সময়ের প্রতিবিম্ব-যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু by এবিএম মূসা

একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হয়েছে জাপানিদের। তাদের এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার হাজারো বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ষাটের দশকে আমি যখন জাপানের ওসাকা শহরে যাই, তখন শহরতলিতে বেশ কিছু কাগজের দেয়াল দিয়ে তৈরি ঘর দেখেছিলাম। সেসব ছিল অপূর্ব এক শিল্পবৈচিত্র্য।


ভূমিকম্পের কারণে বাড়িঘর ধ্বংস হওয়া ঠেকাতে প্রাচীন জাপানে এই সুন্দর শিল্পকর্ম গড়ে ওঠে। এবার জাপানিদের ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হওয়াকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে আণবিক চুল্লির তেজস্ক্রিয়া। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভূমিকম্পে যত না মৃত্যু হয়েছে, তেজস্ক্রিয়ার কারণে মৃতের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তেজস্ক্রিয়ার কারণে জাপানিদের মরণ-বরণ এই প্রথম নয়। প্রথম আণবিক বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে। আমেরিকার নিক্ষিপ্ত আণবিক বোমায় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ আবাল-বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করেছিল, সঠিক সংখ্যা আজও জানা যায়নি। কয়েক লাখ জাপানি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে তেজস্ক্রিয়ার জ্বালা। সেই জাপান কেন নিজেরাই এই মরণফাঁদ তথা তেজস্ক্রিয়া বিস্তারের ঝুঁকি নিয়ে আণবিক চুল্লি বানিয়েছে, তা ভেবে অবাক হই।
ইতিপূর্বে রাশিয়ার চেরনোবিলে আণবিক চুল্লি বিস্ফোরণে কয়েক হাজার নারী-পুরুষ আবাল-বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করেছে। এখনো চরম যন্ত্রণায় ভুগছে লক্ষাধিক ইউক্রেনিয়ান। অন্য এক ধরনের তেজস্ক্রিয়া বিস্তারের সামান্য হলেও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের একটি সীমিত অঞ্চলে। কোনো পারমাণবিক চুুল্লির বিস্ফোরণের কারণে এই তেজস্ক্রিয়া বাতাসে ছড়াবে না। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লোহা আহরণের জন্য জাহাজ ভাঙাড়িদের বিষাক্ত বর্জ্য, যার মাঝে তেজস্ক্রিয়া রয়েছে বলে পরিবেশবাদীরা বলছেন, তা আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। এই বিষাক্ত বাতাস বর্তমানে উত্তর চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূলে সীমিত থাকলেও কয়েক বছর বা দশকের মধ্যে ব্যাপক আকারে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে পরিবেশবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এ জন্য বিষাক্ত বর্জ্যবাহী পুরোনো জাহাজ আমদানির বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) আবেদনক্রমে যত দূর জানি, উচ্চ আদালত তেজস্ক্রিয় পদার্থবাহী জাহাজ আমদানি নিষিদ্ধ করার নির্দেশও দিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও কয়েক ডজন ক্ষতিকর বর্জ্যবাহী জাহাজ খালাসের জন্য চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে নোঙর ফেলেছে বলে খবরে প্রকাশ।
চট্টগ্রাম উপকূলে বাতাস বিষাক্তকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে পরিবেশদূষণের। ‘পরিবেশ’ বিষয়টি এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। বিশ্ব সম্মেলন হচ্ছে আবহাওয়া উষ্ণায়ন, আকাশে ওজোনের স্তর, সূর্যরশ্মির বিকিরণ, সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস, কিছুসংখ্যক দ্বীপের বিলীন হয়ে যাওয়া—এত সব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হচ্ছে। আমাদের এই ক্ষুদ্র দেশটিও পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার কারণে নাকি ভবিষ্যতে পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এসবের জন্য উন্নয়নকামী দেশগুলো উন্নত দেশগুলোকে দায়ী করে তাদের ব্যাপক শিল্পায়নের মাঝে এসব দুর্যোগের কারণ খুঁজে পেয়েছে। এ জন্য গরিব দেশগুলো শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। আমি পরিবেশবাদী নই, ওজোন স্তর, গ্রিনহাউস