ধর নির্ভয় গান-পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি by আলী যাকের

যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও গোছানো এবং চিন্তাশীল হতে হবে। না হলে আমরা আবারও আরেকটি দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ অবস্থার সম্মুখীন হবো আগামী নির্বাচনের আগে। আমরা দেখতে চাই যে যারা বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন, যারা বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাসে বিশ্বাস করেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে এবং আদর্শে বিশ্বাসী,


তাদের মধ্যে পথ বেঁধে দেবে বন্ধনহীন গ্রন্থি। অর্থাৎ তারা হাতে হাত ধরেই চলবে। হয়তো মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু তা কতগুলো মৌল বিষয়ে নয়। আমরা চাই না রাজাকারদের পুনর্বাসন। আমরা চাই না বঙ্গবন্ধুর অবমূল্যায়ন



আমার আজকের শিরোনাম রবীন্দ্রনাথের একটি অসাধারণ প্রেমের কবিতার প্রথম লাইন। দ্বিতীয় চরণটি হচ্ছে আমরা দু'জন চলতি হাওয়ার পন্থি। আজ সকালে বসে যখন এই কলামটি লিখছি তখন ঢাকা শহরে হরতাল চলছে। নানা কারণ এবং অকারণে এই হরতাল। কারণগুলো যতখানি বাস্তবিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। সেই কারণেই আমার রবীন্দ্রনাথের ওপরে ভর করা। আমাদের চলার পথ রাজনৈতিকভাবে আমাদের ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী রাজনীতিবিদদের একটি গ্রন্থিতে বেঁধে দেয়। আর তা হচ্ছে বৈরিতার পথ। অতএব, আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, ওই একটি দ্বন্দ্বপূর্ণ পথ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। যখনই ক্ষমতায় থাকব না তখন ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতা করব, যে কোনো ছুতোনাতায়। ১৯৯৬ সালে যখন বর্তমানের শাসকরা ক্ষমতায় ছিল এবং মোটামুটি ভালোভাবেই দেশ চালাচ্ছিল, তখন এ রকম হরতাল দিয়ে দিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছিল। দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, ভারতের আনুগত্য এসব অভিযোগে তারা অভিযুক্ত করেছিল তৎকালীন সরকারকে। তারপর যথারীতি ২০০১-এ সেই বিরোধীরাই ক্ষমতায় এলো। আমরা আবিষ্কার করলাম, কোনো একটি বিষয়ে পূর্ববর্তী সরকার থেকে নবনির্বাচিত সরকার কোনোভাবেই ভিন্ন নয়। তাদের আমলেও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকেনি। দুর্নীতি কমেনি বরং লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। আর ভারতবিদ্বেষ হঠাৎ রাতের অন্ধকারে কোথায় যেন পালিয়ে গেছে। একটিবারও ভারতের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার সাহস পায়নি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল। বরং ভারতীয় পণ্যে সারা বাজার ছেয়ে গেছে। এসব পণ্য নিতান্ত মনিহারি তৈজসপত্র। যার সঙ্গে আমাদের উন্নয়নের কিংবা অগ্রগতির কোনো সম্পর্কই নেই। অতএব স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা ওই একই পথপরিক্রমায় উদ্যোগী হবে এবং যথারীতি একটি চরম অরাজক অবস্থার মধ্য দিয়ে দেশ সামনের দিকে এগোবে।
আজকের হরতালের পেছনে প্রত্যক্ষ যে কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল সেটি হলো তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। আজই সকালে এটিএন নিউজ চ্যানেলে এক আলোচনায় বলা হলো, কোনো একটি পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। পত্রিকাটি এ কথা বলেই ক্ষ্যান্ত দিয়েছে। এর কোনো বিশ্লেষণে যায়নি। এই বিশ্লেষণবিমুখতার কারণও আমরা জানি। কেননা আমাদের বেশিরভাগ মিডিয়া মুখরোচক এবং উত্তেজক সংবাদ পরিবেশন করে কাটতি বাড়াবার প্রয়াস পায়। বিদেশের কোন কোম্পানির স্বার্থ সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কেনই-বা করা হচ্ছে এবং তা থেকে কে লাভবান হচ্ছে, কীভাবে লাভবান হচ্ছে, এ সম্বন্ধে কোনো কথাবার্তা নেই। একটা কথা মনে এলো, মনে হলো পাঠক খাবে, আমি লিখে দিলাম। এই হয়েছে এখন আমাদের চরিত্রের হাল। অতএব যে যা খুশি তা-ই বলে, তা লিখে পার পেতে পারে। আমরা সবাই অল্পবিস্তর জানি যে, বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা এখন বড় নাজুক। