উদ্ভট একটি ব্যবস্থার নাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার by শাহদীন মালিক

কালের কণ্ঠ : তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা না-থাকা প্রশ্নে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। গণতন্ত্র বিকাশে এ ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজন বা আদৌ এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আপনি মনে করেন কি? এ ব্যবস্থা কি এতটাই অপরিহার্য?


শাহদীন মালিক : দুটি রাজনৈতিক দল আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। এটাকে আমি মনে করি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। আমাদের রাজনীতিতে একটা বিশ্বাস আছে, আপসহীন হলে রাজনীতির মাঠে ভালো ফল পাওয়া যাবে। এ জন্য আমাদের সব রাজনৈতিক দল আপসহীন অবস্থানে থাকতে চায়। পরস্পরবিরোধী এ ভূমিকা আপসহীন ওই রাজনীতিরই অংশ।
কালের কণ্ঠ : এই আপসহীন ভূমিকায় রাজনৈতিক দলগুলো অনড় থাকলে তা কি দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সাহায্য করবে না?
শাহদীন মালিক : হ্যাঁ, রাজনৈতিক দলগুলো এমন আপসহীন অবস্থানে অনড় থাকলে তা অশান্তির সৃষ্টি করবে। হরতাল হবে, ভাঙচুর হবে, কাজকর্ম বন্ধ থাকবে। আমার মনে হয়, এ ধরনের অবস্থা থেকে উদ্ভূত হরতাল-বয়কটের যে রাজনীতি, এটি দুই দলই করতে থাকবে। এটি করতে করতে দুই দলের মধ্যেই উপলব্ধি হবে, জনগণ আপসহীন রাজনীতির যে মূল্যায়ন করত, তা থেকে এখন সরে আসছে। আমাদের আপসহীন রাজনীতি তথা সংগ্রামের যে ঐতিহ্য, যেমন ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে '৬৯, '৭১ এসব সংগ্রামের ঐতিহ্য এতকাল ধরে আমরা ধারণ করে এসেছি। এটি ছিল প্রথম পর্যায়ে। এখন আমাদের দেশ, জাতি প্রাপ্তবয়স্কতার দিকে যাচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কতার দিকে যাওয়া মানে ওই ধরনের আপসহীন সংগ্রামী অবস্থান থেকে দূরে সরে এসে শান্তি, উন্নতি_এসবের দিকে জনগণ ঝুঁকে পড়ছে। অতএব, দুই দল এমন অনড় অবস্থায় থাকলে জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে। এটি তারা উপলব্ধি করে সেখান থেকে সরে আসবে, একটি সমঝোতার জায়গায় আসবে। অবশ্যই দুই দলের মধ্যে সব প্রশ্নে সমঝোতা হবে না। কিন্তু কিছু মৌলিক প্রশ্নে পরস্পরকে ছাড় দিয়ে একটি সমঝোতায় আসতে হবে। এটি তারা করতে না চাইলে বা করতে ব্যর্থ হলে জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। তখন একটি তৃতীয় রাজনৈতিক দল উঠে আসতে পারে বলে আমার ধারণা। দেখুন, রাজনৈতিক দল গড়তে কিন্তু সময় লাগেনি। মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী লীগ, '৭৪-৭৫-এর আওয়ামী লীগ, তার মাত্র তিন বছরের মধ্যে বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দল হয়ে গেল। অন্তত প্রচুর জনসমর্থনের দল হয়ে গেল। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর নির্বাচনে তার পরীকরণ ঘটল, যেখানে সাত্তার সাহেব আওয়ামী লীগের ড. কমাল হোসেনের বিরুদ্ধে অনেক ভোটে জিতলেন। একইভাবে জাতীয় পার্টিও কিন্তু তিন-চার বছর আগে বিরাট পার্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তফ্রন্টের সময় দেখুন, কয়েক মাস আগেও তেমন কোনো দলই ছিল না। তখন ছিল মুসলিম লীগের পাকিস্তান। যুক্তফ্রন্ট দাঁড়িয়ে গেল এবং নির্বাচনে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেল।
কালের কণ্ঠ : এ প্রসঙ্গে একটি কথা আছে। আমাদের নির্বাচন কমিশনার সম্প্রতি দেশে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব কাটিয়ে উঠে ছোট রাজনৈতিক দলগুলোকে শক্তিশালী হয়ে উঠতে বলেছেন। আমরা বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশ, যেমন_যুক্তরাষ্ট্রে দুটি, ব্রিটেনে দুটি, বড়জোর তিনটি দলকে প্রভাবশালী দেখতে পাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ছোট দলগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠলে কি তা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারবে?
শাহদীন মালিক : ছোট দল আসবে, নাকি বড় দলগুলো ভেঙে আরেক দল আসবে_এটা কিন্তু বলা মুশকিল। আমি যেটার ওপর জোর দিচ্ছি তা হলো, এমন অনড় অবস্থায় বড় দলগুলো দাঁড়িয়ে থাকলে তখন একটি অন্য ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তৈরি হবে বা উদ্ভাবন ঘটবে। কতগুলো রাজনৈতিক দল হবে বা কিভাবে দলগুলো নিয়ে মোর্চা তৈরি হবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি।
কালের কণ্ঠ : প্রথম প্রশ্নটির রেশ ধরেই বলি, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমরা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে দেখছি না। এ ব্যবস্থা গণতন্ত্রে কতটা কাম্য। অনেকে এর বিকল্পের কথা বলছেন। এর বিকল্পটা কী বা কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন।