এফেক্ট, বায়ুদূষণ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞানার্জন করিনি। তবে জীবন ধারণের জন্য পরিবেশের ওপর স্বল্পজ্ঞান ও ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে পেশাগত চাকরি করেছি। আমি জাতিসংঘে পরিবেশ কর্মসূচি ইউনেপে ব্যাংকক আঞ্চলিক দপ্তরে তিন দশক আগে তথ্য কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছিলাম। ব্যাংককের জাতিসংঘ দপ্তরে ইউনেপে আমার দায়িত্ব ছিল ‘পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি’। এই দায়িত্ব পালনকালে আমাকে যেতে হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ এশীয় সব দেশ হয়ে ইরান পর্যন্ত। ইউনেপে দায়িত্ব পালনকালে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন ঘটল।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ নাউরো দ্বীপে গিয়ে দেখলাম, টাকার জন্য সেখানকার জনগণ দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে। দেশ বিক্রির তথ্যটি কিন্তু সত্যি, আমাদের বিরোধী দলের রাজনৈতিক সস্তা বুলি নয়। কৌতূহলী পাঠকের জন্য একটুখানি ব্যাখ্যা দিচ্ছি। পাশের অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের শিল্পপতিরা নাউরোর লোকজনকে জানাল, দ্বীপটি ফসফরাস দিয়ে তৈরি। সে জন্য দ্বীপটি তারা কিনে নেবে। সে দেশের সবাইকে অন্যত্র বসবাসের ব্যবস্থা করবে। মহামূল্যবান এই পদার্থটির জন্য চারদিক থেকে দ্বীপটির মাটি কেটে বিক্রি শুরু হলো। একসময়ের ১০ হাজার বর্গমাইলের দ্বীপটির আয়তন আমি যখন যাই, তখন ১০০ বর্গমাইল। উদাহরণ দিলাম এ কথা বোঝাতে, নাউরোর অধিবাসীরা দেশের মাটি বিক্রি করেছে টাকার জন্য, দেশের বিশুদ্ধ বাতাস বিষাক্ত করছেন ভাঙাড়ি শিল্পপতি।
জাতিসংঘে কর্তব্য পালন সুবাদে পরিবেশ নিয়ে আমার অন্যান্য ধারণার পরিবর্তন ঘটল। বনভূমি রক্ষা, গাছ বাঁচানো, ভূমির উর্বরতা রক্ষায় রাসায়নিক সার-কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ছিল আমার দায়িত্ব। ভারতের বাঘ বাঁচানোর ‘টাইগার প্রজেক্ট’ দেখতে রাজস্থানে গিয়েছি। ভিয়েতনাম-কাম্পুচিয়া সীমান্তের ম্যাকর নদীতে বাঁধ নির্মাণের কারণে দুই দেশের পরিবেশ বিনষ্টের আশঙ্কা নিয়ে জনমত সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হয়েছে। যেসব দেশ নিজেরা পরিবেশের বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, সে সব অপকর্মের ক্ষতিপূরণ দাবি করে বিশ্বদরবারে তারা হাত পাতেনি। আজকে সারা বিশ্বে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ উপেক্ষা করে আমরা নিজেরা সুন্দরবনের গাছ আর পাহাড় কেটে, সীতাকুণ্ড-মিরসরাইয়ে জাহাজবর্জ্যের বিষ ছড়িয়ে মানুষ মারার শিল্প ভাঙাড়িদের জন্য ‘শিল্প’ গড়ে তোলায় উৎসাহ দিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছি। অন্যদিকে বিশ্ব সম্মেলনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ বিনষ্টের জন্য বহির্বিশ্বকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন।
সবচেয়ে ভয়ংকর, বিদেশ থেকে দূষণযুক্ত বর্জ্যসমৃদ্ধ পুরোনো জাহাজ আমদানি করে আমরা আকাশের ওজোনের স্তর বিনষ্ট করছি। সেই পরিবেশদূষণ কার্যক্রমকে শিল্পের মর্যাদাও দেওয়া হচ্ছে, ভাঙাড়িদের বলছি শিল্পপতি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির অন্যতম পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আমাকে তাঁদের আইনি লড়াইয়ের বিবরণসংবলিত একগাদা কাগজপত্র দিয়ে গেছেন। সেই লড়াইয়ে তাঁরা জিতেছেন। মহামান্য উচ্চ আদালত বর্জ্যবাহিত দূষণ ছড়ানো, জনজীবনকে বিপর্যস্তকারী জাহাজ আমদানির ওপর শর্তসাপেক্ষ বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। সেই রায় কীভাবে পাশ কাটানো যায়, তা নিয়ে আমাদের পরিবেশ, শিল্প মন্ত্রণালয় ও ভাঙাড়ি ‘শিল্পের’ মালিকেরা ফন্দিফিকির খুঁজছেন বলে বেলা অভিযোগ করেছে। এদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ভাঙাড়ি ‘শিল্পের’ জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের অগণিত বৃক্ষ নিধন করা হয়েছে। যত দূর মনে পড়ে, যে দিন সরকারের একজন সাংসদ ও তাঁর পুত্র সেখানে বিষাক্ত বর্জ্য খালাসের জন্য গাছ কাটা উৎসবে লিপ্ত ছিলেন, সেদিন অথবা আগে-পিছে কোনো দিন আমাদের প্রধানমন্ত্রী বৃক্ষ রোপণ সপ্তাহ উদ্বোধন করেছেন।