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী যে দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে এখন মন্দা ভাব নিয়ে সবাই বিচলিত। এমনটি প্রেসিডেন্ট ওবামাও আগামী নির্বাচনে ফিরতে পারবেন কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। কিন্তু এ অবস্থা তো চিরায়ত হতে পারে না? এটা নিশ্চিত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। তখন সেখানে তেলের চাহিদা, গ্যাসের চাহিদা অবধারিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। সে সময় আমাদের এখানেও মূল্য আরও বাড়বে। আমাদের সৌভাগ্য যে, কয়েক বছর ধরে অর্থনীতির যে মন্দাভাব পশ্চিমা ধনী বিশ্বে দেখা যাচ্ছিল, তার ঢেউ অনেক পরে আমাদের এসে ধাক্কা দিয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক বছর আমরা পার করে দিয়েছি। এই ঢেউ বাড়বে বৈ কমবে না। অতএব আমাদের সার্বিক উন্নয়ন প্রকল্পের দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের নিজস্ব মূলধন সৃষ্টির বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। সর্বোপরি আমাদের কৃচ্ছ্রসাধনের কথা ভাবতে হবে। এর কোনোটিই কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা বাল্যকাল থেকে আমাদের গুরুজনদের কাছ থেকে শুনে আসছি যে, একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশে যদি আমরা আমাদের বৈষয়িক অবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখতে চাই তাহলে কৃচ্ছ্রসাধন ব্যতীত কোনো উপায় নেই। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ভোগ ও বিলাস আমাদের সমাজে বেড়েই চলেছে। ফলে ধনী আরও ধনী হচ্ছে, আর দরিদ্র হচ্ছে দরিদ্রতর। এই বিষয়টিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায় সম্পূর্ণভাবে যদি আমরা আমাদের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরও বলিষ্ঠভাবে নামতে পারি।
গত ৪০ বছরে আমাদের মেধা, মনন এবং বস্তুগত অর্জন ও উন্নয়নে আমরা যে একেবারেই অগ্রগতি সাধন করিনি, এ কথাটি সত্য নয় এবং এই ধারা ক্রমাগতভাবেই চলত যদি না আমাদের দুটি বৃহৎ দলের মধ্যে বৈরী আচরণ এই প্রক্রিয়াটিকে বাধাগ্রস্ত না করত। ঘটনাটি এরকম ঘটে যে, একটি প্রবচন ধার করে বলতে হয়_ যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা। ধরুন, আপনি একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় হাত দিয়েছেন এবং সবাই জানে যে এই উন্নয়নের ফলে দেশের মঙ্গল হবে, কিন্তু আমি ক্ষমতায় এসে আপনার সেই উন্নয়নমূলক কাজটিকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়ে নতুন আরেকটি কাজে হাত দিলাম। তার পেছনে নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। কারণ প্রতিটি নতুন প্রক্রিয়ার সূচনার অর্থই হচ্ছে অবৈধ পথে আরও অধিক অর্থ সমাগমের সুযোগ। আর তাছাড়া আপনি কিছু ভালো কাজ করবেন, তা আমি কেন সহ্য করব? এই যে মনোভাব, এ নিয়ে দেশ যদি এক পা এগোয় তাহলে দু'পা পিছিয়ে আসে। কতদিন যে এরকম চলতে থাকবে তা জানি না।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম তারা শুরু করেছিল। এর নিদর্শন আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বচক্ষেই। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে, ঢাকায় যানজট নিরসনকল্পে বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে ফ্লাইওভার, যেগুলো এখন স্পষ্ট দৃশ্যমান। সড়কের যে বেহাল অবস্থা, সেটিও অচিরেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আমরা ধরে নিতে পারি। কিন্তু এভাবে চলতে দিলে বিরোধীদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাবে। সেখানেই সকল শঙ্কা। অতএব, আমি যেমন আগেই বলেছি, যে কোনো ছুতোয় চাকা বন্ধ করে দেওয়া হবে, মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করা হবে এবং মিথ্যা ভারাক্রান্ত বড় বড় বুলি আওড়ানো হবে।
