জ্বালানি-নিশ্চিত মূল্যবৃদ্ধি, অনিশ্চিত জ্বালানি-নিরাপত্তা by মোশাহিদা সুলতানা

সরকার জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রধান কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছে। এ বছর জ্বালানি আমদানির খরচ দিতে গিয়ে সরকার সংকটে পড়েছে মূলত ব্যালান্স অব পেমেন্ট ঘাটতির কারণে। ব্যাংকে তারল্যসংকট তৈরি হওয়ায় সরকার আমদানি ব্যয়ের টাকা পরিশোধ করতে দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে পারছে না, উপরন্তু


টাকার মূল্য কমে যাওয়ায় বেশি দামে ডলারে বিল দিতে হচ্ছে। এ বছর জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় ২৫৫৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪১০৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। ধরে নিলাম, এই সংকটময় মূহূর্তে সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে এই ভার বহন করতে হবে জনগণকে। ধরে নিলাম, সরকার যা চায়, জনগণ তা-ই করল। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনল, বেশি দামে জ্বালানি কিনল, করও দিল, বেশি দামে প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনল, বাড়িভাড়া ও পরিবহনভাড়া বাড়ার কারণে মধ্যবিত্তরা বিলাসিতা করল না; নিম্নবিত্তরা কম খেয়েও থাকল। কিন্তু এত কষ্টের বিনিময়ে জনগণ সরকারের কাছ থেকে কী পাচ্ছে এবং পাবে?
অনেকে ভাবছেন, কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দেশের জ্বালানির চাহিদা পূরণ হবে, নিশ্চিত হবে জ্বালানি-নিরাপত্তা। কিন্তু জ্বালানি-নিরাপত্তা মানে শুধু চাহিদার সমান জোগান দেওয়া নয়, চাহিদার সমান জোগান থাকা এবং অধিকাংশ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরকার যদি চাহিদার সমান জোগান দিতে গিয়ে কুইক রেন্টালকে সমাধান হিসেবে বেছে নেয় এবং কয়েক মাস পর পর বলে যে সরকার সংকটে আছে, আমদানি ব্যয় বহন করতে পারছে না বলে জনগণকে বেশি দামে কিনতে হবে, তাহলে এ রকম দিন আসতে পারে, যখন আমাদের দেশে চাহিদা অনুযায়ী জোগান থাকবে কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা থাকবে না।
সরকার যখন ২২টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প হাতে নেয়, তখন কথা ছিল ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চার মাসের মধ্যে এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো নয় মাসের মধ্যে চালু হবে। কিন্তু এ বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত চালু হয়েছে মোট ১২টি প্রকল্প, এর মধ্যে চারটিতে নানা রকম যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্ধারিত পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে না। ২২টির মধ্যে মোট ১৮টি প্রকল্পের চুক্তি সম্পন্ন হয়, যেখানে ডিজেলচালিত কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা এবং ফার্নেস অয়েল চালিত কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট আট টাকা দর ঠিক হয়। সরকারি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় উৎপাদন ব্যয় তিন-চার টাকা। সরকার গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৩ দশমিক ৬৬ টাকায়। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে জোগান দেওয়ার জন্য সরকার অনেক বেশি দামে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, জরুরি ভিত্তিতে কুইক রেন্টাল দেওয়ার কারণে আমাদের বিদ্যুৎসমস্যা খানিকটা মিটেছে এবং সরকারের এই বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা ও বেশি দামে ভর্তুকি দেওয়ার সংগত কারণ আছে, কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে ভর্তুকি দেওয়া না-দেওয়ার প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভর্তুকি কাদের দেওয়া হচ্ছে, এই বিশাল পরিমাণ ভর্তুকির টাকা দিয়ে বেশি দামে বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে জ্বালানি না কিনে এই ভতুর্কি জ্বালানি-নিরাপত্তা অর্জনে ব্যয় করা কি যেত না?
আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকাই, তাহলেই দেখব, যুক্তরাষ্ট্র সরকার জনগণের কাছে কম দামে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য বিভিন্নভাবে ২০১০ সালে ৩৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার শুধু ভর্তুকিই দেয়নি, বহু দিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবে তেল উৎপাদক দেশগুলোর ওপর আধিপত্য নিশ্চিত করে রেখেছে। এর জন্য তারা কোটি কোটি ডলার ব্যয় করতে দ্বিধা করে না। বুঝলাম, আমাদের দেশ আর যুক্তরাষ্ট্র এক নয় এবং আধিপত্য কায়েম করে জ্বালানি-নিরাপত্তা রক্ষা আমাদের কাজও নয়। কিন্তু আমাদের নিজেদের জ্বালানি সম্পদ আছে। এই সম্পদ উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা বিশাল ভর্তুকি ও জনগণের অর্জিত অর্থ বিদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়া থেকে মুুক্ত হতে পারি। সরকারের ওপর চাপ পড়লে সরকার যেমন জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সমস্যা থেকে বের হয়ে আসে, তেমনি আমাদের ইতিহাস বলে, জনগণের ওপর জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা চাপালে জনগণ কষ্ট করে হলেও তার দায় বহন করে। কিন্তু স্বল্প মেয়াদে সংকট উত্তরণের সময়টা দিন দিন দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংকট উত্তরণের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সক্ষমতা অর্জনের পদক্ষেপ যদি এভাবে পিছিয়ে পড়তে থাকে, তাহলে জনগণের ওপর এই বোঝা বাড়তে বাড়তে পাহাড়সমান হয়ে যাওয়ার পরও ভবিষ্যৎ সরকার একই যুক্তি দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে চলবে। সরকারকে এই নিরাপত্তাহীনতার কথা ভেবে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ মুহূর্তে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে মুদ্রাস্ফীতি। আমাদের অর্থমন্ত্রী যদি জানেন, কী কৌশল অবলম্বন করলে অর্থনীতির সব সূত্রের বাইরে গিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ার পর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে সেই বিষয়ে জনগণকে জানাতে হবে। জনগণ এখনো এই অভিনব পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। অন্যদিকে গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবারও বিদেশি কোম্পানির হাতে দিয়ে দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে নতুন পিএসসি চুক্তি করার প্রস্তুতি চলছে। ভর্তুকির দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে জনগণের অর্থ বিদেশি কোম্পানির কাছে দিয়ে দেওয়াটা খুব সহজ কাজ। দেশীয় সক্ষমতা অর্জনের প্রসঙ্গ উঠলেই কাজটি আর সহজ থাকে না। তাই সহজ পথ অবলম্বন করে, অদূরদর্শী পরিকল্পনা করে এই ঘন ঘন তেলের মূল্যবৃদ্ধি তো আসলে আশ্চর্য হওয়ার ঘটনা নয়। সরকার যে সংকটের কথা বলছে, সাধারণ নিয়মে তো এ রকমই হওয়ার কথা ছিল। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার মধ্য দিয়েই দেশ ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং যত দিন যাচ্ছে, সে তার করণীয় কাজগুলো আরও কঠিন করে ফেলছে। সরকারের এই সংকট মুহূর্ত এবং জনগণের এই ভোগান্তি—দুই পক্ষকেই যদি প্রশ্নবিদ্ধ না করে, তাহলে শুধু ভর্তুকির পক্ষের বা বিপক্ষের যুক্তি দেখানো হবে অর্থহীন কাজ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কি জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?
মোশাহিদা সুলতানা: প্রভাষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.