শাহদীন মালিক : আমাদের এ ব্যবস্থা আর কোথাও এই আদলে আছে কি না আমারও জানা নেই। না থাকারই কথা। সাংবিধানিক দিক থেকে এটি একটি উদ্ভট ব্যবস্থা। এটি যে আইনগতভাবে বা সাংবিধানিকভাবে বাতিল হয়ে গেছে, সেটিই স্বাভাবিক, এই উদ্ভট ব্যবস্থার মধ্যে চলে আমরা নিজেরাও উদ্ভট হয়ে গেছি। এখান থেকে রাতারাতি আমাদের বেরিয়ে আসা দুষ্কর। বেরিয়ে আসার জন্য কিছু সময় ও পদক্ষেপ লাগবে। হুট করে এক দিনে সম্ভব নয়। অর্থাৎ আমি যেটি বলতে চাচ্ছি, আমরা যে কেয়ারটেকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম সেখানে বিচক্ষণতার অভাব ছিল, উদ্ভট ব্যাপার ছিল। এ ব্যবস্থা নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। এখন এ ব্যবস্থা না হলে নির্বাচন কমিশনকে যে শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল তার কিছু নেওয়া হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নেওয়া হয়নি।
এখন নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আরো কিছুটা সময় দরকার। ওই সময়টার জন্যই, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যেটি আছে, আমাদের এ ব্যবস্থা পাঁচ বা দশ বছরের জন্য চালু রাখতে হবে। এ ব্যবস্থা আপাতত চালু রাখার একমাত্র কারণ হলো নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত করে তুলতে সময়টা দেওয়া।
কালের কণ্ঠ : নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কী পথ খোলা আছে বলে মনে করেন?
শাহদীন মালিক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নটিই এসেছিল নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী না হওয়ার কারণে। আমার দৃষ্টিতে নির্বাচন কমিশনের এখনো দুটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমটি হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুই কমিশনার নিয়োগের ব্যাপারে আমরা এখনো একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে পারিনি। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার জন্য এখনো আমরা মনোনিবেশ করতে পারিনি। হঠাৎ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমরা জানতে পারি, অমুক নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হয়েছেন। তারপর দেখা যাচ্ছে, অনেকে তাঁর ব্যাপারে অনাস্থা বা আপত্তি তুলছেন। এটি আগে থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করলে একজন আস্থাভাজন, বিশ্বাসযোগ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনার হতে পারেন। তাহলেই আস্থা আসত। অথচ এ বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের মেয়াদ ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে যাবে। তাঁদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাঁদের পরিবর্তে কারা আসবেন সে ব্যাপারে স্বচ্ছ নিয়ম ও আলাপ-আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। এটি এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। পৃথিবীর বহু দেশেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আস্থাভাজন, বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিকে নিয়োগের পন্থা বের করা হয়েছে। এর জন্য আমাদের বড় কোনো আবিষ্কার করতে হবে না। আর দ্বিতীয়টি হলো, নির্বাচনের সময় এখনো নির্বাচন কমিশনকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসপি, ইউএনও, ওসি থেকে শুরু করে প্রশাসনের সবার ওপর। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জেলা কর্মকর্তা থাকলেও তাঁদের প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি নির্বাচন কমিশনের আদেশ-নির্দেশ উপেক্ষা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। ওই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেই ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
কালের কণ্ঠ : একটু সরাসরি একটি প্রশ্নের আইনি ব্যাখ্যা জানতে চাচ্ছি। সরকার একদিকে বলছে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছেন, সুতরাং এ ব্যবস্থার কোনো সুযোগ নেই। আবার বলছে, আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সেটি কিভাবে?
শাহদীন মালিক : এখন যে অবস্থায় কেয়ারটেকার ব্যবস্থা আছে, এটির তো কোনো সুযোগ নেই। সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছেন। এভাবে কেয়ারটেকার রাখার কোনো প্রশ্নই আসে না। থাকলেও তা আবার কোর্টে গিয়ে দাঁড়ালে বলবেন বেআইনি। তবে রায় অনুসারে অন্য কোনো আদলে একটি বা দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। পার্থক্যটা হবে, বলে দিতে হবে সুস্পষ্টভাবে যে এক বা দুই টার্মের জন্য। দ্বিতীয়ত, ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ৯০ দিন বা ১২০ দিন সময় বেঁধে দিতে হবে। তৃতীয় কথা হলো, এখানে বিচার বিভাগীয় লোকরা আর প্রধান হবেন না। চতুর্থ বিষয় হলো, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা ছাড়া অন্য কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকবে না। এ ব্যাপারে সংসদে বসে আলাপ-আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে আসা কোনো কঠিন কাজ নয়। সর্বোপরি কথা হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগামী দু-একটি টার্মের জন্য থাকতে পারে, তবে তা কোনোক্রমেই বর্তমান আদলে থাকতে পারে না। আর এ বিষয়ে নতুন পন্থা অবলম্বনে দুটি বড় রাজনৈতিক দলকেই আপসহীন মনোভাব পরিত্যাগ করতে হবে।
কালের কণ্ঠ : অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
শাহদীন মালিক : আপনাকেও ধন্যবাদ।

No comments

Powered by Blogger.