ধর্ম-মানুষ যেন সীমা লঙ্ঘন না করে by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

মহাবিশ্বের সবকিছুই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। তিনি মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসেবে ধরণিতে প্রেরণ করেছেন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্ট জীব মানুষ বাক্শক্তিসম্পন্ন। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা, আত্মমর্যাদাবোধ, সজাগ-সচেতনতা রয়েছে।


তাদের মস্তিষ্কে নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের চিন্তা-ভাবনা, মেধা-মননশীলতা ও উন্নত গবেষণা রয়েছে, যা অন্য কোনো সৃষ্টিকুলের নেই। সৃষ্টিজগতের সবকিছু মানুষের উপকারার্থে রয়েছে। মহাকাশ ও পৃথিবীর সর্বত্র মহান আল্লাহর অনুগ্রহ পরিবেষ্টিত। আর এসবই মানুষের কল্যাণের নিমিত্ত। সুতরাং আল্লাহর কোনো অবদানকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কোনো সৃষ্ট জীবের নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহের কথা নানাভাবে বিধৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘পরম করুণাময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে ভাব প্রকাশ করতে (ভাষা) শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তিত হয়। তৃণলতা ও বৃক্ষাদি তাঁরই বিধান মেনে চলে। তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং ভারসাম্য স্থাপন করেছেন, যাতে তোমরা সীমা লঙ্ঘন না করো। ন্যায্য পরিমাপ প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিয়ো না। তিনি পৃথিবীকে সৃষ্ট জীবের জন্য স্থাপন করেছেন, এতে রয়েছে ফলমূল এবং নতুন ফলবিশিষ্ট খেজুরগাছ, খোসাবিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। সুতরাং তোমরা উভয়ে (মানুষ ও জিন) তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?’ (সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ১-১৪)
আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই অভিপ্রায়ে সৃষ্টি করেছেন, যেন এরা একে অপরের কল্যাণকামী বন্ধু এবং পরোপকারী হয়। মানবসেবা ও সৃষ্টিকুলের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। জগতে মানুষ মানুষের জন্য। মানুষ যখন পারস্পরিক সম্প্রীতি ও পুণ্যের বাঁধনে আবদ্ধ থাকে, তখন দুনিয়াটা শান্তির পরশে আলোকিত ও উজ্জ্বলতর হতে থাকে। আবার এ মানুষই যখন জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা রহিত করে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আত্মঘাতী অসৎ কাজে নিয়োজিত হয় এবং মানুষের উপকার ব্যতীত অপকার ও ক্ষতিতে এবং দেশ ও জাতির মূল্যবান সম্পদ ধ্বংস করে, লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে লিপ্ত হয়, তখন পৃথিবীটা শান্তিতে বসবাস করার অযোগ্য ও বিষময় হয়ে পড়ে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্কবাণী প্রদান করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে মানুষের উপকার করে।’
মানুষের মধ্যে যারা কাজকর্মে সৎ হবে, তাদের জন্য রয়েছে অঢেল পুরস্কার এবং যারা কাজকর্মে অসৎ হবে, তাদের জন্য থাকছে তিরস্কার। সৎকর্মের পরিচয় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সংসারজীবনের সব কাজকর্মে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়া। যেমন—লেনদেন বা ব্যবসা-বাণিজ্যে মিথ্যা কথা না বলা, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল না দেওয়া, প্রতারণা না করা, চাকরিজীবনে ঘুষ-দুর্নীতি তথা উৎকোচ গ্রহণ না করা, সব দায়িত্ব ও কর্তব্য ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে যথাযথভাবে পালন করা এবং দেশ-জাতির কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি সাধন না করা। আধ্যাত্মিক জীবনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সর্বপ্রকার নির্দেশ সফলভাবে পালন করে যাওয়া। যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘পারস্পরিক স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার দিক থেকে ঈমানদারদের উদাহরণ হলো একটি দেহের মতো। এর একটি অঙ্গ যদি ব্যথাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে সারা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে কাতর হয়ে পড়ে।’ (মুসলিম)
