলীয় সাংসদেরা নিজেদের বেতন-ভাতা এবং পদ-পদবি রক্ষা করতেই সংসদে এসেছিলেন। খুবই খাঁটি কথা। না হয় তিন দিন সংসদে শোরগোল তুলে তাঁরা লাপাত্তা হয়ে যাবেন কেন?
কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যে ভাষায় আজ বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে এই কথাগুলো বলছেন, বিএনপি আমলে প্রায় একই ভাষায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আপনার ও আপনার দল সম্পর্কেও বলতেন। এখন যদি বেতন-ভাতা ও পদ-পদবি টিকিয়ে রাখার জন্য সংসদে যাওয়া কবিরা গুনাহ হয়ে থাকে, তখনো তা কবিরাহ গুনাহ ছিল।
সাংবাদিকদের চ্যালেঞ্জ হলো, তাঁরা তখনো যেটি সত্য মনে করেছেন—বলেছেন, লিখেছেন এবং এখনো লিখছেন ও বলছেন। তখনো তাঁরা লাগাতার সংসদ বর্জনের সমালোচনা করতেন, এখনো করছেন। তখন যাঁরা বিরোধী দলে ছিলেন, সেই সমালোচনা তাঁরা পছন্দ করতেন না, এখনো যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, তাঁদেরও ভীষণ অপছন্দ।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সাংবাদিকেরা বিএনপি আমলে সত্য লিখতে পারেননি। সত্য লেখার ভয় বা ঝুঁকি কি শুধু বিএনপি আমলেই ছিল? অন্য আমলে কি কোনো ঝুঁকি ছিল না? এখন নেই? আমাদের দেশে সব আমলেই সাংবাদিকেরা ঝুঁকিতে থাকেন, আছেন। আর সেই ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা লেখেন, শাসকসহ বিভিন্ন ক্ষমতাধরের চোখ রাঙানি সহ্য করেন।
বিএনপি আমলে সত্যি কি সাংবাদিকেরা কিছু লেখেননি? তাহলে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা-মামলার খবর দেশের ও দেশের বাইরের মানুষ কীভাবে জানল? কীভাবে জানল জঙ্গিদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার কথা, কীভাবে জানল হাওয়া ভবনের নানা দুষ্কর্মের কথা? কীভাবে জানল হরতালের সময় বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মী, বিশেষ করে নারীকর্মীদের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতনের কথা? সেই ছবি ও রিপোর্ট কি কোনো কাগজ ছাপেনি? অবশ্যই ছেপেছে এবং সরকারের বিরাগভাজন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চাইলে পুরোনো পত্রিকার ফাইলগুলো একবার দেখে নিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বিএনপি আমলে সাংবাদিক হত্যার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তখন সাংবাদিকেরা আন্দোলন করেননি, এখন করছেন। সাংবাদিকেরা তখন আন্দোলন করেননি, এ কথা ঠিক নয়। কেবল আন্দোলন নয়, ‘বিচার পাই না তাই বিচার চাই না’ ব্যানার লাগিয়ে তাঁরা তৎকালীন সরকারের প্রতি অনাস্থাও প্রকাশ করেছিলেন। এখন সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে কি সাংবাদিকেরা মহা অপরাধ করেছেন?
আসলে সাংবাদিকেরা (যাঁরা সরকারের তোয়াজ করেন কিংবা বিরোধী দলের হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদ করেন, তাঁদের কথা বলছি না) নিজেদের বিবেকের কাছে, সত্যের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ কিংবা পরিবেশিত তথ্য ভুল হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকেরা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে লিখছেন না।
রাজনীতিকদের সমস্যা হলো, বিরোধী দলে থাকতে তাঁরা যেটিকে সত্য, প্রিয় সত্য, পরম সত্য মনে করেনন ক্ষমতায় গেলে সেটিকেই তাঁরা মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা, নির্জলা মিথ্যা, চরম মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার সত্য তো বিএনপি ও আওয়ামী লীগ আমলে বদলে যেতে পারে না। তাঁরা তখনো যা বলেছেন, এখনো তাই বলছেন এবং ভবিষ্যতেও বলবেন।
বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন আমরা দলীয় সন্ত্রাস, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে লিখেছি, এখনো লিখছি। তখন আমরা বিরোধী দলের প্রতি সরকারের দমন-পীড়নের সমালোচনা করেছি, এখনো করছি। তখন আমরা বিরোধী দলের লাগাতার সংসদ বর্জনের বিরোধিতা করেছি, এখনো করছি। তখন আমরা হরতাল-অবরোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি, এখনো নিচ্ছি। আমাদের সেই অবস্থান তখন আওয়ামী লীগের কাছে ভালো লাগেনি, এখন বিএনপির কাছেও ভালো লাগছে না।