আমাদের সাম্যবাদী মন্ত্রীর ‘শিল্প’ প্রসার নীতি নিয়ে আরও একটুখানি আলোচনা করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক ২০১০ সালের ডিসেম্বরে পুরোনো জাহাজ ভেঙে বিষাক্ত বর্জ্য সমুদ্র উপকূলে পরিত্যাজ্য করার কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জনগণের জীবনযাপন কী ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, সে সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। গবেষণাপত্রের প্রতিপাদ্যের খুঁটিনাটি সাধারণ মানুষ বুঝবেন না। সাধারণ্যের বোধগম্য হচ্ছে, গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দুই দেশের আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জাহাজভাঙা থেকে বাতাসে ছড়ানো বিষের কথা। বিস্তারিত আলোচনা আমার মতো অজ্ঞেরও আওতার বাইরে। আমি শুধু বুঝতে ও জানতে চাই, পরিবেশ মন্ত্রণালয় যে জাহাজভাঙা ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১০ প্রণয়ন করেছিল, তা বাস্তবায়নে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আপত্তি কেন? কেনই বা বিধি অনুযায়ী ‘আমদানিকৃত অথবা আহরিত বিপজ্জনক পদার্থ ও বর্জ্য’ ফেরত পাঠাতে ভাঙাড়িদের বাধ্য করা হচ্ছে না। ফেরত নেওয়া তো পরের কথা, আমদানি করতেই বা দেওয়া হলো কেন এবং কার স্বার্থে? কোনো একটি পক্ষ থেকে অবশ্য দেশের গৃহনির্মাণ ব্যবসায় ইস্পাত ও লোহা সরবরাহের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। বর্জ্য জাহাজ আমদানির বিরুদ্ধবাদীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, বিদেশ থেকে ‘বিলেট’ লৌহখণ্ড যে পরিমাণে আমদানি করা হয়, সীতাকুণ্ড-মিরসরাইয়ের ভাঙাড়িরা তার মাত্র কয়েক শতাংশ সরবরাহ করে থাকেন। পরিবেশ বা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির কথা নাহয় না-ই ভাবলাম, যেসব শ্রমিক এই তথাকথিত ‘শিল্পায়ন’ কার্যক্রমে জড়িত থাকার কারণে বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রাণ দিচ্ছেন, তাঁদের এই মৃত্যু সাম্যবাদী এককালের ‘সর্বহারাদের’ দরদি মন্ত্রী কি আমলে নিয়েছেন? কয়েক শ বা হাজার লোকের কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে কোটি মানুষের নিঃশ্বাসের বাতাস বিষানো কি যুক্তিসংগত?
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদন, বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগ, ইউরোপীয় কমিশনের উদ্বেগ, বেলার আদালতে আরজিতে রয়েছে অনেক তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। আমি সেসব পড়ে যা বুঝেছি, তার ভিত্তিতে মোদ্দা কথাটি সাধারণ্যের দরবারে পেশ করলাম। এসবের মাঝে আমার মনে একটি কৌতূহল উঁকি মারছে। দেশের হাজারো-লাখো মানুষের নিঃশ্বাসের জন্য প্রয়োজন যে বাতাসের, সেখানে বিষ ছড়ানো হবে কিসের বিনিময়ে, কার স্বার্থ চরিতার্থ করতে সে সবের আমদানির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা ছাড় দিয়েছে? অথবা এমনও হতে পারে, পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের দেশের বিষাক্ত জঞ্জাল বাংলাদেশি জাহাজভাঙা শিল্পের বিকাশের জন্য বিনা মূল্যে গছিয়ে দিয়ে নিজেরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। কারণ তাদের নিজেদের দেশে এই বর্জ্য নিক্ষেপ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ আর আরেক নীতিহীন দেশ পাকিস্তানই শুধু এই মরণবাহী জঞ্জাল বিনা পয়সায় নিতে রাজি হয়েছে, এমনটিও হতে পারে।
সর্বশেষ ভাবনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। রাশিয়া চেরনোবিলের বিপর্যয়ের বিস্তার ঠেকিয়েছে, জাপান ফুকুশিমায় পারমাণবিক চুল্লি থেকে বিকিরণ বন্ধ করেছে আপন সামর্থ্যে। আমাদের কি ভবিষ্যতে সীতাকুণ্ড-মিরসরাইয়ে বিষবাষ্প ছড়ানোর কারণে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলার সামর্থ্য আছে? অথবা তেজস্ক্রিয়ায় পঙ্গু মানুষের দোহাই দিয়ে বিদেশিদের কাছে হাত পাতব?
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.