যারা আল্লাহর বিধান অমান্য ও সীমা লঙ্ঘন করে, মানুষের উপকারী উপাদান ও আল্লাহর বৃহৎ সৃষ্টি, যা মানুষকে ঝড়-তুফান, ভূমিধস, দুর্ভিক্ষ, খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ুর পরিবর্তনে পৃথিবীর উষ্ণায়ন এর অতিরিক্ত তাপ থেকে রক্ষা করে, সেই সব পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল ও নদীনালা ধ্বংস করে যারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে, তারাই হলো প্রকৃতপক্ষে জালিম বা অত্যাচারী; দেশ, জাতি ও মানবতার দুশমন এবং বিশ্বের সব প্রাণীর শত্রু। ভূপৃষ্ঠে দুর্যোগ, বিপর্যয় ও বিপদ-আপদ মানুষের অপকর্মের দ্বারাই অর্জিত হয়ে থাকে। তবে আল্লাহ সব অপকর্মের শাস্তি দেন না বরং জঘন্যতম অন্যায় ও অপরাধের শাস্তিই দিয়ে থাকেন, যাতে মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পেরে, নিজেকে সংশোধন করে সৎপথে আল্লাহর রাস্তায় প্রত্যাবর্তন করে। এদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; ফলে তাদের তাদের কোনো কোনো কৃতকর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা আর রূম, আয়াত: ৪১)
যাদের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক ও অশান্তি-বিশৃঙ্খলা, অসহায় লোকের মৃত্যুর কারণ এবং দেশ ও জনগণের সম্পদ লুণ্ঠিত হয়, এরা সবাই জালিম। দেশের জনগণ হলো মজলুম বা অত্যাচারিত। জালিমের জুলুম আল্লাহ সহ্য করেন না। তাই যে ব্যক্তি কোনো বড় ধরনের অন্যায় বা কবিরা গুনাহ করে, সে সারা বিশ্বের মানুষ, চতুষ্পদ জন্তু ও পশুপাখির প্রতি অবিচার করে। ফলে কিয়ামতের দিন তারা সবাই গুনাহগার ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করবে। আল্লাহ পাক এদের শাস্তি সম্পর্কে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা আল-শুরা, আয়াত: ৪২)
সারা বিশ্বই অন্যায়-অপরাধ ও দুর্নীতিতে কমবেশি নিমজ্জিত, যার কারণে জগতের সর্বত্রই কোনো না কোনো ধরনের বিপর্যয় ও দুর্যোগ সমাগত। কোথাও যুদ্ধবিগ্রহ, কোথাও বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় বা ভূমিধস ও মঙ্গা-খরাপীড়িত। কোথাও দুর্নীতি ও দুষ্কর্মের কারণে দেশের মানুষ অকল্পনীয়ভাবে বিপর্যয়ের মাধ্যমে দুর্দশাগ্রস্ত। আল্লাহ তাআলার বর্ণিত বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসার জন্য যেসব কারণ আছে, তার সবই সমাজে বিদ্যমান। অসৎ লোকেরা দেশকে সর্বনাশের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে কেউ পাহাড় কেটেছে, কেউ বনজ সম্পদ বা গাছপালা নষ্ট করেছে, কেউ দেশের অর্থকড়ি লুটপাট করেছে, কেউ প্রতারক ব্যবসায়ী হয়ে জনগণকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পৌঁছিয়েছে, কেউ পেশাজীবী হয়েও দুর্নীতির চরমে পৌঁছেছে।
এদের কারণে দেশের মানুষ হতাশাগ্রস্ত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি নিরাশাগ্রস্ত। তাই মানুষ যেন আর সীমা লঙ্ঘন না করে, তাহলে দুষ্কর্ম থেকে আল্লাহর মেহেরবানিতে মুক্তি পেতে পারে। যার জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষ কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে এবং সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য পরম করুণাময়ের দরবারে দেশ ও জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতি, নিরাপত্তা ও শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.