বিন লাদেনের ডায়েরি by শামসুল আরেফিন খান

কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসী ওসামার উদ্ধারকৃত ডায়েরি থেকেও তেমনি চমকে দেওয়ার মতো কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সেগুলো প্রণিধানযোগ্য এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দাবিদার। তা ছাড়া অ্যাবোটাবাদে বিন লাদেনের মৃত্যু কাহিনীর অনেক ডালপালা গজিয়েছে।


পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় সেসব নিয়ে সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প রচিত, কল্পিত ও বিবৃত হচ্ছে। তবে বাস্তবতা এটাই যে ধর্মের লেবাস পরা এই সন্ত্রাসী খলনায়ক বেঁচে থাকলে হয়তো ধিকৃত, নিন্দিত ও ঘৃণিত হয়ে একসময় বিস্মৃত হতেন। কিন্তু রহস্যঘেরা এক চাঞ্চল্যকর ইতিহাস সৃষ্টিকারী মৃত্যু বা কারো কারো ভাষায় হত্যাকাণ্ড, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের তৈরি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবটা তাজা ইতিহাস বানিয়ে দেবে। কালক্রমে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সে ইতিহাস হয়তো কিংবদন্তিতে রূপান্তর হবে। ঘৃণা আর কলঙ্কের কালিমামুক্ত হয়ে প্রাতঃস্মরণীয় ও পূজনীয় হয়ে উঠতে পারেন এক শ্রেণীর মানুষের কাছে ওসামা বিন লাদেন নামের এই বিশ্বসন্ত্রাসের শাহেনশাহ। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের যে ভবনটাতে তাঁর নাটকীয় মৃত্যুকাহিনী রচিত হয়েছে, সেটাও মতলববাজদের কারসাজিতে তীর্থভূমি হয়ে ওঠা বিচিত্র কিছু নয়। এ শঙ্কা নিশ্চয়ই 'বীরশ্রেষ্ঠ' মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটকৌশলী সমরনায়ক ও লাদেন-বধের রূপকারদের মাথায় ছিল। আর সম্ভবত সে কারণেই তাঁরা সাগরবক্ষের কোনো এক অজ্ঞাত মোহনায় লাদেনের সলিল সমাধি ঘটিয়েছেন। মাজারে পরিণত হওয়ার মতো কোনো সমাধিসৌধ তৈরি করার সুযোগ রাখেননি। কিন্তু মানুষের মনের ওপর বিশ্লেষকের অনুসন্ধান, গবেষণা ও সত্য প্রকাশের তাগিদ ও সাহসের ওপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
সৌদি আরবের ধনকুবের ওসামা বিন লাদেন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রই ছিলেন না, তিনি একদা বুশ পরিবারের বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের সক্রিয় অংশীদারও ছিলেন। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন প্রতিরোধেও তাঁর সংগঠন সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল। মার্কিন অর্থ ও অস্ত্রবলে তখনই তিনি বলবান ও শক্তিমান হয়ে উঠেছিলেন। এ কথা কারো অজানা থাকার নয়। উদ্ধার করা ডায়েরিতে লেখা বিন লাদেনের সন্ত্রাসী রূপকল্পের সব কথা সত্য বলে বিশ্বাস করলে এ কথাও মেনে নিতে হবে যে ৯/১১-র ঘৃণ্য ও ভয়াবহ ধ্বংসলীলার রূপকার তিনি নন বলে বিন লাদেন যে দাবি করেছেন, সেটাও সত্য হতে পারে। কারণ তিনি ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তানজানিয়ার মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা, ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালি নাইট ক্লাবে, ২০০৪ সালে ফিলিপাইনের ফেরিতে ও মাদ্রিদের ট্রেনে, ২০০৫ সালে মিসরের শায়েম আল শেখ ও জর্দানের আম্মানে বোমা হামলা করে এবং ২০০৭-এ আলজিয়ার্সে গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অগণিত নিরীহ নর-নারীর রক্তে হাত রাঙানোর কথা এবং ১৯৯৩ সালে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা হামলা ও মোগাদিসুতে অ্যামবুশ করে ১৮ মার্কিন সৈন্য হত্যার দায়দায়িত্ব অস্বীকার করেননি। সে কারণে সন্দেহের সেই পুরনো বাস্তু গোখরা সাপটা আবার ফোঁস ফোঁস করতে শুরু করেছে_তাহলে টুইন টাওয়ার বিনাশ ও পেন্টাগনে হামলার প্রকৃত নায়ক কে?