তখন আমরা সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেছি; বিএনপি সরকার অন্য সব ক্ষেত্রে খারাপ করলেও একটি ভালো কাজ করেছিল, পাবলিক পরীক্ষায় নকল বন্ধ। আমরা তার প্রশংসা করেছি। বর্তমান সরকার কৃষি-শিক্ষায় ভালো করছে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করছে—এগুলোর প্রতি আমাদের দৃঢ় সমর্থন আছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র-লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে, আমরা প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছি। কিন্তু সরকারের কোনো মন্ত্রীর কারণে যদি দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয় বা পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প আটকে যায়, আমরা তার জন্য ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। সরকারি দলের কোনো নেতা বা সাংসদ যখন মাস্তানিতে লিপ্ত হন, কাবিখার টাকা-গম আত্মসাৎ করেন, তখন চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। সরকারের কোনো মন্ত্রী সড়ক-ঘাতকদের পক্ষে সাফাই গাইলে আমরা প্রতিবাদ না করে পারি না।
বিএনপি আমলে আমরা যুবদল-ছাত্রদলের মাস্তানি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লিখেছি। এখন ছাত্রলীগের, যুবলীগের মাস্তানি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লিখছি। এটি সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়। সরকারের ভুল নীতির সমালোচনা করলেই কেউ বিএনপির দালাল হয়ে যায় না।
ক্ষমতাসীনেরা বরাবর দালালদেরই পছন্দ করে, আর সত্যভাষীদের এড়িয়ে চলে।

২.
বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের সাংসদেরা বিরোধী দল সম্পর্কে যেসব অসত্য, অশালীন কথা বলেছেন, সেসব এক্সপাঞ্জ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তা করা হয়নি।’ তিনি স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘যদি আপনি অশ্লীল বক্তব্য ও আইএসআইকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জ না করেন, তাহলে বিএনপি আর কখনোই সংসদে ফিরে যাবে না।’
কখনোই নয়! একটি রাজনৈতিক দল কতটা দেউলিয়া হলে এ ধরনের বক্তব্য রাখতে পারে। জয়নুল আবদিন সাহেব যে কথা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে বলেছেন, সেই কথাটি কেন জাতীয় সংসদে গিয়ে বলতে পারলেন না? জাতীয় সংসদকে কেন তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের কাছে পাঁচ বছরের জন্য ইজারা দিলেন। আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ সংসদকে বিএনপির কাছে ইজারা দেবে। আসলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চলছে না, চলছে পাঁচ বছরমেয়াদি ইজারাতন্ত্র।
বিএনপি তথা চারদলীয় জোট দাবি করছে, দেশের বেশির ভাগ মানুষ তাদের সঙ্গে আছে এবং সরকারের ওপর নাকি চূড়ান্ত অনাস্থা প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাদের এই বেশির ভাগ জনগণের প্রতি বিন্দুমাত্র দয়ামায়া-সহমর্মিতা থাকলে এইচএসসি পরীক্ষার মধ্যে আরেকটা হরতালের চিন্তা করতে পারতেন না।
গতকাল প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ‘বিদ্যুৎ-পরিস্থিতির প্রতিবাদ ও বিদ্যুতের দাবিতে আগামী সপ্তাহে দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বানের ব্যাপারে একমত হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। ৪ এপ্রিল এই হরতাল দেওয়া হতে পারে। বৃহস্পতিবার বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে চারদলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়।’
আমরা বুঝি না, এ মুহূর্তে বিএনপি কেন একটি আত্মঘাতী ও দেশঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। হরতাল করে বিদ্যুৎ-পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়, বিএনপির নেতাদের মাথায় এই অভিনব চিন্তা কী করে এল? আগে তাঁরা মহাসমাবেশ করেছেন, লংমার্চ করেছেন, গণমিছিল করে জনগণের যে সমর্থন ও সহানুভূতি আদায় করেছিলেন, হরতাল দিয়ে তা নস্যাৎ করতে চাইছেন। একটি হরতাল মানে লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ। একটি হরতাল মানে জাতীয় সম্পদ ও অর্থনীতির ক্ষতি। হরতাল মানে নৈরাজ্য। বিরোধী দল কি সেই নৈরাজ্যের পথেই পা বাড়াতে চাইছে?
হরতাল না ডেকে তারা সংসদে গিয়ে সরকারের অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক আচরণের সমালোচনা করতে পারত। সংসদে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন না করে কেন তারা দেশ অচল করতে চাইছে? গণতন্ত্র রক্ষার নামে একদল জনগণকে জিম্মি করবে, আরেক দল গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে। এই মহড়া কত দিন চলবে? কত দিন?

 সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.