চারদিক-দুখীর দুঃখ মোচন

নামের সঙ্গে জীবনের এত মিল হয়ে যাবে, তা কে-ই বা জানত? জীবনটা তাঁর কেবলই দুঃখময়। তবে দুঃখের অমানিশা কেটে গেছে আরও আগেই। তাঁর যাপিত জীবন এখন অনেক সুখেরই বলা যায়। সংগ্রামমুখর এমনই এক নারী দুখী। মা-বাবা অবশ্য শখ করে নাম রেখেছিলেন প্রমীলা বণিক। তবে সময় পুরু আস্তরণ ফেলেছে সেই নামের ওপর।


গোপালগঞ্জ জেলার বাগচীবাড়ি সড়কের পাশেই তাঁর বাড়ি। স্বামী গোপাল বণিককে হারিয়ে বিধবা হয়েছেন সে তো বহু বছর আগে। এর পরে তিন মেয়েকে মানুষ করেছেন। রোদে পুড়ে পরিশ্রম করতে করতে গায়ের রং একেবারেই কৃষ্ণবর্ণ হয়ে গেছে। পরিশ্রমের ভারে কিছুটা নুয়েও পড়েছেন তিনি। দুখীর বাড়িতে যখন পা রাখি, তখন সবে সন্ধ্যার উলুধ্বনি পড়েছে। গলায় আঁচল পেঁচিয়ে সন্ধ্যায় স্রষ্টার কাছে মঙ্গল কামনা করে তবেই কথা বলতে বসলেন দুখী।
‘স্বামী মরছেন সে তো মেলা বছর হইল। পুতুল, চঞ্চলা আর চপলা (তিন মেয়ে) সবাই গুড়ো গুড়ো। আহানে তো বড় হইছে। পুতুল আর চঞ্চলা বিয়ে পাস করছে। তয় চপলা আইএ পাস করছে।’ সরকারি চাকরি করছে বড় দুই মেয়ে। আর চপলা? ‘আহানেও চাকরি পায় নাই। চেষ্টা করতিছে যদি একটা চাকরি পায়। ওর বাপে মরলে পরে কয় বছর আমার বাবার বায়ান্দেই (বাড়িতে) ছিলাম।’ বললেন দুখী।
স্বামী মারা যাওয়ার পর যেখানে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন কীভাবে? এত অভিজ্ঞতার কথা কীভাবে শুরু করবে এই নারী তা-ই একটু নিচু স্বরেই বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করছি। নিজের ভুঁই (জমি) ছিল না, অন্যের ভুঁইতে পাতো (ধানগাছের চারা) বুনছি। মুরগি আর হাঁসের ডিম বেচছি, গরুর দুধ বেচছি মাইনষের বায়ান্দে বায়ান্দে ঘুইরে। খাটনির সব কাম করছি। আর লেহাপড়া তো ছল মাইয়্যেরে (ছেলেমেয়ে) করাইতে হয়। মাইয়্যা হইছে তাতে কী? আমি গতর খাটাই কাজ করছি, আমার মাইয়েরাও ভালো। নিজেগে পড়ালেহার পাশাপাশি টিউশনি করছে। আবার কেলাস থেইকা বাড়ি ফিইর‌্যা আমারে কাজে সাহায্য করছে। ঘরের কাম করলেও লেহাপড়ায় ফাঁকি দেয় নাই কখনোই। বছর শেষে রেজাল্ট ঠিকই ভালো হইছে’।
সন্তানের প্রাপ্তি নাকি বাবা-মাকে সবচেয়ে বেশি খুশি করে? ম্লান হাসি হেসে দুখী বলেন, ঠাকুর জানে কত খুশি হইছি আমি। আমার পুতুল (বড় মেয়ে) যেন (যখন) চাকরি পাইল, কী যে খুশি হইছিলাম। মাইনষে কইছে মাইয়ের চাকরির ভাত কি খাইতে পারবা? আমি খালি হাসি, কিছু কতি পারি না। এ যে কত্ত বড় পাওয়া, তা বুঝানো যাবে না। আবার মাইজে মাইয়ে চঞ্চলার চাকরি পাওয়া খুশিকে কয়েক গুণ বাড়ায় দিছে আর ভাবছি, মাইয়াগো মানুষ করব। আমার মাইয়েরাও ভালো। নিজেগের পড়ালেহার পাশাপাশি টিউশনি করছে। আইজ আমার কষ্ট সার্থক হইছে।’ মুখে অনেকটা তৃপ্তির হাসি। বললেন, ‘একসময় পোতায় ঘর আছিল না, এহন পোতায় ঘর দিছি। মাইয়েরা স্বামী-সংসার নিয়ে ভালো আছে।’ আর হাঁস, মুরগি ও গরু? ওগুলো তো থাকবেই। গোয়ালঘরে আছে দুটি গাভি আর বাছুর। মুরগিও আছে। এখনো আগের মতো হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ করেন?
‘কামের মানুষ কি কাম ছাড়া থাকতি পারে? কাজ তো করবই। এখন চাওয়া বলতে আর কী আছে? পুতুল আর চঞ্চলা তো সরকারি চাকরি করে। এখন আমার চপলার যদি একটা চাকরি হয়, তাতেই খুশি হব।’ ছোট মেয়ের কথা ভেবে যেমন একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়, তেমনই বড় মেয়েদের কথা বলে চরম তৃপ্তির হাসি হাসেন তিনি।
ঋতুতে ভাদ্র, তাই মফস্বল আর গ্রামে তাল মিলবে—এটাই স্বাভাবিক। কথার ফাঁকেই দুখী ব্যস্ত হন তালপিঠা বানাতে। প্রতিটি কাজই চাই নিখুঁতভাবে করা। তাই কথায় আর বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন না তিনি। উঠে দাঁড়াতেই বাদ সাধেন। পিঠা খেয়ে তবেই বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা বলছে অন্য কথা। রাত অনেক হয়েছে, তাই ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে পড়ি। এবারে তালপিঠার স্বাদ না নিলেও শরতের পুজোর নিমন্ত্রণ নিতে ভুল হয়নি।
শারমিন নাহার

No comments

Powered by Blogger.