বর্ণিত সব হত্যাকাণ্ড ও রক্তধারায় জন্ম নিয়েছে বিশ্বত্রাস ও সন্ত্রাসের অদৃশ্য দানব আল-কায়েদা, যার জনক ওসামা বিন লাদেন। বিগত ১১টি বছর কত অরণ্য, কত দুর্গম পাহাড়-পর্বতের গুহায় গুহায় সিআই তাঁকে খুঁজেছে অন্ধকারে কালো বিড়াল খোঁজার মতো। আর সেই ছায়া-দানবকে নির্মূল করার লক্ষ্যেই ২০০৮ সালের শেষদিকে পাকিস্তান সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় তালেবান জঙ্গি ঘাঁটিতে চালকবিহীন ড্রোন বিমান হামলার মাধ্যমে সিআইএ শত্রুর বিরুদ্ধে 'হাতুড়ির বদলে গুপ্ত ছুরি ব্যবহারের' নতুন রণকৌশলে গোপন যুদ্ধ শুরু করে।
সেই অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে এখন পৃথিবীর ১৯টি দেশে। আফ্রিকার সুদান, কেনিয়া, মরক্কো, আলজিরিয়া ও সোমালিয়া এবং এশিয়ার পাকিস্তান, সৌদি আরব, লেবানন, ইয়েমেন, ইরান ও তাজাকিস্তানে এমন কার্যক্রম চালানোর নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস। ওয়াশিংটন সংবাদদাতার বরাত দিয়ে 'দি পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকা' 'অ্যাবোটাবাদে সম্প্রতি বিন লাদেনের হিমায়িত লাশের পুনঃ মৃত্যু ও অন্তিম সংস্কারের নাটক মঞ্চায়নের' যে রোমাঞ্চকর কাহিনী ছেপেছে, তার সত্যতা যাচাইয়ের গবেষণা শেষ হতে অনেক সময় লাগবে। তবে এমন সব প্রশ্ন ইতিমধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে, ১. তাহলে কি ২০০৮ সালের প্রথম ড্রোন হামলায় পাকিস্তান সীমান্তে বিন লাদেন নিহত হন? ২. তাঁর লাশ গুম রেখেই কি ইরাক যুদ্ধের সমাপ্তি টানা হয়েছে এবং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে? ৩. ড্রোন হামলা চালিয়ে ১৯ দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে যে গোপন যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে, তার যৌক্তিকতা বজায় রাখার জন্যই কি লাদেনের লাশ হিমায়িত রাখা হয়? এসব প্রশ্ন এবং তার কোনোটারই উত্তর কল্পনার আঙিনা পেরিয়ে বাস্তবের মাটিতে এসে দাঁড়াতে পারেনি তথ্যপ্রমাণ নিয়ে।
কিন্তু বিন লাদেনের ডায়েরি থেকে অন্য যে তথ্য উঁকি দিচ্ছে সেটা তার সন্ত্রাসী চেহারার ওপর আরব জাতীয়তাবাদ ও তেল জাতীয়তাবাদের পুণ্য-প্রলেপ চড়িয়ে দিতে পারে। সেটাই পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী বুদ্ধিজীবীদের জন্য সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯১৯ সালে ভারতের জালিয়ানওয়ালাবাগের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাতের লক্ষ্যে পার্লামেন্ট ভবনে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন ভগত সিং ও তাঁর সন্ত্রাসবাদী সাথিরা। সে ঘটনায় ফাঁসি হয়েছিল তাঁর এবং সেই সঙ্গে সহযোগী গুরুদেব ও রাজগুরুর। মহাত্মা গান্ধীসহ জাতীয় নেতাদের কেউই তাঁদের ফাঁসি রদের জন্য বড় লাটের কাছে আবেদন জানাননি বলে অনুযোগ রয়েছে। মাস্টারদা সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম ও অগি্নকন্যা প্রীতিলতা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন কিন্তু জনসমর্থন পাননি। সফল হননি নেতাজি সুভাষ বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে সশস্ত্র উপায়ে দেশের মুক্তি আনার প্রচেষ্টায়। ভারত স্বাধীন হয়েছিল মহাত্মা গান্ধী, মওলানা আজাদ ও সীমান্তগান্ধী গাফ্ফার খানদের অহিংস মন্ত্রে।
