মিনারের জন্য এলিজি by আবু সাঈদ খান

আত্মহননের কোনো প্রচ্ছায়া কখনও দেখিনি মিনারের ব্যক্তিত্বে। বরং আত্মবিশ্বাসে প্রদীপ্ত লড়াকু এক মানুষের মুখে মনে হয় মিনারের কথা মনে হলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছামৃত্যুর পথই বেছে নিল মিনার মাহমুদ। এ খবরটি মেনে নেওয়া কঠিন, কিন্তু মেনে নিতে হলো। জানতে হলো, সুইসাইডাল নোটে তার চরম হতাশা ও ক্ষোভের কথাও।


এ-ই কি মিনারের প্রথম অভিমান? এক রাশ অভিমান নিয়ে ১৯৯১ সালে আমেরিকা চলে গিয়েছিল মিনার। তার সক্রিয় সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের কাছে সেটা ছিল মৃত্যুসম। প্রবাস জীবনে কখনও কলম হাতে নিয়ে দেশ ও জাতির চরম সংকটেও কিছু লিখেছিল কি-না, জানা নেই। তার এই নীরবতা কি অভিমানপ্রসূত নয়? ১৯ বছর পর স্বদেশে ফিরে এলো। এবার চূড়ান্তভাবেই চলে গেল না-ফেরার দেশে। বিচিন্তা সম্পাদক মিনার মাহমুদ এখন কেবলই স্মৃতি।
যতদূর মনে পড়ে, মিনারের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৯ সালে, ফরিদপুরে। একদিন এক উঠতি যুবক এলো। নাম মিনার। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে অথবা দেবে। বলল, অনেকবার মিছিলে গিয়েছি, আপনার বক্তৃতা শুনেছি। কিন্তু এবার দেখা করতে এলাম। সেদিন দীর্ঘক্ষণ ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে তার ঔৎসুক্য আমাকে প্রাণিত করেছিল। বাম চিন্তাধারায় ততদিনে মিনারের বোধন হয়ে গেছে। সে সাক্ষাতের পর প্রায়ই মিনারের সঙ্গে দেখা হতো। কথাবার্তায় সিরিয়াস। তখনই মনে হতো, মিনার বহুদূর যাবে।
ফরিদপুর থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো মিনার। কিছুদিন পর সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রতিবেদন ছাপা হতে লাগল। একবার '৬৯ সালের গণআন্দোলনের ওপর বিচিত্রায় লেখা প্রকাশিত হলো। ওই লেখায় ফরিদপুরের ঘটনাবলির উল্লেখ ছিল। এতে রুষ্ট হলো ফরিদপুরের কিছু ব্যক্তি। মিনার ফরিদপুর এলে ঘটনার জের হিসেবে কতিপয় যুবক মিনারের ওপর চড়াও হলো। মিনার আহত হয়ে এর জবাব দিতে বন্ধুদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে মিনারের সঙ্গে আমার দেখা। আমি ঘটনা শুনে মিনারকে বললাম, 'পণ্ডশ্রম করে সময় নষ্ট করো না। তোমার হাতে কলম আছে, সেটি দিয়ে জবাব দাও।' মিনার আমার কথা শুনল। খানিকটা বিমর্ষ হয়েই ফরিদপুর ছাড়ল।
১৯৮৭ সালে বিচিত্রা ছেড়ে মিনার যখন বিচিন্তা প্রকাশ করল, তখন তার খ্যাতি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাহসী লেখায় টইটম্বুর বিচিন্তা স্বৈরাচারী এরশাদের অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে হুল ফোটাতে লাগল। অল্পদিনের মধ্যে জনপ্রিয়তায় আকাশ ছুঁল বিচিন্তা। হয়ে উঠল স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের মুখপত্র। তখন এই পত্রিকায় ফজলুল বারী, আমান-উদ-দৌলা, দীপু হাসান, আসিফ নজরুল, আনোয়ার শাহাদাত, মাহফুজ পারভেজ, জিল্লুর রহমানসহ অনেকেই কাজ করতেন, লিখতেন। সবাই এখন সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু ১৯ বছর পর দেশে ফিরে কূলকিনারা করতে পারেনি মিনার। কিছুদিন বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে সমকালে কাজ করেছিল। কিন্তু ব্রত ছিল বিচিন্তাই বের করতে হবে তাকে। ঋণ আর বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে বিচিন্তা বের হলো। কিন্তু চালানো সম্ভব হলো না। দু'বার দুটি অস্ত্রোপচারের চাপ, 'আজকের প্রত্যাশা'য় নির্বাহী সম্পাদকের চাকরি গ্রহণ, পদত্যাগ_ এরপর কী করবে? একের পর এক স্বপ্নভঙ্গের যাতনা তাকে শেষ পর্যন্ত জীবনের বিপরীতে নিয়ে গেল। ২৭ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টায় ওর সঙ্গে টেলিফোনে শেষ কথা হয়েছিল। আটপৌরে নানা কথায় এমন কিছুর ইঙ্গিত পাইনি কখনও। সুইসাইডাল নোটে লিখেছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ নেই। কিন্তু প্রশ্ন, আমাদের, সমাজের কি এই মেধাবী তরুণের জন্য করার কিছু ছিল না? অসম্ভব ক্ষুরধার ওর কলাম, প্রচণ্ড সাহস আর তীক্ষষ্ট পর্যবেক্ষণ শক্তিধর মিনারের কাছ থেকে আরও অনেক সৃষ্টিশীল কাজ আসতে পারত। 'মনে পড়ে রুবী রায়' ও 'নির্ঘুম স্বপ্নের দেশে' বইয়ের লেখকের কাছে আরও অনেক প্রত্যাশা ছিল; কিন্তু তা পূরণ হলো না।
তারপরও মিনার আলোচিত হবে তার সাহসী সাংবাদিকতা এবং
বিচিন্তার কারণে।

No comments

Powered by Blogger.