এবারে ক্ষমতাসীনদের ব্যাপারে কয়েকটি কথা, যা না বললেই নয়। ক্ষমতাসীনরা বিভিন্ন বিষয়ে, যার তালিকা আগেই দেওয়া হয়েছে, যেমন সঠিক পথে এগোচ্ছেন তেমনি তেল-গ্যাস-কয়লা অনুসন্ধানেও তারা সঠিক পথেই চলেছেন। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তগুলো তারা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না অনেক ক্ষেত্রে নানারকম সীমাবদ্ধতার কারণে। যেমন, মহামূল্যবান যে প্রাকৃতিক গ্যাস, তার অপচয় আমরা অবলীলায় করে চলেছি। এই অপচয়কে থামাতে হলে আমাদের অবিলম্বে রান্নাবান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাস চালু করতে হবে। কেননা প্রাকৃতিক গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে তার ওপরে কাপড় শুকানো কোনোমতেই অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে না। তেলচালিত গাড়িকে গ্যাসে রূপান্তর করা বন্ধ করতে হবে। ঢাকা শহরে গণপরিবহন হিসেবে অন্ততপক্ষে হাজারখানেক বাস রাস্তায় নামাতে হবে। জনগণকে পরিবহন সম্বন্ধে, পরিবহন আইন সম্বন্ধে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। কিন্তু এগুলো কোনোটিই করা যাচ্ছে না একেবারে হাস্যকর রাজনৈতিক কারণে। আর কারণটি হলো এসব সুদূরপ্রসারী, মানবকল্যাণ সম্পৃক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দলের ভোট কমে যাবে। অতএব, বিরোধী দল যখন অহেতুক কারণে হরতালের ডাক দিচ্ছে, তখন আমরা কেবল একটি কথাই বলছি যে, এই হরতাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিঘি্নত করবে। আমরা তো জানিই করবে। কেননা জামায়াত-শিবির যেখানে আছে, সেখানে রাজাকারদের বিচার সিদ্ধ হয় কীভাবে? কিন্তু এর বাইরেও ক্ষমতাসীনরা যেসব বড় বড় কাজে হাত দিয়েছেন সে সম্বন্ধে জনসাধারণ কি জানে? আমার তো মনে হয়, বাংলাদেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে জনসভা করে এসব কথা জানান দেওয়া দরকার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গে হঠাৎ মনে এলো যে, গত নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা এই একটি ইস্যুর জন্য বর্তমান সরকারকে ভোট দিয়েছিল। তাদেরই বলুন না রাস্তায় নেমে এসে শান্তিপ্রিয়ভাবে মানববন্ধন রচনা করে জামায়াত-শিবির তথা রাজাকারদের ঔদ্ধত্যের মুখভাঙা জবাব দিতে? এই দায়িত্ব অবশ্যই তাদের ওপরে বর্তায়। অর্থাৎ যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও গোছানো এবং চিন্তাশীল হতে হবে। না হলে আমরা আবারও আরেকটি দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ অবস্থার সম্মুখীন হবো আগামী নির্বাচনের আগে। আমরা দেখতে চাই যে যারা বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন, যারা বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাসে বিশ্বাস করেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে এবং আদর্শে বিশ্বাসী, তাদের মধ্যে পথ বেঁধে দেবে বন্ধনহীন গ্রন্থি। অর্থাৎ তারা হাতে হাত ধরেই চলবে। হয়তো মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু তা কতগুলো মৌল বিষয়ে নয়। আমরা চাই না রাজাকারদের পুনর্বাসন। আমরা চাই না বঙ্গবন্ধুর অবমূল্যায়ন। আমরা চাই না যে বাক্য ওষ্ঠে ধারণ করে '৭১-এ মুক্তিযোদ্ধা ভাই তার জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই স্লোগান 'জয় বাংলা'র সঙ্গে কোনো বৈরিতা।

আলী যাকের : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
 

No comments

Powered by Blogger.