তেল জাতীয়তাবাদের উন্মেষকাল ১৯৫০। সে সময় ইরানের পার্লামেন্টে তেল জাতীয়করণ বিল পাস হয়েছিল বিপুল ভোটে। ব্যাপক জনসমর্থনের মালা গলায় পরে সেই তেল জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ ড. মোসাদ্দেক তরুণ শাহেনশাহ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের কালোহাত প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের চোরাপথে প্রসারিত হয়ে তাঁর গলা টিপে ধরল। ড. মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হলেন। তাঁর ফাঁসির রায় হলো বিচার-প্রহসনে। তিনি বন্দি অবস্থায় কঠিন রোগে মৃত্যুবরণ করলেন। আরব জাতীয়তাবাদের আদি জনক দার্শনিক আবু খালেদুন সাতী আল হুসরি মনে করতেন, আরব রাষ্ট্রগুলোর কৃত্রিম খণ্ডিত অস্তিত্ব সাম্রাজ্যবাদের ঘৃণ্য বিভেদ-বিভাজন মন্ত্রের বিষফল। তেল সম্পদ লুণ্ঠনের অপকৌশল এবং ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের ফাঁকফোকরে ঢুকে অস্ত্র বিক্রি ও রসদ সরবরাহের ঠিকাদারি পাওয়ার ষড়যন্ত্র। তিনি লিখেছেন, অভিন্ন ভাষাভাষী আরবদের রয়েছে অখণ্ড হৃদয় ও অভিন্ন আত্মা। তারা একটি অভিন্ন জাতি। তাদের অবশ্যই একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। (ডঐঅঞ ওঝ ঘঅঞওঙঘঅখওঝগ? : ওঘছটওজওঊঝ অঘউ ঝঞটউওঊঝ ওঘ খওঐেঞ ঙঋ ঊঠঊঘঞঝ অঘউ ঞঐঊঙজওঊঝ-পৃষ্ঠা-৫৭)
আরব দার্শনিক হুসরি বলতেন, আরবরা একটি রাষ্ট্রে বিলীন হয়ে লড়াই করলে ১৯৪৯-৫০-এর ফিলিস্তিন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ইসরায়েলের অভ্যুদয় সম্ভব করে তুলত না।
মৃত ওসামা বিন লাদেন আরব দার্শনিকদের উপলব্ধি ও চেতনাকে হয়তো লালন করেননি। কিন্তু আরবের তেল সম্পদকে সাম্রাজ্যবাদের রাহুমুক্ত করার লক্ষ্যে আরবের তেল খনি থেকে পাশ্চাত্যের বণিকদের বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে ভগত সিংকে অনুসরণ করে সন্ত্রাসের রক্তপিচ্ছিল পথে পা রেখেছিলেন কি না, এমন প্রশ্ন পুঁজিবাদী দার্শনিকদের ভাবিয়ে তুলেছে। 'কত মানুষ হত্যা করলে পাশ্চাত্যের তেলদস্যুরা আরবের তেলক্ষেত্র থেকে পাততাড়ি গুটাবে' সে প্রশ্নই তাঁর চিন্তায় বাসা বেঁধেছিল_তাঁর ডায়েরি থেকে এ রকম একটি আভাস নাকি উঁকি দিয়েছে। এদিকে গান্ধীবাদ শিকড় গেড়েছে তাহরির স্কয়ারে। অহিংস সত্যাগ্রহের পথে আরব ভূখণ্ডে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল বিপ্লবের পথ ধরে গোটা আরব ও উত্তর আফ্রিকার যুবমানসে। সেটাও কম চিন্তার বিষয় নয়।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

No comments

Powered by Blogger.