কর্মসংস্থান-বিশ্ববাজারে নারীর শ্রম by জোবাইদা নাসরীন

নারীদের জন্য খুবই আশাজাগানিয়া খবর যে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের বাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে এ হার বাড়েনি তেমন। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১২’ থেকে জানা যায়, ১৯৮০ সালে নারীদের কর্মসংস্থানের বাজারে নারীর প্রবেশের হার ছিল ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০০৯ সালে এসে দাঁড়িয়েছে


৫৮ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ সরকার ও বেসরকারি সূত্র যতই নারীর অগ্রগতির কথা বলুক না কেন, পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের বাজারে নারীর অংশগ্রহণের হার বেড়েছে আসলে মাত্র ২ শতাংশ (সূত্র: প্রথম আলো, ১৬ অক্টোবর, ২০১১)।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সমসাময়িক কালের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কিছু সময় আগ পর্যন্ত নারীর পাবলিক পরিসর নির্দিষ্ট ছিল নির্ধারিত কিছু কাজের মধ্যে। অনেকেই চাকরির বাজারে নিজেদের নিয়োজিত রাখলেও সন্তান হওয়ার পর ক্যারিয়ার ছেড়ে ঘরসংসারে মনোযোগী হয়ে পড়েছে। সংসার ও চাকরি অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী অবস্থানে ছিল। ঘর ও বাইরের সমন্বয়ে হিমশিম খেতে হতো নারীকে। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তাকে পোহাতে হতো। কিন্তু সময় বদলায়, বদলায় জীবনের চাওয়া-পাওয়া। এখন প্রয়োজনেই নারী-পুরুষ উভয়কেই চাকরি করতে হচ্ছে। তাই বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে সংসার আর চাকরি একে অন্যকে আলিঙ্গন করছে। সংসারের প্রয়োজন শেষ হলেও জীবনজগতের নানা প্রয়োজন শেষ হয় না। তাই সামাজিক চিন্তায়ও কমবেশি পরিবর্তন এসেছে। প্রচলিত কাজের বাইরে শুধু চ্যালেঞ্জিং কাজই নয়, চ্যালেঞ্জিং অনেক সিদ্ধান্তই আসছে নারীর কাছ থেকে। কিন্তু এর মাঝে যে অনেক ফাঁকফোকর আছে, তা স্পষ্টতই বোঝা যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বাজারে নারী-পুরুষের মজুরিগত বৈষম্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যেখানে একজন পুরুষ এক ডলার আয় করে, সেখানে মেক্সিকোতে একজন নারী ৮০ সেন্ট, জার্মানিতে ৬২ সেন্ট, নাইজেরিয়ায় ৬০ সেন্ট, শ্রীলঙ্কায় ৫০ সেন্ট আয় করে। অথচ সেখানে বাংলাদেশের নারীরা মজুরি পান মাত্র ১২ সেন্ট।
আমেরিকার কর্মক্ষেত্রগুলোতে আর কয়েক মাসের মধ্যেই নারীকর্মীরা সংখ্যার দিক থেকে পুরুষকর্মীদের ছাড়িয়ে যাবেন এবং এ বছর সেখানে ছেলেদের চেয়ে ২৬ লাখ বেশি মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ওইসিডির (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট সংখ্যার দিকে থেকে নারীরা পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের দেশগুলো নারীকর্মী নিয়োগে বিশ্বে প্রথম দিকে রয়েছে। এসব দেশে কর্মজীবী নারীদের সবচেয়ে কম সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় (সূত্র: দি ইকোনমিস্ট)।
যদিও বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের হার ১৯ এবং এই সরকারের আমলে মন্ত্রিসভাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান পেয়েছে নারী, কিন্তু সেটি সব খাতে নারীর অবস্থা এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না। বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের বাজারে সবচেয়ে বেশি নারী জড়িত আছে পোশাকশিল্পে। যদিও পোশাকশিল্প, চামড়াশিল্পসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কর্মরত অস্থায়ী নারীশ্রমিকদের শ্রম কোনোভাবেই সরকারি এবং বেসরকারি পরিসংখ্যানভুক্ত হয় না। এর বাইরে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা নারীশ্রমিকদের শ্রমও একইভাবে খাতা-কলমে গায়েব হয়ে যায়। তাই জীবনভর জোন বেচলেও তাদের শ্রমের কোনো মূল্যায়ন হয় না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবছর কত নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, তার কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি হিসাব নেই। নারীদের একটি বৃহৎ অংশ বিভিন্ন কারণে শ্রমবাজার থেকে ঝরে পড়ে। শুধু পারিবারিক এবং সামাজিক মতাদর্শ নয়, শ্রমবাজার নারীর জন্য এখন পর্যন্ত সব দিক থেকে অনুকূলে নয় বলেই নারীর এই বিপরীতমুখী যাত্রা। বেশির ভাগ চাকরির বিজ্ঞাপনে চটকদারি বুলি হিসেবে ‘ওমেন আর এনকারেজড টু অ্যাপ্লাই’ লেখা থাকলেও নারীর জন্য কর্মক্ষেত্রগুলো সব সময় উৎসাহব্যঞ্জক নয়। বাস্তবতা যে কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকায় বহু নারী বাজারে টিকে থাকতে পারছে না এবং তারা বাধ্য হচ্ছে সেখান থেকে সরে পড়তে। ফলে চাকরির বাজারে নারী যেমন আসছে, তেমনি ঝরেও পড়ছে অনেক বেশি। সেই জন্যই ৩০ বছরে হার মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজার থেকে নারীর ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ চাকরিজীবী মায়েদের জন্য কর্মক্ষেত্রে পরিবারবান্ধব পরিবেশ না থাকা। অনেক চাকরিজীবী মা শুধু ডে-কেয়ার সেন্টার থাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কম বেতনেও কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। খোদ আমেরিকায়ও যাদের সন্তান আছে, যেসব নারী থেকে সন্তানহীন নারীর আয় অনেক বেশি (সূত্র: দি ইকোনমিস্ট)। এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে সুইডেন ও জার্মানির ৯০ শতাংশেরও বেশি কোম্পানি নারীর জন্য সুবিধামতো কর্মসময় করেছে। তারা চলছে নতুন নতুন পদ্ধতির দিকে, যাতে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রয়োজন মেটানো যায়।
এর পাশাপাশি রয়েছে আরও কিছু সমস্যা। কর্মস্থলে যৌন হয়রানি, অসম বেতন এবং নিরাপদ ও সহজলভ্য যাতায়াতব্যবস্থা না থাকায় এখন পর্যন্ত নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ ও অনুকূল কর্মক্ষেত্র তৈরি করা যায়নি। এমনকি বড় বড় পোশাক কারখানা এবং অফিসেও নারীর জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা করা যায়নি। যে নারীরা সমাজ এবং পরিবারের শত বাধা ঠেলে নিজের জানাশোনা, দক্ষতা এবং বিশ্বাসের ওপর ভর দিয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার তাগিদে কিংবা নিজের মতো জীবনকে দেখার অভিপ্রায়ে শ্রমবাজারে যায়, সে কেন টিকে থাকে পারে না? তাকে কেন টিকে থাকতে দেওয়া হয় না?
এর উত্তরগুলো আমাদের জানা। আর তাই ৩০ বছরেও নারীর শ্রম হিসাবের ঘরে গিয়ে খুব বেশি এগোয় না।
জোবাইদা নাসরীন: সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য।
zobaidanasreen@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.