এখন সম্পর্ক উন্নয়নের দায় ভারতেরই-প্রত্যাশার পিঠে আঘাত

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের পর আমরা ২০ মাস অপেক্ষা করেছি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে ঢাকায় বরণ করার জন্য। অপেক্ষার অবসান ঘটেছে; গতকাল তিনি ৩০ ঘণ্টার রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা পৌঁছেছেন, যথাযথ সম্মানের সঙ্গে বাংলাদেশ তাঁকে বরণ করেছে।


দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, একান্ত বৈঠক হয়েছে দুই দফায়। কিন্তু বহু প্রতীক্ষিত এই সফর থেকে যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, পূরণ হয়েছে তার অতি সামান্যই।
উন্নয়ন-সহযোগিতার রূপরেখা চুক্তি, স্থলসীমান্তসংক্রান্ত ১৯৭৪ সালের চুক্তির প্রটোকল, অর্থনৈতিক বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক, সুন্দরবন নিয়ে দুটি চুক্তি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দিল্লির জওহরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি এবং বিটিভি ও দূরদর্শনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাটি ছিল, সেই তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। অথচ ২০ মাস ধরে বাংলাদেশ এই প্রত্যাশা জাগিয়ে রেখেছিল যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তিস্তা চুক্তি না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই ট্রানজিট-সংক্রান্ত সম্মতিপত্রে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেনি।
উভয় পক্ষে ইতিমধ্যে সুবিদিত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা দমনে বাংলাদেশ কার্যকর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মনমোহন সিং বলেছেন, সে জন্য তিনি বাংলাদেশের কাছে অতিশয় কৃতজ্ঞ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান দাবিকে উপেক্ষা করা, তা যেকোনো অজুহাতেই হোক না কেন, এ দেশের জনগণের প্রত্যাশার পিঠে অপ্রত্যাশিত আঘাত বলেই মনে হবে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি থেকে ভারতের পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের কাছে যে বার্তা পৌঁছাবে, তা সত্যিই দুঃখজনক। স্থলসীমান্তসংক্রান্ত চুক্তির যে প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাও ফলপ্রসূ কিছু নয়, কারণ এই প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে এবং বাস্তবায়নের কোনো সময় নির্ধারণ করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অপদখলীয় জমি ও ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়টিতে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের মানুষের মনে হতাশা সৃষ্টি করবে। এখন বাংলাদেশের জনগণের মনে হবে, ভারত আমাদের কাছে শুধু নিতেই আগ্রহী, দিতে নয়। দুই দেশের মধ্যকার সুসম্পর্কের যে প্রচার চলেছে, তার প্রতিফলন এই সফরের মধ্য দিয়ে ঘটেনি। রাজনৈতিক জটিলতা, দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা এখন আর বিস্ময়কর মনে হবে না। আমরা মনমোহন সিংয়ের বক্তব্য ধরেই বলব, বাংলাদেশ ভারতের জন্য যা করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানোর দায় এখন ভারতেরই। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি ন্যায্যভাবে বণ্টন, সীমান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান অবশ্যই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে হবে। এভাবেই কেবল বাংলাদেশের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে ভারত।

No comments

Powered by Blogger.